আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

পরিকল্পিত হত্যা : নিহত শিমুলের স্ত্রী ৭২ ঘণ্টায় আরও ৩ হত্যাকা-

রূপগঞ্জে তিন ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার

রূপগঞ্জ প্রতিনিধি
| প্রথম পাতা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নিহত ব্যবসায়ী নুর হোসেন বাবুর স্বজনের আহাজারি। শুক্রবার তোলা ছবি ষ আলোকিত বাংলাদেশ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহর থেকে রাজধানীর তিন ব্যবসায়ীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। শুক্রবার সকালে উপজেলার পূর্বাচল উপশহরের কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোড (৩০০ ফিট) সড়কের আলমপুর এলাকার ১১নং সেতুর নিচ থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। নিহতদের পরিবারগুলো দাবি করছেন তাদের মানিকগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে আটকের পর পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তবে আটক ও হত্যার দায়ভার অস্বীকার করেছে মানিকগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। নিহত একজনের কাছ থেকে নেশাজাত ৬৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। এদিকে, এনিয়ে রূপগঞ্জে ৭২ ঘণ্টায় ছয়টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। ৩ দিনে এ ছয় খুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর ফলে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে রূপগঞ্জ।

সূত্র জানায়, শুক্রবার ভোরে উপজেলার পূর্বাচল উপশহরের কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোড (৩০০ ফিট) সড়কের আলমপুর এলাকার ১১নং সেতুর নিচ থেকে রাজধানীর মুগদা-মান্ডা এলাকার জুট ব্যবসায়ী নুর হোসেন বাবু (২৯), শিমুল ইসলাম (২৬) ও সোহাগ ভূইয়ার (৩৪) গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। তাদের প্রত্যেককেই খুব কাছ থেকে বুকে এবং মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের পরিবারগুলো দাবি করেছে আটকের পর তাদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৬৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটও উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে এর দায়ভার স্বীকার করেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো দপ্তর।
রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহরের কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোড সড়কের আলমপুর এলাকার ১১নং সেতুর নিচে পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ অজ্ঞাতনামা তিন যুবকের লাশ পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশগুলো উদ্ধার করে। এ সময় লাশের দেহ তল্লাশি করে একজনের পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করে নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বললে তারা এসে লাশের পরিচয় শনাক্ত করেন। নিহতরা হলেন মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার বিক্রমপুর গ্রামের মৃত আবদুল ওহাবের ছেলে নুর হোসেন বাবু, তার ভায়রা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গুড়েলা এলাকার আবদুল মান্নানের ছেলে শিমুল ও বর্তমানে রাজধানীর মুগদা-মান্ডা এলাকার হাজীর বাড়ির ভাড়াটিয়া রাজধানীর বনানী-মহাখালী দক্ষিণপাড়া এলাকার মৃত শহিদুল্লাহর ছেলে সোহাগ ভূইয়া। তারা তিনজনই মুগদা এলাকায় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গার্মেন্ট পণ্যের ব্যবসা করতেন। এদের মধ্যে নিহত শিমুলের প্যান্টের পকেট থেকে নেশাজাত ৬৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে । নিহত প্রত্যককেই মাথায়, বুকেসহ একাধিকস্থানে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান ওসি।
ঢাকা-ঝিনাইদহ রুটের পূর্বাশা বাস সার্ভিসের সুপারভাইজার আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ১২ সেপ্টেম্বর বুধবার রাতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার লাউতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে তিনজন গাড়িতে ওঠেন। ১৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ভোরে গাড়িটি ফেরি পার হয়ে পাটুরিয়া ঘাটে আসার পর ডিবির জ্যাকেটপরা ১৫ থেকে ১৬ জন দুটি হায়েস প্রাইভেট কার নিয়ে তার গাড়িকে ব্যারিকেড দেয়। এ সময় ২৯ জন যাত্রীর মধ্য থেকে তাদের তিনজনকে নামিয়ে নিয়ে যায় তারা। তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তারা নিজেদের মানিকগঞ্জ জেলা ডিবি পুলিশ পরিচয় দেয় এবং আটককৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে তাদের জানায়। 
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে পাটুরিয়া ঘাটে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের জন্য আমাদের বিশেষ অভিযান চলছিল। তিনি সে অভিযানে উপস্থিত ছিলেন। তবে আমরা কাউকে আটক করিনি। ‘ক্রসফায়ার’র তো প্রশ্নই ওঠে না। নিহতদের লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে রূপগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। 
অজ্ঞাত কারণে পরিকল্পিত হত্যা-নিহত শিমুলের স্ত্রী : নিহত ব্যবসায়ী শিমুলের স্ত্রী নীপা ইসলাম জানান, তার স্বামী শিমুল, ভগ্নীপতি নুর হোসেন বাবু ও তাদের ব্যবসার পার্টনার সোহাগ মিলে ১২ সেপ্টেম্বর সকালে তাদের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের সদর থানাধীন মহারাজপুর ইউনিয়নের গুরেলা গ্রামে বেড়াতে যায়। জরুরি কাজে সেদিন রাতেই আবার তারা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ভোরে গাড়িতে থাকা অবস্থা থেকেই সবার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে গাড়ির সুপারভাইজারের মাধ্যমে জানতে পারে পাটুরিয়া ফেরিঘাটের সামনে থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ভোরে ডিবি পুলিশের জ্যাকেটপরা ১৫ থেকে ১৬ জন ব্যক্তি তাদের আটক করে নিয়ে গেছেন। নিহতের আত্মীয়স্বজনরা মানিকগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব কার্যালয় ও স্থানীয় থানা-হাসপাতালগুলোতে তাদের সন্ধান করেও পাননি। শুক্রবার সকালে রূপগঞ্জ থানা পুলিশের মাধ্যমে তার স্বামীসহ তিনজন নিহতের সংবাদ পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে এসে লাশগুলো শনাক্ত করেন। নিপা ইসলাম দাবি করেন, তার স্বামীসহ নিহত কারও বিরুদ্ধে কোনো থানায় কোনো ধরনের মামলা এমনকি সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত নেই। তিনি বলেন, পুলিশ আটক করে তাদের অজ্ঞাত কারণে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।
৭২ ঘণ্টায় আরও তিন হত্যাকা- : এদিকে ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার বিরাব বীর ফকিরতলার টেক এলাকা থেকে মামুন মিয়া (৩০) নামে স্থানীয় এক টমটম চালকের লাশ উদ্ধার করে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। রাতের আঁধারে কে বা কারা তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যার পর লাশ ওইস্থানে ফেলে রাখে। একইদিন ভোরে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের কেওডালা দক্ষিণপাড়া এলাকার একটি পুকুর থেকে পা-মুখ বাঁধা এবং পরিধেয় পোশাক ছেঁড়া অবস্থায় অজ্ঞাতনাম (২৪) এক যুবতীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রাতের যে কোনো সময় দুর্বৃত্তরা যুবতীকে ধর্ষণের পর পা-মুখ বেঁধে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ পুকুরে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায় বলে পুলিশের ধারণা। আগেরদিন ১২ সেপ্টেম্বর ভোররাতে পূর্বাচল উপশহরের ৮ নম্বর সেক্টর এলাকা থেকে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার নারিন্দা রোড এলাকার ফুল মিয়ার ছেলে দেলোয়ার হোসেনের (৩৫) গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি নিহত দেলোয়ার ডাকাত দলের সদস্য এবং ডাকাতির মালামাল ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে গুলি বিনিময়কালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে সে। এদিকে ছয়টি হত্যাকা-ের মোটিভ কিংবা কাউকে এখনও আটক করতে পারেনি পুলিশ। 
রূপগঞ্জ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, হত্যাকা-গুলোর মধ্যে মাত্র একজন এ উপজেলার বাসিন্দা। অন্যগুলো ডাম্পিং হিসেবে আমাদের এলাকা ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, হত্যার মোটিভ খোঁজা হচ্ছে। অচিরেই অপরাধীরা ধরা পড়বে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।