আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ডেঙ্গুর লক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া

বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

এ বছর ১১ জনের মৃত্যু : আক্রান্ত ৪ হাজার

নেসার উদ্দিন আহাম্মদ
| প্রথম পাতা

রাজধানীসহ সারা দেশে বেড়ে গেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। সে সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন ডেঙ্গু জ্বরের রোগীরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, প্রচ- জ্বর, বমি, গা-ব্যথা এবং কারও কারও ক্ষেত্রে হাতে-পায়ে ফুসকুড়ি কিংবা র‌্যাশ নিয়ে ডেঙ্গু জ্বরের রোগীরা আসছেন হাসপাতালে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রায় প্রতিদিনই রক্তের খোঁজে ছুটছেন স্বজনরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী রাজধানীতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩ হাজার ৯৮৯ জন। এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৬১৫ জন। মারা গেছেন ১১ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা তিন এবং খুলনা বিভাগে একজন। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজেদেরই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সেবা উপ-তত্ত্বাবধায়ক অফিস থেকে আলোকিত বাংলাদেশকে জানানো হয়, শনিবার ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৫ জন। ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৯৪ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় গেছেন ৩৪৯ জন। তাদের মধ্যে আক্রান্ত একজন রোগী মারা গেছেন।   

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৯৮৯ জন। এ সময় মারা গেছেন ১১ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন (ভর্তি) আছেন ২৯৩ জন। মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তি আছেন ৬৫ জন। চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন ১৭৩ জন। মারা গেছেন একজন। ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৫৮ জন। এর মধ্যে দুই শিশু মারা যায়। বর্তমানে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কোনো রোগী ভর্তি নেই।  

এ বিষয়ে বঙ্গুবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বর হয়ে থাকে। শীতের সময় কমে আসে। তিনি বলেন, এ সময় জ্বর বা গায়ে ব্যথা হলে ডেঙ্গুর কথা মাথায় রাখতে হবে। সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর তেমন মারাত্মক রোগ নয়। অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, সাধারণ ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর যখন বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের প্রমাণ মেলে (যেমন, মাড়ি বা নাক থেকে রক্তক্ষরণ, মলের সঙ্গে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি), তখন একে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বলা হয়। অধিক রক্তক্ষরণের ফলে শরীরের জলীয় উপাদান কমে যায়। এতে রক্তচাপ কমে। এটাই ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু চার বার হতে পারে। ডেঙ্গুর জন্য আলাদা চার রকম ভাইরাস আসে। আমরা মেডিকেল টার্মে বলি ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। একবার ডেঙ্গু হলে ডেঙ্গুর একটি ভাইরাসে ইউমোনিটি হয়। বাকি তিনটি থেকে যায়। এ তিনটিতে আবার আক্রান্ত হতে পারে।  
অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু হওয়ার পর ৪ থেকে ৫ দিনে জ্বর ভালো হয়ে গেলে কেউ যেন মনে না করে ভালো হয়ে গেছি। মেডিকেল টার্মে এটাকে ক্রিটিক্যাল প্রিয়ড বলে। ৫ থেকে ৭ দিন বেশি ঝুঁকি থাকে। এ সময় রক্তক্ষরণ হতে পারে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া হচ্ছে ভাইরাসজনিত রোগ যা এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। সাধারণ চিকিৎসাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া জ্বর ভালো হয়ে যায়। তবে হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বর ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম মারাত্মক হতে পারে। এ জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, মাংসপেশিতে, চোখের পেছনে ও হাড়ে প্রচ- ব্যথা, চামড়ায় লালচে ছোপ (র‌্যাশ) দেখা দিতে পারে। 
বিশেষজ্ঞরা জানান, থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। জমে থাকা বৃষ্টির পানি থাকলে মশার প্রজনন বাড়ে। তাই বাড়ি বা বাড়ির আঙিনার কোথাও যেন পরিষ্কার পানি জমে না থাকে সে ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তদের সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে। এছাড়া যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ব্যথার ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তবে অ্যাসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথার ওষুধ খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ৪ থেকে ৫ দিন জ্বর থাকলে ঘরে বসে না থেকে রোগীদের ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তাসমিন সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের নিয়মিত কাজের অংশই হচ্ছে এডিস মশার সার্ভে করা। এ সার্ভের রিপোর্ট সিটি করপোরেশনকে দিয়ে দেই, যাতে এডিস মশা প্রতিরোধে সহজে তারা কাজ করতে পারে। জানুয়ারি, মে ও আগস্ট মাসের সার্ভে রিপোর্ট এরই মধ্যে সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মানুষকে সচেতন করতে আমরা সংবাদপত্রে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। 
অধ্যাপক সানিয়া তাসমিন বলেন, ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্টের জন্য আমাদের একটি গাইডলাইন আছে কীভাবে ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিতে হবে। এটা প্রথম বের হয়েছিল ২০০০ সালে। ২০১৮ সালে এর চতুর্থ সংস্করণ বের হয়েছে। আমরা চিকিৎসকদের কাছে সফট কপি পাঠিয়ে দিয়েছি। তারপরও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ যেসব জায়গায় ডেঙ্গু রোগী বেশি ভর্তি হয়, তাদের আইসিইউর চিকিৎসকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছি। নিয়মিত সিটি করপোরেশনের সঙ্গেও মিটিং হচ্ছে। 
৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মশা নিধন নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সাংবাদিকদের বলেন, দুই-তিন বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও এটি আতঙ্ক, কিংবা উদ্বেগজনক কিংবা মহামারি পরিস্থিতি পর্যায়ে এখনও নেই। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে এডিস মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে ডিএসসিসি। ১৫ দিনব্যাপী এ কর্মসূচির আওতায় ৫৭ ওয়ার্ডে, এডিস মশার লাভা ও প্রজননস্থল ধ্বংস করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে সারা দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৭৬৯, মারা গেছেন ৮ জন। ২০১৬ সালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৬০, মারা গেছেন ১৪ জন। ২০১৫ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ১৬২, মারা গেছেন ছয়জন। ২০১৪ সালে ভর্তি হয়েছেন ৩৭৩ জন। কেউ মারা যাননি। ২০১৩ সালে ১ হাজার ৪৭৮ জন এবং ২০১২ সালে ১ হাজার ২৮৬ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। ২০১১ সালে ১ হাজার ৩৬২ জন ও ২০১০ সালে ৪০৯ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসেন।