আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আসন নিয়ে ছোট দলগুলোর বড় দাবি

দুই জোটেই চলছে দর কষাকষি

দীপক দেব
| প্রথম পাতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে জোটগতভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সবাই। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তাদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য জোটের কলেবর বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রধান দুই জোটেই আসন বণ্টন নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও হচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে। এবার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিকরা ২৮০টি আসন দাবি করছে। অন্যদিকে বিএনপির ২০ দলীয় জোটের শরিকরা ২০০ আসন দাবি করছে। এর বাইরে যুক্তফ্রন্টের একটি দল বিএনপির কাছে ১৫০ আসন দাবি করেছে বলেও জানা গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান শরিকের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার জন্যই এবার ছোট দলগুলোও বড় দাবি করে বসেছে বলে মনে করে রাজনীতি সচেতন মহল।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি ও তাদের মিত্ররা নির্বাচনে অংশ নেবেÑ এমনটা ধরেই শরিকদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে আরও সময় লাগবে। তবে এবার ১৪ দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টি মিলিয়ে ৬৫ থেকে ৭০টি আসন ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে আওয়ামী লীগ। চলতি মাসের শেষের দিকে জোট শরিকদের নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠক করতে পারেন বলে দলের একটি সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, এরই মধ্যে শরিকদের সঙ্গে প্রথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দিন আগে এরশাদ ও রওশন এরশাদসহ জাতীয় পার্টির নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে নিজেদের প্রত্যাশার কথা বলেছেন। তারা এবার বেশি আসন প্রত্যাশা করছেন। এবার ১০০ আসনসহ নির্বাচনকালীন সরকারে তাদের আরও দুই থেকে তিনজন মন্ত্রী বেশি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। জাপা সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে এরশাদ নতুন করে দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু ও কাজী ফিরোজ রশীদকে নির্বাচনকালীন সরকারে রাখতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করে দেখবেন এমন কথার পাশাপাশি জোটগত রাজনীতি ও আগামীতে ক্ষমতায় আসা কেন প্রয়োজন সেটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ক্ষমতায় আসতে না পারলে তাদের অবস্থা কেমন হবে, তাও তাদের বোঝানো হয়েছে। বর্তমান সংসদে ৩৪টি আসন নিয়ে জাপা বিরোধী দলের আসনে বসেছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যে হিসাব তাতে শরিকদের জন্য ৭০টি আসন বিবেচনা করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় পার্টিকে ৪০টি আর ১৪ দলের জন্য ১৫ থেকে ২০টি আসন ছাড় দেওয়া হবে। বাকিগুলো আসনভিত্তিক সমঝোতার জন্য রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সংখ্যা কিছুটা বাড়তে পারে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকারে জাতীয় পার্টি তাদের আরও দুই-একজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে বলেছে, অনুরোধ করেছে। সেটাও প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার, তিনি কতটা বিবেচনা করবেন সেটা এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। এগুলো আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে আছে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে তাহলে জাতীয় পার্টি আলাদা নির্বাচন করবে। বিএনপি যদি আসে তাহলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আসন বণ্টন সমঝোতা হবে। সবকিছু নির্ভর করছে মেরুকরণ কীভাবে হবে, সেভাবেই অ্যালায়েন্সের সমীকরণ হবে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শরিকদের জন্য ৬০ থেকে ৭০টি আসন ছেড়ে দেবে।’
এদিকে ১৪ দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার তারা আওয়ামী লীগের কাছে ১৮০ আসন দাবি করবে। এখান থেকে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে দরকষাকষি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও ১৪ দলের জোটে ১৩টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অনেকেরই নিবন্ধন নেই। বর্তমানে জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের শরিকদের মধ্যে সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে জাসদের ছয়টি, ওয়ার্কার্স পার্টির সাতটি, তরিকত ফেডারেশন দুটি, জাতীয় পার্টি-জেপির দুটি আসনে বর্তমান এমপি রয়েছেন।
সূত্র মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ৩৫টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু) ৩০টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (আম্বিয়া) ১৮টি, জাতীয় পার্টি-জেপি ২২টি, গণতন্ত্রী পার্টি ১৫টি, তরিকত ফেডারেশন ৩০টি, ন্যাপ ১০টি, গণতন্ত্রী মজদুর পার্টি দুটি, গণআজাদী লীগ পাঁচটি, বাসদ পাঁচটি ও সাম্যবাদী দল পাঁচটি আসন চাইবে। এদের কেউ কেউ জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের মাধ্যমে জোটপ্রধানকে তালিকাও দিয়েছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনে গেলে অন্তত ১০০টি আসন দাবি করবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমরা আমাদের মতো করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। গতবার আমরা সাতটি আসন পেয়েছিলাম; এবার কমপক্ষে ৫০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেভাবে আমাদের প্রার্থীদের প্রস্তুতি নিতে বলেছি।’ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (ইনু) কার্যকরী সভাপতি রবিউল বলেন, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো আমাদের দলে শতাধিক যোগ্য, সুপরিচিত ও দক্ষ প্রার্থী রয়েছেন। তবে জোট রাজনীতির কারণে আমরা জোটের কাছে ৩০টি আসনে জোর গুরুত্ব দেব। আমাদের প্রত্যাশা, যেখানে যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন, সেখানে শরিকপ্রধান আওয়ামী লীগ আমাদের ছাড় দেবে।’ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (আম্বিয়া) সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বলেন, ‘আমরা জোটপ্রধান আওয়ামী লীগের কাছে ১৮টি আসন চেয়েছি। আশা করি আলোচনার মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রাপ্যতা পাব।’ এছাড়া সাবেক বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার বিএনএ জোট, ইসলামী ফ্রন্টসহ কয়েকটি ছোট দল জোটগতভাবে নির্বাচন করার জন্য সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। এদের বিষয়েও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে আওয়ামী লীগ।
আসন বণ্টন নিয়ে দরকষাকষি চলছে বিএনপি শিবিরেও। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া করাগারে বন্দি থাকার কারণে তার মুক্তির আন্দোলন সর্বাধিক প্রাধান্য দিলেও দলটির নীতিনির্ধারকরা আগামী দিনের আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতিও রাখছেন ভেতরে ভেতরে। এ নিয়ে দলটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ২০ দলীয় জোটের শরিকরা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এর সঙ্গে জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যুক্তফ্রন্টের সঙ্গেও দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের যোগাযোগ হচ্ছে নিয়মিত। জামায়াত প্রশ্নে ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়ায় কিছুটা বাধা সৃষ্টি হলেও নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে দলগুলোর। এরই মধ্যে তাদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়েও আলোচনা হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
এবার বিএনপির কাছে জোটের শরিক দলগুলোর প্রত্যাশা প্রায় ২০০ আসন। যদিও এ জোটের ১২টি দলের নিবন্ধনই নেই। এছাড়া বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত যুক্তফ্রন্টের এক নেতা ১৫০ আসন দাবি করেছেন। এ অবস্থায় বিএনপির নিজেদের কোনো আসন থাকে না। সবাইকে খুশি করে একত্রিত করে রাখা দলটির জন্য একটু চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছেন অনেকেই।
সূত্রে জানা যায়, বিএনপির কাছে জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী এবার ৬০টি আসন চায়। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও খেলাফত মজলিস চায় ৩০টি করে আসন। জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ১৫টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ১০টি, বিজেপি দুটি, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম এবং লেবার পার্টি চায় ছয়টি করে আসন, বাংলাদেশ ন্যাপ পাঁচটি, এনডিপি দুটি, জাগপা ও এনপিপি চায় চারটি করে আসন, ডেমোক্রেটিক লীগ ও ন্যাপ চায় (ভাসানী) দুটি করে আসন এবং সাম্যবাদী দল চায় একটি আসন। এছাড়া যুক্তফ্রন্ট বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনে গেলে অন্তত ১৫০টি আসন চাইতে পারে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও জাতীয় ঐক্য গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত মাহমুদুর রহমান মান্না আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা নীতিগতভাবেই জামায়াতের সঙ্গে কোনো ঐক্য গড়ব না। এখন যে ঐক্যের আলোচনা চলছে সেটা শুধু বিএনপির সঙ্গে, এখানে অন্য কেউ নেই।’ যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত এ নেতা বলেন, আগামীতে কেউ যেন আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলার নাম করে স্বৈরাচারী আচরণ করতে না পারে এজন্য ক্ষমতার একটা ভারসাম্যের কথাও বলা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বিএনপিসহ সবার সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে এবং মৌলগতভাবে সবাই এসব বিষয় নিয়ে একমত আছে। ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য প্রথম দুই বছর সরকার চালানোর দায়িত্ব তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।