আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা যুক্তফ্রন্টের

পাঁচ দাবি ও ৯ লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রথম পাতা

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ড. কামাল

একের পর এক আলোচনা, বৈঠক শেষে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তফ্রন্ট। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাঁচ দাবি ও ৯ লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য এ ঐক্যের ঘোষণা দেওয়া হয়। আগামী সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে পাড়ায় পাড়ায় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, সময় এসেছে পরিবর্তনের। সমতার ভিত্তিতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে এখনই ঐক্য প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে হবে। শনিবার বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘোষণা জাতীয় শহীদ মিনারে দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে তাদের অনুষ্ঠান করতে না দেওয়ায় জাতীয় প্রেসক্লাবে তারা এ ঘোষণা দেন। 

জাতীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে তোলা দাবিগুলো হলোÑ ১. আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বর্তমান সংসদ ভেঙে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচনকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রার্থী হতে পারবেন না। ২. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। ৩. কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রছাত্রীসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে হবে। এখন থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা যাবে না। ৪. নির্বাচনের এক মাস আগে থেকে নির্বাচনের পর ১০ দিন পর্যন্ত  মোট ৪০ দিন প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে। ৫. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের চিন্তা ও পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর যুগোপযোগী সংশোধন করতে হবে। 
এছাড়া জাতীয় ঐক্য ৯টি লক্ষ্যের কথাও জানিয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবে, এ লক্ষ্যে তা বলা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলোÑ ১. বাংলাদেশে স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থা থেকে পরিত্রাণ; এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাহী ক্ষমতা অবসানের লক্ষ্যে সংসদ, সরকার, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, ন্যায়পাল নিয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করা। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও সৎ, যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের জন্য সাংবিধানিক কমিশন গঠন করা। ২. দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা। দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি কঠোর হাতে দমন ও দুর্নীতির দায়ে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা। ৩. বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি,  বেকারত্বের অবসান ও শিক্ষিত যুবসমাজের সৃজনশীলতা ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাকে একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা। ৪. কৃষক-শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সরকারি অর্থায়নে সুনিশ্চিত করা। ৫. জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতি ও দলীয়করণ থেকে মুক্ত করা। ৬. বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা আনা, সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। ৭. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ও নেতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে ইতিবাচক, সৃজনশীল এবং কার্যকর ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। ৮. ‘সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’Ñ এ নীতির আলোকে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। 
এ নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ ইত্যাদির ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া। ৯. বিশ্বের সব প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে পাড়ায় পাড়ায় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সময় এসেছে পরিবর্তনের। সমতার ভিত্তিতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে এখনই ঐক্য প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে হবে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের উদাহরণ টেনে ড. কামাল বলেন, ‘আমরা কোটার তরুণদের কাছ থেকে আন্দোলনের রূপ ধারণ করতে পারি। কোটা সংস্কারের দাবি শতভাগ সঠিক। অথচ সরকার শিক্ষার্থীদের এমন যৌক্তিক দাবির সঙ্গে বিরোধিতা করছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ-ছাত্রলীগ মিলে হামলা করছে। তরুণ শিক্ষার্থীরা হাল ছাড়েনি। তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের কাছ থেকে আন্দোলন শিখতে পারি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করল, তাও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বিশেষ শিক্ষা।’ 
সংক্ষিপ্ত আলোচনায় ড. কামাল বলেন, সমাজে যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে, তা থেকে মানুষ মুক্তি চায়। আর একমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচনই পারে জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দিতে। খুন, হত্যা, দুর্নীতি থেকে মানুষ মুক্তি চায়। আর এ মুক্তি আন্দোলনে শরিক হতেই আমরা ঐক্য প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছি। এদিকে যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বি. চৌধুরী) সংবাদ সম্মেলনে থাকার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে থাকতে পারেননি। বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহী বি. চৌধুরীকেও দেখা যায়নি সংবাদ সম্মেলনে। বি. চৌধুরীর অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে যুক্তফ্রন্টের অন্যতম নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তবুও তিনি সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু পথেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার গাড়ি ফেরত যায়। তার ইসিজি করা হচ্ছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ একই তথ্য জানিয়েছেন যুক্তফ্রন্টের আরেক নেতা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও। সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেনসহ অন্য নেতারা বক্তব্য রাখেন।