আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

উত্তম চরিত্র মানুষের শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য

মাওলানা দৌলত আলী খান
| তাসাউফ

পৃথিবীর মানবগোষ্ঠী একটি কারণেই মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করে। তা হচ্ছে হুসনুল খুল্কÑ উত্তম চরিত্র। এর কারণেই মানুষ সর্বত্র স্মরণীয় ও বরণীয় হয়। কালের গর্ভে কখনও বিলীন হয় না তাদের ইতিহাস। ব্যক্তিত্ব ও অবদানে তারা চির অমর হয়ে থাকে। ইসলামের ধারক ও বাহক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই মানবজীবনে এর গুরুত্ব ও উপকারিতা অপরিসীম। সাধারণত ইসলামের পরিভাষায় মানুষের পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য সংশ্লিষ্ট আচার-আচরণ ও কার্যাবলিকে সুষ্ঠু, সুন্দর ও যথার্থভাবে সমতার ভিত্তিতে প্রতিপালন ও সম্পাদন করাকে হুসনুল খুল্ক বলা হয়। এছাড়াও তাকওয়া, জিকির, শোকর, সবর, ইনসাফ, এহসান, সহানুভূতি বিষয়গুলোও হুসনুল খুল্কের অন্তর্ভুক্ত।

হুসনুল খুল্কের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেই সমাজে সমাদর লাভ করে এবং তার সৎস্বভাবের দ্বারা মানব সমাজ নানাভাবে উপকৃত হয়। ফলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলাম যেহেতু জাতির সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য আবির্ভূত হয়েছেÑ তাই ইসলাম ব্যক্তিকে সৎস্বভাবের অধিকারী করে সমাজ জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ইসলাম উত্তম চরিত্র ও শিষ্টাচারের যে ব্যাপক শিক্ষা দান করেছে, তা বিশ্বের যে-কোনো জাতি ও সমাজের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। কোরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা এ মর্মে ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন অনুপম চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা নুন : ৪)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে হুসনুল খুল্কÑ সচ্চরিত্রের বাস্তব প্রশিক্ষণদানের জন্য এ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। উত্তম চরিত্র মানুষের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান সম্পদ। এ সম্পদ অর্জন করতে পারলে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সম্মানের পাত্র হয়। সচ্চরিত্রে জাদুর ছোঁয়া রয়েছে। কারণ, এর মাধ্যমে অন্যের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সহজে লাভ হয়। হাদিসে সচ্চরিত্রতা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। যেমনÑ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বাপেক্ষা উত্তম যে চরিত্রের দিক দিয়ে উত্তম।’ (বোখারি : ৩৫৯৯)।
অন্য হাদিসে আছে, হজরত নাওয়াস বিন সাময়ান (রা.) বলেন, আমি নবী করিম (সা.) কে ভালো কাজ এবং মন্দ কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সচ্চরিত্রের নাম নেকিÑ ভালো আর যে কাজটি তোমার কাছে অপছন্দ এবং অন্য কোনো লোকে জানা তোমার কাম্যও নয় তা পাপ।’ (মুসলিম : ৬৬৮০)।
দুশ্চরিত্র মানবজাতিকে পশুত্বের পর্যায়ে নিয়ে যায়। চরিত্রহীনতা অসভ্যতার জন্ম দেয়। এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। ধর্মীয় অনুশাসন না মানার কারণে দুশ্চরিত্রের জন্ম হয়। আজ মুসলিম সমাজ অপসংস্কৃতির কালো থাবায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বকে হারাতে বসেছে। এর একমাত্র কারণ হলো স্বীয় ধর্মীয় বিধানের প্রতি অনীহা। ইসলাম শিক্ষার অভাব। যার দরুন দুশ্চরিত্রের আগ্রাসনে মুসলিম সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। চরিত্রহীন ব্যক্তিকে পরকালে জাহান্নামের ভয়ঙ্কর আজাব ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালার কাছে ঘৃণিত হবে। আর হাদিসে বলা হয়েছে দুশ্চরিত্রের পরিণাম হলো জাহান্নাম। যেমনÑ  হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। আর ঈমানের স্থান জান্নাত। পক্ষান্তরে নির্লজ্জতা দুশ্চরিত্রের অঙ্গ। আর দুশ্চরিত্রতার স্থান জাহান্নাম।’ (তিরমিজি : ২১৪০)।
অন্য হাদিসে আছে, হজরত আবুদ দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন মোমিনের পাল্লায় সর্বাপেক্ষা ভারী যেই জিনিসটি রাখা হবে তা হলো উত্তম চরিত্র। আর আল্লাহ তায়ালা অশ্লীলভাষী দুশ্চরিত্রকে ঘৃণা করেন।’ (তিরমিজি : ২১৩৩)।
চরিত্রবান ব্যক্তি সবার বিশ্বস্ত ও প্রিয় হয়। তার সচ্চরিত্রের মাধ্যমে মানবসমাজে প্রশংসার পাত্র হয়। আর সমাজে সভ্য লোকের যে-কোনো পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সচ্চরিত্র মানুষকে মর্যাদার সুউচ্চ স্থানে নিয়ে যায়। তাই মানবতার ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হওয়ার লক্ষ্যে সর্বোপরি দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে হুসনুল খুল্ক তথা সচ্চরিত্র ও সুন্দর স্বভাব অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। ইসলাম সচ্চরিত্রের শিক্ষা অর্জন এবং তা ব্যক্তিজীবনে বাস্তবায়ন করার প্রতি কড়া নির্দেশ দিয়েছে। সচ্চরিত্রের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে  দুনিয়াতে সম্মান এবং পরকালে জান্নাত দান করবেন। এমনকি রোজা ও তাহাজ্জুদের সমান সওয়াবও দান করবেন। যেমনÑ হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের বলে দেব না তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি কে? তারা বললেন হ্যাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে তিনিই সর্বোত্তমÑ যিনি বয়সে বড় এবং স্বভাব-চরিত্রে ভালো।’ (আহমদ)।  
অন্য হাদিসে আছে, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মোমিন সচ্চরিত্রের বিনিময়ে রোজা পালনকারী ও তাহাজ্জুদ আদায়কারীর সওয়াব পাবে।’ (আবু দাউদ : ৪৮০০)। 

লেখক : শিক্ষক, নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম