আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

টেকসই অর্থনীতির জন্য সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ব্যাংক সম্পৃক্ত করতে হবে

সুদৃঢ় কাঠামো গড়ে তোলার জন্য আর্থিক সেবাবঞ্চিত জনসাধারণকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামে ব্যাংকের শাখা সম্প্রসারণের পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে

রেজাউল করিম খোকন
| সম্পাদকীয়

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা নিয়ে ১২১৩তম শাখা হিসেবে গুইমারা বাজারে নতুন একটি শাখা চালু করেছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ও দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। প্রত্যন্ত পার্বত্য এলাকায় চালু হওয়া নতুন এই শাখায় সরকারি ট্রেজারি লেনদেন সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সোনালী ব্যাংকের এই শাখায় ট্রেজারি-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের বিভিন্ন শাখায় কোনো সার্ভিস চার্জ ছাড়াই বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত দুস্থ মহিলা ভাতা, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি, অসচ্ছল (অক্ষম) প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, এসিড দগ্ধ মহিলা ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন কার্যক্রম ও দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদানসহ কম-বেশি ৫১ ধরনের আর্থিক সেবা প্রদান করা হয়। সুবিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণকে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সেবা প্রদান করে চলেছে রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন দেশের সর্ববৃহৎ এই বাণিজ্যিক ব্যাংক। শহর-বন্দর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম, দুর্গম পার্বত্য এলাকায়ও সর্বস্তরের জনগণের কাছাকাছি রয়েছে সোনালী ব্যাংক। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক শহর-বন্দর-গ্রামজুড়ে তাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আর্থিক সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৫৮টি ব্যাংক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ৯টি সরকারি এবং ৯টি বিদেশি। বাকিগুলো বেসরকারি মালিকানাধীন।
বাংলাদেশে এতগুলো ব্যাংক থাকার পরও ব্যাংক হিসাবধারী ও সেবা গ্রহণের হার পাশর্^বর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন-ভাতা গ্রহীতার সংখ্যা এখনও ২ শতাংশেরও কম। সেবাগ্রহণের হার মাত্র ৩১ শতাংশ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অন্যতম লক্ষ্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (ঋরহধহপরধষ ওহপষঁংরড়হ) বাড়ানো। কিন্তু এত পদক্ষেপের পরও বাংলাদেশে মানুষকে ব্যাংকমুখী করা যাচ্ছে না। দেশের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ব্যাংকিং সেবার স্পর্শে এসেছে। অথচ শ্রীলঙ্কায় এখন ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই হার ৫৩ শতাংশ। এই চিত্রের পাশাপাশি বাংলাদেশে মাত্রা এক-তৃতীয়াংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব থাকার চিত্রটি স্বাভাবিকভাবে আমাদের হতাশ করে। দেশের সব মানুষকে ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এখনও পৌঁছতে পারেনি বাংলাদেশ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাংক খাতের সঙ্গে আরও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
দেশের যেসব অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছেনি, সেখানকার মানুষের কাছে ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের। বাংলাদেশে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং গড়ে তোলার আগে দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। প্রথমটি হলো, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বুথটি দেখতে যেন হয় ব্যাংকের শাখার মতো। দ্বিতীয়টা হলো, এজেন্টের সময় ও মনোযোগ যেন নিবিষ্ট থাকে বুথের প্রতি। কারণ, তাদের পরিশ্রমের ওপরেই নির্ভর করছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সাফল্য। দেশের সুষম উন্নয়নে ব্যাংকগুলোকে গ্রামাঞ্চলে শাখা খোলার জন্য দিলে সরকারি ব্যাংকগুলো গ্রামে গেলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো শহরের আশপাশে থেকেছে। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে গ্রামে শাখা খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা পূরণ হয়নি অনেকাংশে। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা নিয়ে শহর থেকে পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামেগঞ্জে। বিভিন্ন জেলার ইউনিয়নে ইউনিয়নে পাওয়া যাচ্ছে সেবা, স্কুলেও বসেছে ব্যাংক। ফলে এ সেবায় শহরে যে পরিমাণ হিসাব খোলা হয়েছে, গ্রামে তার চেয়ে সাতগুণ বেশি হিসাব খোলা হয়েছে। সারা দেশের এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবে জমা পড়েছে ২ হাজার ১২ কোটি টাকা ও ঋণ বিতরণ হয়েছে ১৩৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং এখন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে। অদূর ভবিষ্যতে দেশের সব নাগরিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় চলে আসবে হয়তো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। ব্যাংক হিসাব থাকা মানুষের মৌলিক অধিকারের সমতুল্য। দেশবাসী আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় থাকলে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। উন্নয়ন হয় টেকসই।
স্কুল ব্যাংকিং, কৃষকের জন্য ১০ টাকার হিসাব ও এজেন্ট ব্যাংকিং প্রবর্তনের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো। এত পদক্ষেপের পরও মানুষকে ব্যাংকমুখী করা যাচ্ছে না। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে। স্কুল শিক্ষার্থী ও কৃষকের জন্য খোলা ১০ টাকার হিসাবের অধিকাংশই এখন আর ব্যবহার হচ্ছে না। এসব কার্যক্রমে ব্যাংকের ওপর চাপ বাড়লেও অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি তা বিআইবিএম কর্তৃক আলোচ্য গবেষণা থেকে সুস্পষ্ট হয়েছে। মানুষের মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক সেবা গ্রহণে অনীহার পেছনে ব্যাংকেরও ভূমিকা থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন কেলেঙ্কারির ফলে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থায় খানিকটা হলেও চিড় ধরেছে। এর প্রভাব আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে পড়তে পারে। সেবার নিম্নমান, উচ্চ সার্ভিস চার্জ, অদক্ষতাসহ নানা কারণে এখনও অনেকে ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে চান না। এমন প্রবণতা তৈরির পেছনে যে ব্যাংকেরও ভূমিকা রয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 
বাংলাদেশ ৭ শতাংশের হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। কিন্তু এর সুফল সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না নীতি ও পরিকল্পনাগত কিছু সমস্যার কারণে। এ কারণে দারিদ্র্যের হার কমলেও বৈষম্য কমছে না। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ব্যাংকের অর্থে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার না থাকায় সহজে ঋণ নিয়ে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারছে না তারা। সঞ্চয়ও বাড়ছে না আশানুরূপভাবে। মানুষের হাতে প্রচুর অর্থ আটকে থাকছে, অর্থনীতিতে এর বিচরণ সংকুচিত হচ্ছে। অথচ সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছে। গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা নিয়ে যাওয়া এখনও সম্ভব হয়নি। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গ্রাম পিছিয়ে রয়েছে অনেক। গ্রামের মানুষকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে হলে প্রয়োজন উদ্যোগের। সে ক্ষেত্রে গেল কয়েক বছর ঢাকঢোল পিটিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নানা পদক্ষেপের কথা মানুষকে জানিয়েছে; কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিই চোখে পড়ছে না। ১০ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা স্কুল ব্যাংকিংয়ের সাফল্য আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। দেশে প্রচুর ব্যাংক আছে। প্রতিযোগিতাও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সে প্রতিযোগিতা স্বাস্থ্যকর নয়। এতে একদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অন্যদিকে এসএমই শিল্পোদ্যোক্তারা ঋণের অভাবে উৎপাদন কার্যক্রম ঠিকমতো চালাতে পারছেন না।
সুদৃঢ় কাঠামো গড়ে তোলার জন্য আর্থিক সেবাবঞ্চিত জনসাধারণকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামে ব্যাংকের শাখা সম্প্রসারণের পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। এতে অল্প ব্যয়ে অধিক মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা সহজ হবে। সরকারের একটি বড় এজেন্ডা হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। তবে প্রবৃদ্ধি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করবে কি না কিংবা প্রবৃদ্ধি হলেই সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে কি না তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য বেশ প্রকট। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, ব্যাংকিংসেবা গ্রহণকারীর হার বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
আর্থিক সচ্ছলতা লাভের উদ্দেশ্যে সঠিক আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সচেতনতা, জ্ঞান, দক্ষতা বৃদ্ধি। উন্নয়নের জন্য আর্থিক শিক্ষা (ঋরহধহপরধষ খরঃবৎধপু) অপরিহার্য। এই শিক্ষা জনমনে আর্থিক পণ্য ও সেবা গ্রহণের চাহিদা সৃষ্টি করে, মানুষকে করে তোলে ব্যাংকমুখী। এই শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ব্যাংকের পণ্য ও সেবা গ্রহণের উপকারিতা সম্পর্কে জানতে পারে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি পায়। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষকে, দরিদ্র ও স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বিভিন্ন ব্যাংক। এর মাধ্যমে আমাদের বিরাজমান দারিদ্র্য হ্রাস করা সম্ভব হবে এবং এর পাশাপাশি স্থিতি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। আমাদের প্রত্যাশা, খুব শিগগিরই বাংলাদেশের প্রতিটি নারী-পুরুষ ব্যাংকিং খাতের আওতায় চলে আসবে। তাদের সব ধরনের আর্থিক কর্মকা-ে সহযোগী হিসেবে ব্যাংক সব সময় পাশে থাকবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজমান ব্যাংকবিমুখ মনোভাব দূর করতে ব্যাংকগুলো যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে। তাদের সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যাংকিংসেবা গ্রহণের সাধারণ জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়াকেও জোরদার করতে হবে। আধুনিক সভ্য সমাজে বিরাজমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাংককে এড়িয়ে চলার কোনো সুযোগ কিংবা বিকল্প নেই, এটা সবাইকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। এর মাধ্যমেই দেশের অর্থনীতির ভিত আরও  মজবুত এবং টেকসই হবে দিনে দিনে। হ

 রেজাউল করিম খোকন
ব্যাংকার