আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

নদীপাড়ের মানুষের চোখে ঘুম নেই

সাধন সরকার
| সম্পাদকীয়

নদীভাঙন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বছরের অন্যান্য সময় নদীভাঙনের খবর খুব বেশি শোনা না গেলেও প্রতি বছরের বর্ষা মৌসুমের সময়টাই নদীভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করে। সম্প্রতি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও এসব নদনদীর শাখা নদীতে ভাঙনের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে নদী পাড়ের বাতাস। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, শরীয়তপুরের নড়িয়া, রংপুরের কাউনিয়া, টাঙ্গাইলের ফতেপুর, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা ও কুষ্টিয়া সদরে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পদ্মা, তিস্তা, গড়াই ও আড়িয়াল খাঁর ভাঙন যেন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পদ্মার ভাঙনে প্রতিদিনই মানুষের স্বপ্ন ভাঙছে, কপাল পুড়ছে। নিজেরাই ভেঙে ফেলছেন নিজেদের হাতে গড়া ঘরবাড়ি। চেনা নদী বাড়ির দুয়ারে এসে হানা দিয়েছে অচেনা ভয়ংকররূপে। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে নদীপাড়ের কোনো কোনো গ্রাম-ইউনিয়ন! প্রতি বর্ষা মৌসুমে নদনদীর ভাঙন যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের খালবিল-প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে নদীর ওপর বাড়তি পানির চাপ পড়ছে। বৃষ্টিপাত ও নদীর উজানে পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রচ- গতির সৃষ্টি হলে ভূমিক্ষয় ত্বরান্বিত হয়। নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি হলে সেই বাধা ঠেলে সবকিছু ভেঙেচুরে নদী সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আবার নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দিলে তা নদীভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নদীতীর পলি মাটি দ্বারা ভরাট হওয়ার কারণে অল্প বৃষ্টিপাতেও নদীভাঙনের সৃষ্টি হতে পারে। দিন দিন নদনদীগুলোর নাব্য সংকট বেড়ে যাচ্ছে। নদীগুলো থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিকভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে নদী শাসন করা হচ্ছে। নদীর ওপর এতসব অত্যাচারের কারণে নদীভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীভাঙন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দুর্যোগ ও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্য মতে, দেশে ভূমিহীনদের ৫০ ভাগই নদীভাঙনের শিকার। ভাঙনের শিকার হয়ে নদীপাড়ের মানুষের বারবার ঠিকানা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। নদীভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব ও ভূমিহীন হয়ে ‘নদী সিকস্তি’ (নদীভাঙনের শিকার হয়ে ভূমি হারিয়ে অসহায় মানুষ) তকমা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের। একসময় যারা ছিল গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন পরিবার, ছিল ফসলি জমির মালিক তারাই আজ ভাঙনে জমিজমা-ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব। সত্যি কথা বলতে, নদীপাড়ের মানুষের চোখে ঘুম নেই। বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৮০ ভাগই নদনদী অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের নদনদীর তটরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার তটরেখা নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।
নদীভাঙনের শিকার মানুষের বেশিরভাগই ঠিকানা হয় শহরের বস্তিতে। অনেকের আবার জায়গা হয় শহরের ফুটপাতে, রেললাইনের পাশে। তথ্যমতে, ভাঙনের কবলে পড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ২৫ হাজার একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদীভাঙনে প্রতি বছর উদ্বাস্তু-গৃহহীন মানুষের ভাসমান সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার করে বাড়ছে। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫১টি জেলাতেই কমবেশি নদীভাঙন দেখা দেয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ৮৫টি শহর ও বন্দরসহ মোট ২৮৩টি স্থানে নিয়মিতভাবে প্রতি বছর নদীভাঙন দেখা দেয়। নদীভাঙনে মানুষের বসতভিটা, মাথা গোজার ঠাঁই, গাছপালা, ফসলি জমি, বাজার-দোকানপাট, স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে ঢাকার দোহার-নবাবগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, ভোলা, বরিশাল, ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুরে প্রতি বছর কমবেশি নদীভাঙন দেখা দেয়। গ্রামীণ দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ এ নদীভাঙন। নদীভাঙনকবলিত মানুষের জীবনে সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নদীভাঙনের প্রাকৃতিক কারণ রোধ করা না গেলেও মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলোও যদি দূর করা যায়, তাহলে অর্ধেকের বেশি এলাকায় নদীভাঙন কমানো সম্ভব। নদীভাঙনে অনেক জনপদের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়াসহ পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশের মতো এতবেশি নদীভাঙন দেখা যায় না। নদীভাঙনের শিকার বৃহত্তর একটা জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভবও নয়। ভাঙনকবলিত এলাকায় এখনই পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নিলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে অনেক এলাকা। তাই ভাঙন রোধে কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি নদী থেকে বালু উত্তোলন ও নাব্য সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে নদী শাসন করতে হবে। 
নদীভাঙন রোধে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো কংক্রিটের ব্লক দিয়ে তীর বাঁধাই করার পাশাপাশি পরিকল্পিত ও স্থায়ী উদ্যোগের কথা চিন্তা করতে হবে। এছাড়া ‘নদী সিকস্তি’ মানুষের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে।

ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 
[email protected]