আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি রোধে সক্ষমতা অর্জন

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
| সম্পাদকীয়

ভূবিজ্ঞানীদের মতে, মাটির নিচে ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেট একে অন্যের দিকে ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো সময় এ দুটি প্লেটের একটি অন্যের ওপর পিছলে গেলে প্রচুর শক্তি খরচ হয়, ফলে দেখা দেয় ভূমিকম্প। আর এ শক্তি যত বেশি প্রবল হবে ভূকম্পনের মাত্রাও তত বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের প্রায় ৬০ ভাগ এলাকা তিনটি প্লেট বাউন্ডারির সংযোগস্থলে থাকার ফলে সেসব অঞ্চল বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ। তা ছাড়া বাংলাদেশের ছয়টি স্থানে মাটির নিচে বড় ধরনের ফাটল রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফাটলটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার লম্বা। এ ফাটলের কারণে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, রংপুর এবং 
দিনাজপুর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে

ভূমিকম্পে আবার কেঁপে উঠল দেশ। ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৩ মাত্রার মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ীর ভূমিকম্প অনুভূত হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে ২৯৩ কিলোমিটার উত্তরে, ভারতের আসামে। উৎপত্তিস্থল আসামের ধুবড়ি জেলার সাপাত গ্রামে রিখটার স্কেলে ভূকম্পনের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬ এবং ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে এবং পার্শ্ববর্তী ভুটানেও ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। এর আগেও বাংলাদেশে বহুবার ভূমিকম্পের রেশ এসে লেগেছে। ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট বিকাল ৪টা ৩৪ মিনিটে ৫৪ সেকেন্ডের ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার আগারগাঁও আবহাওয়া অফিস থেকে ৫২৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের চাউক অঞ্চল। বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪ মাত্রার ১১৫ এবং ৫ মাত্রার ১০টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে স্মরণকালের শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার ৭৪৫ কিলোমিটার দূরে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর মাত্র ৮১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে লামজংয়ের ২৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে পোখরা কেন্দ্রে ভূপৃষ্ঠের মাত্র ২ কিলোমিটার গভীরে। রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার সেই ভূমিকম্পে গুঁড়িয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ধারারা টাওয়ারের মাঝেই জীবন হারান ১৮০ মানুষ। শুধু রাজধানী কাঠমান্ডুতেই ৭০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণনাশ ঘটে। সেই ভূমিকম্পে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও চীনের বিভিন্ন স্থানে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। 
বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্পের এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি আগামী পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে মানুষকে। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির অবস্থানের নিরিখে বারবার ভূকম্পন আগামীতে রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেন না বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ, ভারত-মিয়ানমার ত্রিদেশীয় অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন, বৈশিষ্ট্য অনুসারে এর অবস্থানকে পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্প বলয়ের মধ্যে ধরা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলে ভূমিকম্প হওয়ার মতো প্লট বাউন্ডারি বা ফাটল রেখা সক্রিয় রয়েছে, ফলে যে-কোনো সময়ে দেশে ৮ থেকে ৯ মাত্রারও ভূমিকম্প হতে পারে। বাংলাদেশের ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানী ঢাকার মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে মধুপুর অঞ্চলে ৭.০ থেকে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো ভূতাত্ত্বিক ফাটল রয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অস্থির ভূস্তরের ওপর অবস্থান করায় এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে ইন্দো-বার্মা-হিমালয়ান, ইউরেশীয় একাধিক ভূস্তর ফাটলের লাইন বিস্তৃত থাকায় এবং এর সঞ্চালনের ফলে বাংলাদেশ এবং এর আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প বলয়টি বিশ্বের অন্যতম ক্রিয়াশীল বলে বিবেচিত। এসব অঞ্চলের বারবার মৃদু, মাঝারি এবং কখনও এরও অধিক মাত্রার কম্পনের কারণে ভূফাটলরেখাগুলো ক্রমে শিথিল ও নাজুক রূপ নিচ্ছে, যা আগামীতে ৭ থেকে ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটাতে পারে। 
ভূবিজ্ঞানীদের মতে, মাটির নিচে ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেট একে অন্যের দিকে ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো সময় এ দুটি প্লেটের একটি অন্যের ওপর পিছলে গেলে প্রচুর শক্তি খরচ হয়, ফলে দেখা দেয় ভূমিকম্প। আর এ শক্তি যত বেশি প্রবল হবে ভূকম্পনের মাত্রাও তত বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের প্রায় ৬০ ভাগ এলাকা তিনটি প্লেট বাউন্ডারির সংযোগস্থলে থাকার ফলে সেসব অঞ্চল বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ। তা ছাড়া বাংলাদেশের ছয়টি স্থানে মাটির নিচে বড় ধরনের ফাটল রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফাটলটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার লম্বা। এ ফাটলের কারণে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, রংপুর এবং দিনাজপুর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভূমিকম্পের মাত্রা ৭-এর উপরে উঠলে রাজধানীর পুরান ঢাকার স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৩ লাখ ২৬ হাজার ভবনের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় জানা যায়, এ ধরনের তীব্রতার ভূমিকম্পে প্রায় ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং প্রায় ৮৫ হাজার স্থাপনা মাঝারি ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এখানে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকার ৭২ হাজার ভবন গুঁড়িয়ে দিতে পারে এবং তাতে ৩ কোটি টনের ধ্বংস্তূপ তৈরি হবে। রাতের বেলায় ৭.০ থেকে ৭.৫ তীব্রতার ভূমিকম্প হলে শুধু ঢাকায়ই ৯০ হাজার মানুষ হতাহত হবে। দিনের বেলায় হলে এ সংখ্যা হতে পারে ৭০ হাজার। এ ধ্বংসযজ্ঞের শুধু আর্থিক ক্ষক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। 
ভূমিকম্প আঘাত হানার পর স্বাভাবিকভাবেই বিধ্বস্ত হয়ে যায় পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো জরুরি ব্যবস্থাগুলো। এসব দ্রুত পুনঃস্থাপনের সামর্থ্য বা প্রস্তুতি কোনোটাই তেমন নেই বাংলাদেশে। ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ দুর্যোগপরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থাও অদ্যাবধি গড়ে ওঠেনি। দেশের বর্তমান প্রযুক্তিগত অবস্থা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অপ্রতুল। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে একেবারে সচেতন নয়। কাজেই দেশজুড়ে ভবন মালিকদের বাড়িঘর নির্মাণ, নগর পরিকল্পনাবিদদের ডিজাইনে বিল্ডিং কোড মেনে ভূমিকম্প-সহনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবন নির্মাণের ব্যাপারে উৎসাহী করে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্পপ্রতিরোধী করে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। আর এই মুহূর্তে অধিক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে থাকা বাসযোগ্য পুরানো ভবনগুলোকে দ্রুত রিট্রোফিটিং করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ভূমিকম্প-পরবর্তী অবস্থা মোকাবিলায় এবং উদ্ধার তৎপরতা চালাতে হালকা ও ভারী ধরনের যন্ত্রপাতি সুসজ্জিত করে রাখা জরুরি। সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসসহ সব উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান, সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকার্যে পাড়ায় পাড়ায় স্বেচ্ছসেবক দলও গঠন করা যেতে পারে। দেশের অধিকাংশ মানুষ ভূমিকম্প মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে অজ্ঞাত। আফিস-আদালতে কর্মরত ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাার্থীদের ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। আত্মরক্ষামূলক কৌশল রপ্ত করার লক্ষ্যে দেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াগুলো নিয়মিত প্রচার চালাতে পারে। ভূমিকম্প বলেকয়ে আসে না এবং তা প্রতিরোধও সম্ভব নয়, তবে জনসচেতনতা, সতর্কতা ও ভূমিকম্প মোকাবিলার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সক্ষমতা অর্জন প্রাণহানি হ্রাস ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে 
আনতে পারে। 

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
কলাম লেখক