আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

আহম্মকরা দোষ চাপায় অন্যের ঘাড়ে

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
| তাসাউফ

এক বাদশাহর ছিল এক গোলাম। গোলামের আকলবুদ্ধি ছিল না তেমন। কর্তব্যকর্মে তার অলসতা-অবহেলা ছিল চরম। চলত আপন মনে, ইচ্ছা ও কামনার পেছনে। মনে মনে ভাবত, সে যা করে সবই ঠিক। নিজের ভুলত্রুটি-দুর্বলতার জন্য নানা অজুহাতে দোষ চাপাত অন্যের ঘাড়ে। 

গোলামের এমন স্বভাবের কারণে বাদশাহ তার প্রতি বেজায় অসন্তুষ্ট হন। প্রধান বাবুর্চিকে ডেকে নির্দেশ দেন, ওর রেশন কমিয়ে দাও। যাতে সতর্ক হয়, সংশোধন হয়। বাড়াবাড়ি করলে চাকরি থেকেই খারিজ করে দাও। বাদশাহর আদেশ পালিত হলো। রেশনের পরিমাণ কমে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে গোলাম এসে বাবুর্চির ওপর ক্ষেপে গেল। বলল, এসব তোমার কারসাজি, আমি সব বুঝি। আসলে সে ছিল বেকুব নির্বোধ। বাদশাহর জবানিতে মওলানা রুমি (রহ.) বলেনÑ 
আকল বূদী গের্দে খোদ কর্দী তাওয়া’ফ
তা’ বেদীদী জোর্মে খোদ গশতী মাআ’ফ
আকল থাকলে নিজেকে ঘিরে করত প্রদক্ষিণ
নিজের ভুলটি ধরা পড়ত, পেয়ে যেত নিষ্কৃতি। 
বোকা মানুষ বলতে কে কিংবা বুদ্ধিমান বলতে কাকে বোঝায়, পরিষ্কার হয়ে গেল। নিজের কোনো অপূর্ণতা থাকলে, কোনো ভুলত্রুটি হলে বুদ্ধিমানরা তার জন্য নিজেকে নিয়ে চিন্তা করে, নিজের চেষ্টায় তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। তাতে সে নিষ্কৃতি পেয়ে যায়। আর যারা বোকার হদ্দ আহম্মক, তারা নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে না। নিজেকে শুধরে নেওয়ার, পরিস্থিতির ওপর জয়ী হওয়ার চেষ্টা করে না। তার পরিবর্তে অভাব, পরিবেশ, শিক্ষক, মুরুব্বি, এমনকি কপালের লিখনের ওপর দোষ চাপায়। এরা প্রচ- লোভী। অল্পতে ক্ষেপে যায়। এদের উপমা দিয়েছেন মওলানা গাধার সঙ্গে। গাধার এক পা বাধাগ্রস্ত হলে এমন আচরণ করে, যার ফলে উভয় পায়ে বেড়ি লেগে যায়। 
মওলানা একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দেন, গবেষকদের মতে সাহাবিদের উক্তি হিসেবে এটি হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। হজরত আলী (রা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতে তিন শ্রেণির প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। প্রথম শ্রেণি ফেরেশতা। ফেরেশতাদের সৃষ্টি করার পর তাদের স্বভাবে দিয়েছেন ইবাদত, জ্ঞান ও দানশীলতার স্বভাবজাত প্রবণতা। সৃষ্টিলোকের ওপর আল্লাহর অবারিত দান বিতরণে তারা সক্রিয়। সেই জ্ঞানও তাদের আয়ত্তে। কাজেই তারা মনেপ্রাণে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত। সিজদা ইবাদত আল্লাহর হুকুম পালন ছাড়া তারা আর কিছু বোঝে না। 
নীস্ত আন্দর উনসুরাশ হেরচ ও হাওয়া
নূরে মুতলাক যিন্দা আয ইশকে খোদা
তাদের স্বভাব উপাদানে নাই লোভ ও কামনা
নূরের পুতুল, আল্লাহর প্রেমে মগ্ন জীবন্ত সর্বদা। 
আরেক শ্রেণি জীব জানোয়ার। পেট আর যৌনতা ছাড়া এদের আর কোনো চাহিদা নেই। এদের চিন্তা ও চেষ্টা পড়ে থাকে খড়ের স্তূপে, খোঁয়াড়ে। প্রকৃত সম্মান কী কিংবা অসম্মান বলতে কী বোঝায় পশুর কাছে তার কোনো বোধ নেই। 
তৃতীয় শ্রেণিটি মানুষ। তাকে সমান ভাগে দেওয়া হয়েছে ফেরেশতা ও জানোয়ারের স্বভাব।
ইন সেওওম হাস্ত আদমীযা’দ ও বশর
নীমে উ যেফরেশতে ও নী মীশ খর
তৃতীয় শ্রেণি আদম সন্তান অর্থাৎ মানুষ
অর্ধেকে ফেরেশতার স্বভাব অর্ধেক গাধার। 
মানুষের স্বভাবের অর্ধেকে রয়েছে ফেরেশতার প্রবণতা। বাকি অর্ধেক তৈরি হয়েছে পশুর জৈবিক চাহিদা দিয়ে। পশুত্বের স্বভাবের অর্ধেক টানে নীচু-হীন কাজের দিকে। বাকি অর্ধেক ফেরেশতার স্বভাব তাকে আকর্ষণ করে ঊর্ধ্বলোকে, জ্ঞানবুদ্ধি, বিবেক ও নৈতিক পবিত্র চেতনার পানে। ফেরেশতাদের বা জীব-জানোয়ারের নিজস্ব স্বভাবের মধ্যে কোনো বিরোধ লড়াই নেই। ফেরেশতারা সদা পবিত্রতা ও আল্লাহর ইবাদত ও আদেশ পালনে নিমগ্ন। পশুরা জৈবিক তাড়নায়, পেটের চাহিদায় ও যৌনতার টানে সারাদিন ব্যস্ত। এর বাইরে অন্য কোনো টেনশন তাদের নেই। কিন্তু মানুষ দুই বিপরীত স্বভাব নিয়ে নিজের মধ্যে সর্বক্ষণ যুদ্ধরত। 
এই যুদ্ধে যখন মানবচরিত্রে ফেরেশতার স্বভাব জয়ী হয়, তখন তার মর্যাদা ফেরেশতাদেরও ছাড়িয়ে যায়। আর যার মধ্যে পশুত্ব ও জৈবিক কামনার স্বভাব জয়ী হয়, সে জন্তু-জানোয়ারের চেয়েও অধঃপতনে চলে যায়। 
সূরা ওয়াকিয়ার ৬-১১ আয়াতের বরাতে মওলানা মানুষকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করেন। এক শ্রেণি হজরত ঈসা (আ.) এর মতো বিমূর্ত অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তারা আল্লাহর মহান সত্তার সাগরে নিমজ্জমান। তারা বাহ্যিক আকৃতিতে মানুষ; কিন্তু মর্মগতভাবে জিবরাইল। তারা পবিত্রতা, শুদ্ধি ও সূচিতার এমন পর্যায়ে উন্নীত যে, তাদের আর কৃচ্ছ্রসাধনারও প্রয়োজন হয় না। আরেক শ্রেণির মধ্যে আছে জানোয়ারের স্বভাব, রাগ আর যৌনতার তাড়না। 
যে মানুষের জীবন রুহের নির্দেশে চালিত হয় কোরআনের ভাষায় সে ‘হায়াতান তাইয়্যেবা’ বা পবিত্র জীবনের অধিকারী। আর যার স্বভাবে রুহের মৃত্যু ঘটেছে, সে আস্ত পশু। জীব হিসেবে তার আছে দেহ আর দেহের চাহিদা। এরা আরও পাওয়া, আরও খাওয়ার পেছনে, যুদ্ধ-রক্তপাত ঘটিয়ে দেহের চাহিদা পূরণে রাতদিন ছুটে। তাদের চিন্তা, বিজ্ঞানচর্চা, আধ্যাত্মিক সাধনা সবকিছুর পেছনে থাকে আর কয়টা দিন দুনিয়াকে ভোগ করার বাসনা, তাড়না।
কে তাআল্লুক বা’ হামীন দুনিয়াস্তাশ
রাহ বে হাফতুম আসেমা’ন বর নীস্তাশ
তার যত সম্পর্ক এ দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত সব
তার সামনে খোলা নাই সাত আসমানের পথ।
তার সব চেষ্টা-তদবির, ইবাদত বন্দেগি, নেতৃত্ব, অর্থবিত্ত ও জ্ঞান-গবেষণার একমাত্র সম্পর্ক দুনিয়ার সঙ্গে। সাত আসমান, তার ওপরে আরশের সঙ্গে সম্পর্ক করার পথ তার সম্মুখে খোলা নেই। সেই চিন্তা তার মাথায় নেই। এদের জ্ঞানচর্চার, চেষ্টা-তদবিরের গন্তব্য খোঁয়াড় আর খড় পর্যন্ত। এরা জানে না, জানার চেষ্টাও করে না, আল্লাহকে পাওয়ার, নিজের আসল ঠিকানার জ্ঞান কোনটি। কোরআনে এ শ্রেণির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আনআম’ চতুষ্পদ জন্তু।
না’মে কাল আনআ’ম কর্দ অ’ন কওম রা’
যাঁকে নিসবত কূ বে ইয়াকযা নওম রা’
এই শ্রেণি আখ্যায়িত চতুষ্পদ জন্তুরূপে
কারণ ঘুম আর জাগরণে কি সম্পর্ক আছে? 
ঘুম আর জাগরণের মাঝে কি তুলনা হয়? নিশ্চয়ই না। অনুরূপ পূত চরিত্রের লোক আর অসৎচরিত্রের নাপাক লোকদের মাঝেও কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। মওলানা বলেন, জানোয়ারের প্রাণ নিয়ে যে বেঁচে আছে তার কাছে ঘুম ছাড়া আর কিছু নেই। গভীর ঘুমেও সে সুখ আর ভোগ ছাড়া কিছু দেখে না। এরা ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধিগুলোকে উল্টাভাবে দেখে। জীবন ও জগতের সঠিক জ্ঞান তাদের নেই। ফলে কল্পনা অনুমানগুলোকে বাস্তবতা বলে মনে করে। দুনিয়াবি তুচ্ছ জিনিসকে অতি মূল্যবান গণ্য করে, অথচ মানবীয় মহাসম্পদ মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিষয়গুলোকে তাচ্ছিল্যের নজরে দেখে। রুহকে গুরুত্ব দেয় না, নফসের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত থাকে। কোরআনুল কারিমে এরশাদ হয়েছেÑ ‘আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে; কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না। তাদের চোখ আছে তা দ্বারা দেখে না এবং তাদের কান আছে তা দ্বারা শ্রবণ করে না; এরা পশুর মতো। বরং এরা অধিকতর বিভ্রান্ত। এরাই গাফিল।’ (সূরা আরাফ : ১৭৯)।
মওলানা মানবজাতিকে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানান। কারণÑ
ইয়াকযা আ’মদ নওমে হায়ওয়ানী ন মান্দ
এনএকাসে হিসসে খোদ আায লওহ খান্দ
জাগরণ এলে থাকে না তখন জৈবিক নিদ্রা
নিজ অনুভবের প্রতিচ্ছবি পড়ে ফলক দেখে। 
যখন সত্যিকার জাগরণ আসে, তখন পশুর স্বভাবের নিদ্রা তিরোহিত হয়ে যায়। তখন মনের ফলকে নিজের আসল পরিচয় উদ্ভাসিত হয়। বুঝতে পারে এতদিনকার ঘুম ও স্বপ্ন ছিল কল্পনার প্রতিচ্ছবি, বাস্তবতা তার যোজন দূরে। এক ভিখারি ঘুমিয়েছিল লাঠিখানা পাশে রেখে বাটি বালিশ বানিয়ে। সুখ-স্বপ্নে সে চলে গেল অন্যলোকে। দেখে, বিশাল সম্পদ তার কাছে। চাকরবাকর বেষ্টিত জমিদারি নিয়ে তার সুখ কে দেখে। মধুর স্বপ্নে সে বিভোর ছিল। এরই মধ্যে এক বেরসিক জাগিয়ে দিল পথের ধারে গাছের নিচে নিদ্রিত দেখে। ভিখারি চোখ মেলে দেখে জমিদারি, ধনদৌলত, চাকরবাকর বলতে সব অবাস্তব। সেই লাঠি, ভিক্ষার বাটিই তার সম্বল। দুনিয়ার পেছনে নিজের জীবন, প্রতিভা সাধনা উজাড় করে দেওয়া লোকদের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই মওলানা ডাক দিয়ে যান, সময় থাকতে জাগ্রত হও, জীবন ও জগৎকে তার স্বরূপে দেখার চেষ্টা কর।
মওলানা বাদশাহর গোলামের কাহিনিতে ফিরে এসে বলেন, গোলাম তার অলসতা, অবহেলার দায় চাপাল বাবুর্চির ওপর। বাবুর্চি বলল, আমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। চিন্তা করে দেখ এর জন্য আসল দায়ী কে। গোলামের তখনও হুঁশ ফিরল না। নিজের দোষের উপলব্ধি তার জাগল না। বরং আরও স্পর্ধা দেখিয়ে বাদশাহর বরাবরে চিঠি লিখল। 
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
৪খ. বয়েত, ১৪৯০-১৫৩২)