আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বিশেষ প্রতিবেদন

লাল শাপলার সাতলার বিল

খান রফিক, বরিশাল
| প্রথম পাতা

দুই চোখ যেদিকে যায় সেদিকেই যেন লাল-সবুজে মাখামাখি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখা যায় বরিশালের সাতলা, হারতা আর বাগধা গ্রামীণ জনপদের বিস্তীর্ণ বিলে। প্রায় শত কিলোমিটারজুড়ে প্রতিদিন হাজার হাজার শাপলা ফুটছে। এমন বিরল দৃশ্য দেখতে আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারণা। তিন মাস এ সাতলার বিলে ঢল দেখা যায় দর্শনার্থীদের। প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্যের স্থানটিকে আকৃষ্ট করতে দাবি উঠেছে ‘সাতলার বিল’ ঘিরে পর্যটন স্পট গড়ে তোলার। 

বরিশাল নগরী থেকে উজিরপুর কিংবা আগৈলঝাড়ার সাতলার বিল যেতে প্রায় ১ থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেহাল পথ পাড়ি দিতে নিদারুণ কষ্ট সহ্য করতে হলেও থামছে না দর্শনার্থীদের ভিড়। জানা যায়, বর্ষা থেকে শরতের শেষ পর্যন্ত বিলাঞ্চলের জলাশয়ে ও নিচু জমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে লাল শাপলা। উজিরপুরের সাতলার বিলে প্রকৃতিপ্রেমীদের চাপ অপেক্ষাকৃত বেশি। স্থানীয়দের তথ্যমতে, চার থেকে পাঁচ বছর ধরে এ সাতলার বিলে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। ইদানীং এটি শহুরে মানুষের জন্য অন্যতম একটি দর্শনীয় স্পট হিসেবে পরিণত হয়েছে। এ বিলকে ঘিরে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হচ্ছে। সাতলার বিল ঘুরে আসা একাধিক দর্শনার্থী জানান, বিলের আশপাশে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা রয়েছে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের বিলের গভীরে নিয়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট সময় ঘুরতে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। এ সময় দর্শনার্থীদের কেউ কেউ বিল থেকে শাপলা তুলেন। আবার স্থানীয় একটি শ্রেণি শাপলা তুলে বিক্রিও করছে; কেউ বা বিলে মাছ শিকার করছে।
সম্প্রতি সাতলার বিল পরিদর্শনে যান বিএম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, যেখানে শাপলা ফুল সবচেয়ে বেশি ফোটে, সেটি মূলত সাতলা ও হারতার মধ্যস্থল; যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘কালবিল’ বলা হয়। সকালে ফুল ফোটে। বৃষ্টি থাকলে প্রাকৃতিক দৃশ্য আরও মনোরম হয়। তিনি বলেন, স্থানীয়রা কিছু নৌকায় দর্শনার্থীদের ঘুরে দেখান। অবশ্য তাদের আর্থিক চাহিদা নেই। যে যা দেন, সেটাই নেন। সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হুমায়ুন বলেন, এটি মূলত প্রাকৃতিক জলাধার। সিজনে ধানও হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। মানুষ বর্ষায় আসে। এ স্পটটির গ্রামীণ ও প্রাকৃতিক দৃশ্য টিকিয়ে রেখে সরকারিভাবে দর্শনীয় স্পট করা যেতে পারে। তবে এজন্য প্রতিবন্ধকতা হিসেবে তিনি মনে করেন, স্থানীয়রা ব্যাপক বালু তুলছেন, যা বিলের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাছাড়া মাছের ঘেরও আর এক ধরনের বাধা। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করাও দরকার।
উজিরপুরের সাতলার স্থানীয় ডিঙির মাঝি মোহাম্মদ আলী বললেন, আগে বিলে প্রচুর শাপলা জন্মালেও এখন পলি পড়ে বিল ভরাট হতে থাকায় পানি কমে যাচ্ছে, ফলে আগের চেয়ে কমে যাচ্ছে শাপলার উৎপাদন। বিলের বিভিন্ন অংশে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণেও শাপলা কমে যাচ্ছে। পাশের আগৈলঝাড়া উপজেলার দক্ষিণ বারপাইকা গ্রামের প্রবীণ বাবু লাল বৈদ্য জানান, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র মাসে উপজেলার বারপাইকা, আমবৌলা, কদমবাড়ি, পয়সারহাট, আস্কর, নাঘিরপাড়সহ বিভিন্ন জলাশয়ে শাপলা ফুল ফোটে। বিলাঞ্চলে নয়নাভিরাম লাল শাপলা দেখা যায়। বিলের পর বিল এ শাপলা দেখতে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ান প্রকৃতিপ্রেমীরা। অনেকে আবার শাপলা বিক্রি করে জীবিকাও নির্বাহ করছেন। আবার একটি শ্রেণি বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। 
সাতলা ইউপি চেয়ারম্যান খালেক আজাদ বলেন, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আসছে এ শাপলার বিল দেখতে। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও আসছেন। তিনি মনে করেন, এখানকার গ্রামীণ জনপদের মানুষ সহজ-সরল। তাদের দিয়ে দর্শনার্থীদের কোনো ক্ষতি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে শাপলার বিলের প্রাকৃতিক দৃশ্য ধরে রাখতে এবং পর্যটন স্পট গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। উজিরপুর প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি ভ্রমণপিপাসু আ. রহিম সরদার বলেন, উজিরপুরের সাতলা, হারতা এবং পাশের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা প্রকৃতির অপার সম্ভাবনাময় স্পট সাতলার বিল। শত একর জমির ওপর প্রাকৃতিকভাবে বিলটি গড়ে উঠেছে। বরিশালসহ নানা স্থান থেকে বিভিন্ন রুটে এ বিলে আসছেন দর্শনার্থীরা। তিনি বলেন, সরকারি কিছুটা সাপোর্ট পেলে এ বিল বরিশালের অন্যতম পর্যটন স্পট হতে পারে। 
এজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ভালো করতে হবে। বিল এলাকায় একটি বাংলো বা রিসোর্ট, কিছু বেঞ্চ স্থাপন এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, শাপলার বিল মনুষ্য কারণে ধীরে ধীরে কমছে। এ অপরূপ প্রকৃতিকে টিকিয়ে রেখে এটিকে দর্শনীয় স্পট হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।
এ ব্যপারে উজিরপুর ও আগৈলঝাড়া উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন তালুকদার এবং নাসির উদ্দিন জানান, শাপলা সাধারণত তিন রঙের হয়ে থাকেÑ লাল, সাদা এবং হালকা বেগুনি। বর্ষা থেকে শরতের শেষ পর্যন্ত শাপলা ফোটে। মূলত এর মধ্যে সাদা ফুল বিশিষ্ট শাপলা সবজি হিসেবে ও লাল রঙের শাপলা ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ। শাপলা খুব পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। সাধারণ শাকসবজির চেয়ে এর পুষ্টিগুণ অনেকে বেশি। শাপলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম। এ দুই কৃষিবিদ মনে করেন, সাতলা, হারতা, বাগধা এলাকা দর্শনীয় স্পট হয়ে উঠেছে। তবে পরিকল্পনার অভাবে শাপলা কমে আগাছা বেড়েছে। প্রাকৃতিক এ বিল ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।