আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

নির্বাচনি হাওয়া- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২

নৌকা-ধানের শীষ চান অনেকে, লাঙ্গলে এক

ফরহাদুল ইসলাম পারভেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
| শেষ পাতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে। মহাজোট ও ২০ দলীয় জোট থেকে কে প্রার্থী হবেন, কিংবা প্রার্থী কি সরাইল থেকে নাকি আশুগঞ্জ থেকে হবেন, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনার অন্ত নেই। সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা নিয়ে এ আসনটি গঠিত।

দিন যত যাচ্ছে, মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তৎপরতা তত বাড়ছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন অন্তত এক ডজনের বেশি নেতা। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি থেকে বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা একমাত্র প্রার্থী। ইসলামী ঐক্যজোট এ আসনে প্রার্থী দেবে। প্রার্থী রয়েছে জাসদেরও (আম্বিয়া-প্রধান)।

সম্ভাব্য প্রার্থীরা ছুটে চলছেন ভোটারদের কাছে। ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে দুই উপজেলা। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, ধর্মীয় উৎসবকে সামনে রেখে ভোটারদের শুভেচ্ছা জানিয়ে এসব ব্যানার-পোস্টার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মতবিনিময় করছেন।

মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে রয়েছে দলীয় বিভক্তি। বিশেষ করে সরাইল আওয়ামী লীগে বিভক্তি রেখা স্পষ্ট। ২০১২ সালের ২১ অক্টোবর আওয়ামী লীগ নেতা একেএম ইকবাল আজাদ নিহত হওয়ার পর সেখানে এক প্রকার অস্তিত্ব সংকটে পড়ে আওয়ামী লীগ। আর এ সুযোগটি কাজে লাগায় জাতীয় পার্টি। যদিও জাতীয় পার্টি সেখানে বেশ সুদৃঢ় অবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। দুই উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসন। সরাইল উপজেলায় প্রায় দুই লাখ ও আশুগঞ্জে প্রায় এক লাখ ভোটার রয়েছে। যে কারণে কোন উপজেলা থেকে প্রার্থী হবে, এ নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। দুই উপজেলার লোকজনই চাইছেন তাদের নিজ নিজ এলাকার প্রার্থী মনোনয়ন পেয়ে বিজয়ী হয়ে এলাকার উন্নয়ন করুন।

আওয়ামী লীগ : আওয়ামী লীগে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকা বেশ দীর্ঘ। দিন

দিন তাদের সংখ্যা বেড়ে চলছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক উম্মে ফাতেমা নাজমা আজাদ (শিউলী আজাদ) এবারও মনোনয়নের অন্যতম দাবিদার। তবে ওই সময়ে জোটগত কারণে আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ায় তিনি নির্বাচন করতে পারেননি। শিউলী আজাদ ‘দলীয় কোন্দলে’ হত্যাকা-ের শিকার সরাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক একেএম ইকবাল আজাদের স্ত্রী।

বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঈন উদ্দিন মঈন নির্বাচনকে সামনে রেখে সরাইল ও আশুগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। এরই মধ্যে তিনি একটি শক্ত অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশ আইন সমিতির সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান আনসারী দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনি এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মাঠে আছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট তানভীর হোসেন কাউছারও মনোনয়নের অন্যতম দাবিদার হয়ে উঠেছেন। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও পৌর মেয়র নায়ার কবির মনোনয়ন চাইবেন নাÑ এটা এক প্রকার নিশ্চিত। আসনটি পুনরুদ্ধারে আওয়ামী লীগের মধ্যে ঐক্য জরুরি বলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মনে করছেন।

বিএনপি : আসনটি মূলত ছিল বিএনপির ঘাঁটি। বিএনপির রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা উকিল আবদুস সাত্তার ভূইয়া এ আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবারও তিনি প্রার্থী হবেন বলে আলোচনা আছে। এ আসনে বিএনপির মাঠের নেতা সরাইল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করছেন। তিনি বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি এসএন তরুণ দে প্রায় তিন বছর ধরে এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক ছাত্রদল নেতা শেখ মোহাম্মদ শামীম নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকায় সময় দিচ্ছেন। এছাড়া সরাইল উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদুর রহমানও মনোনয়ন প্রত্যাশী।

জাতীয় পার্টি : জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা এ আসনে দলের একমাত্র মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি এলাকায় প্রচুর সময় দেন। এ আসনটি ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনটি মহাজোট থেকে চাইবে জাতীয় পার্টি। এ অবস্থায় জাতীয় পার্টিকে কয়টি আসন দেওয়া হয় এর ওপর নির্ভর করবে জিয়াউল হক মৃধার মনোনয়ন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (সদর-বিজয়নগর) আসনে এরই মধ্যে তার মেয়েজামাই ও পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া টিপুকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তবে মহাজোটের সঙ্গে জোট হলে এবারও মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী বর্তমান এমপি। 

ইসলামী ঐক্যজোট : এ আসনে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মুফতি মো. আবুল হাসনাত আমিনী। তার বাবা প্রয়াত মুফতি মো. ফজলুল হক আমিনী এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসলামী ঐক্যজোটের ঐক্যের যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবায়িত হলে মহাজোট থেকেও মনোনয়ন পেতে পারেন তিনি।  

জাসদ : জাসদের (আম্বিয়া-প্রধান) প্রার্থী হিসেবে এ আসনের জন্য প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফসির। 

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও মনোনয়ন প্রত্যাশী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, সরাইল-আশুগঞ্জ মূলত বিএনপির ঘাঁটি। এছাড়া আওয়ামী লীগে রয়েছে ব্যাপক কোন্দল। তাই বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু বলেন, ছাত্র রাজনীতি থেকেই আমি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরেই আমি নির্বাচনের মাঠে আছি। এছাড়া দলের প্রতি আমার ত্যাগ বিবেচনা করে মনোনয়ন পাব বলে আশা করি।

বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন মঈন বলেন, ’৭৫ পরবর্তী সময়ে এ আসনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসেনি। যে কারণে দুই উপজেলাতেই কাক্সিক্ষত কোনো উন্নয়ন হয়নি। এ অবস্থায় এখানে আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হলে সরাইল-আশুগঞ্জের উন্নয়ন সম্ভব। তৃণমূল থেকে মতামত নিয়ে যদি প্রার্থী দেওয়া হয় তাহলে আমি আমার ব্যাপারে যথেষ্ট আশাবাদী ইনশাল্লাহ। 

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকার বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি আসনের মধ্যে এ একটিতেই মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির এমপি রয়েছেন। কিন্তু ওই এমপি সরাইল ও আশুগঞ্জে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থাও সেখানে ভালো নয়। আমি মনে করি, এ আসনে মহাজোট থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কোনো বিকল্প নেই। 

সরাইল-আশুগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের জোটের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে জোট হলে আমি মনোনয়নের পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। আমার মনে হয়, এবার সরাইল আর আশুগঞ্জে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে। আওয়ামী লীগ এখানে মনোনয়ন আশা করে কীভাবে। তাদের দলেই তো সমস্যা রয়েছে। আমার জানামতে তাদের দলে মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা এক ডজনেরও বেশি।