আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বজরা শাহী মসজিদ

সবুজের বুকে সাদা আলো

ওমর আলী আশরাফ
| সভ্যতা ও সংস্কৃতি

মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন নোয়াখালীর বজরা শাহী মসজিদ। প্রযুক্তি ও উপকরণের দুর্লভ আমলের এসব স্থাপত্যশিল্প দেখে সত্যিই স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়। কিছুদিন আগে মসজিদ দেখতে গিয়ে মুগ্ধতায় শুধু স্তম্ভিতই হইনি; হয়েছি আন্দোলিত, বিমোহিত। নোয়াখালীর মাইজদী শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরায় অবস্থিত অনিন্দ্য সুন্দর এই মসজিদটি। মসজিদ লাগোয়া প্রধান সড়কের পশ্চিম দিকে তাকালেই দীঘির জলে মিনারের ছায়াÑ এপাশে পানি, ওপাশে মসজিদÑ কী সুন্দর আবহ!
মুঘল সম্রাট মুহম্মদ শাহের আমলে দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদের আদলে নির্মিত হয় বজরা শাহী মসজিদ। মুঘল জমিদার আমানুল্লাহ খান ১১৫৪ হিজরি, ১১৩৯ বঙ্গাব্দ, ১৭৪১ ঈসায়ি সালেÑ আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে সবুজের বুক ফুঁড়ে বিচিত্র কারুকার্যের এই মসজিদ নির্মাণ করেন। 
জমিদার আমান উল্লাহ খানের বাড়ি ছিল এখানে। তিনি তার বাড়ির সামনে ৩০ একর জমিতে একটি বিশাল দীঘি খনন করেন। দীঘির চারপাশে উঁচু পাড়। পশ্চিম পাড় নির্বাচন করেন মসজিদ নির্মাণের জন্য। প্রায় ২০ ফুট গভীর থেকে তৈরি হয় মসজিদের ভীত। দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৬ ফুট, প্রস্থ ৭৪ ফুট, উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ১.২২ মিটার। তিনটি ঊর্ধ্বমুখী মর্মভেদী নীলিমাছোঁয়া গম্বুজ। সুদৃশ্য মার্বেল পাথর দিয়ে সুশোভিত তাদের পিঠ। আলোয় ঝলমল করে সূর্যের রাগী তেজে, চাঁদের মায়াবী জোছনায়। তার দিগন্তবিভোর রহস্যভেদি আহ্বান আলোড়িত করে। 
মসজিদে প্রবেশের জন্য তিনটি দরজা। উপরেরটা গোল হয়ে বেঁকে আছে ধনুকের মতো। প্রবেশের পথে আছে কয়েকটি ছোট ছোট গম্বুজ। দূর থেকে চোখ পড়লেই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কেবলা দেয়ালে তিনটি কারুকার্য খচিত মেহরাব। মসজিদের বাইরের চারকোণে আকাশের দিকে মাথা তুলে স্থির হয়ে আছে অষ্টভুজ আকৃতির চারটি সুদৃশ্য বুরুজ।
গোটা মসজিদেই নকশাচিত্রে সুরম্য অঙ্কনে উৎকীর্ণ হয়ে ফুটে আছে মুঘল আমলের শিল্প নিদর্শন, স্থাপনা কৌশল। দেয়ালের ভাঁজে ভাঁজে, পিলারের বদনজুড়ে, তোরণের উদর ফুঁড়ে ফুল ফুটে আছে দর্শকদের দিকে চেয়ে হেসে, লতারা এঁকে বেঁকে উঠে গেছে ওপরে। মসজিদের প্রতিটি অংশ অতি সূক্ষ্মভাবে অলংকৃত করা হয়েছে বিভিন্ন রঙের চিনামাটির পাত্রের টুকরা দ্বারা।
মসজিদের সামনে সুদৃশ্য তোরণ। দেয়ালে তার শতরকম কারুশিল্পÑ ফুল, পাতা, লতাপাতা, ছোট ছোট খোপ কুমিরের খাঁজকাটা লেজের মতো খসখসে। তোরণের ওপর আরেকটি গম্বুজ। আকৃতিতে ক্ষুদ্র, গাম্ভীর্যে মহীয়ান। তাকে বেষ্টন করে আছে আলোকদানির মতো কতগুলো ছোট ছোট মিনার। তোরণে মিনারে সৌন্দর্যের সম্ভাষণ। তোরণ ও মসজিদ ভবনের মধ্যবর্তী স্থানে দিল্লির জামে মসজিদের মতোই খোলা চাতাল। মসজিদের ভেতরে মুসল্লিদের জন্য স্থান সংকুলান হয় না। আগুনঝরা রোদে পুড়ে শত শত মুসল্লির সঙ্গে আমরাও এখানে দাঁড়িয়ে জুমার নামাজে শামিল হলাম। চাতালের পাশে আছে মহিলাদের জন্য নামাজের ঘর।
জুমার খুতবা দিয়ে ইমামতি যিনি করলেন, তার নাম হাসান সিদ্দিকী। তার সপ্তম পূর্বপুরুষ, পবিত্র নগরী মক্কা শরিফের বাসিন্দা, সময়ের বিখ্যাত বুজুর্গ, মাওলানা শাহ আবু সিদ্দিকী এই মসজিদের প্রথম ইমাম ছিলেন। মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের বিশেষ অনুরোধে তিনি ইমামতির দায়িত্ব নিয়ে এখানে আসেন। এখন পর্যন্ত যোগ্যতা অনুসারে তার বংশধররাই এই মসজিদের ইমামতির মহান কর্তব্য পালন করে যাচ্ছেন।
স্থাপত্য সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যপ্রিয় মানুষ নিয়মিত বজরা শাহী মসজিদ পরিদর্শনে আসেন এবং এখানে নামাজ আদায় করেন। এমনই একজন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মাকসুদুর রহমান। তিন বলেন, ‘আমি সময় ও সুযোগ পেলেই এখানে চলে আসি। এই মসজিদ মুঘল স্থাপত্য নিদর্শন হওয়ায় একই সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্য দেখতে পারি এবং নামাজ আদায় করতে পারি। মসজিদের অনন্য সৌন্দর্য আমাকে বারবার এখানে আসতে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।’ 
মসজিদের বাউন্ডারি দেয়ালের গেটের উপরের অংশে এবং মসজিদের ভেতরের দেয়ালে লাগানো বাংলা ও ফার্সি শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, নির্মাণের প্রায় ১৭৯ বছর পর ১৯১১ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে বজরার জমিদার খান বাহাদুর আলী আহমদ ও মুজির উদ্দীন আহমদ মসজিদটি সংস্কার করেন। ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক এই মসজিদের ঐতিহ্য রক্ষা এবং দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য তাদের তদারকিতে নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এলাকাবাসী জানায়, প্রতœতত্ত্ব বিভাগ মসজিদ তাদের সংরক্ষণে নিলেও সরকারের পক্ষ থেকে মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যার কারণে ধীরে ধীরে মসজিদের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকালে গম্বুজ চুইয়ে পানি ঢুকে মসজিদের ছাদ ভিজে থিকথিকে হয়ে যায়। ওজু ও গোসলের জন্য তৈরি বিরাট দীঘিটি ভরাট হয়ে বিলে পরিণত হচ্ছে। তাই, মুসল্লিদের দাবিÑ সরকার যেন মসজিদটির যথাযথ সংস্কার করে দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মুসল্লিদের নির্বিঘেœ নামাজ আদায়ের সুযোগ করে দেয়। 

লেখক : জামিয়া আররাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ, ঢাকা