আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

শায়খুল আজহার আহমদ আত-তায়্যিব

মনযূরুল হক
| আলোকিত বিশ্ব

অত্যন্ত স্পষ্টবাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত 
শায়খ তায়্যিব মাতৃভাষা আরবির মতোই ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী। আবুল বারাকাতের ‘সহিহ আদিল্লাতুল নাকলি ফি মাহিয়াতিল আকলি’ এর ওপর রচিত গবেষণাকর্ম ‘আল-জানিবুন নাকদি’ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। দর্শন ও আকিদা বিষয়ে তিনি প্রায় ২০টি মৌলিক গ্রন্থ এবং ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় সমানসংখ্যক অনুবাদগ্রন্থ রচনা করেছেন

বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম হলেন একজন আলেম ও শিক্ষক। কোনো ভ্রান্ত মতাদর্শের অনুসারী নন, কোনো স্বৈরাচার শাসকও ননÑ বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনসাধারণের জন্য এ একটি সুখের সংবাদ। তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ও ঐতিহাসিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় আল আজহারের প্রধান শায়খ আহমদ আত-তায়্যিব। জর্ডানের রয়েল ইসলামিক স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের জরিপে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বিশ্বের প্রভাবশালী ৫০০ মুসলিমের তালিকার শীর্ষস্থানে আছেন তিনি। প্রভাব-প্রতাপের বিবেচনায় সৌদি আরব, জর্ডান, ইরান ও তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানরা পর্যন্ত তার পেছনে পড়ে গেছেন।
তার পুরো নামÑ আহমদ মুহাম্মদ আহমদ আত-তায়্যিব। তিনি ১৯৪৬ সালের ৬ জানুয়ারি মিশরের লুক্সোর প্রদেশের কুর্নায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন এবং ১৯৬৯ সালে এখান থেকেই আকিদা ও দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইসলামি দর্শন’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করার পর আরও উচ্চতর পড়াশোনার জন্য প্যারিসের সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে প্যারিস থেকে ফিরে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক দায়িত্বে নিযুক্ত হন এবং ইসলামি আকিদা বিষয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে মিশরের কায়না ও আসওয়ানে প্রশাসনিক ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত ‘আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়’-এ এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে সৌদি আরবের ‘কিং সাউদ ইউনিভার্সিটি’, কাতারে ‘কাতার ইউনিভার্সিটি’ আরব আমিরাতের ‘আমিরাত ইউনিভার্সিটি’তে অধ্যাপনা করেন। ২০০২ সালে হোসনি মোবারক সরকার কর্তৃক মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি নিয়োগ পেলে বিশ্বব্যাপী প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসেন তিনি।
পারিবারিক সূত্রেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী সুফি সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িত। তবে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন সরকারের ন্যাশনাল পার্টির (এনডিপি) উচ্চপদস্থ নেতা হিসেবেও অবদান রেখেছেন। এমনকি বিরোধীপক্ষ মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতারাও তার যোগ্যতার কথা অকুণ্ঠ চিত্তে ব্যক্ত করেছেন। ২০০৩ সালে হঠাৎ করেই আল আজহারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়। সে সময় ‘শায়খুল আজহার’ ও গ্র্যান্ড ইমাম ছিলেন মুহাম্মাদ সাঈদ তানতাবি (রহ.)। ২০১০ সালে তার ইন্তেকালের পর ‘শায়খুল আজহার’ হিসেবে শায়খ আহমদ আত-তায়্যিব যোগদান করেন।
অত্যন্ত স্পষ্টবাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত শায়খ তায়্যিব মাতৃভাষা আরবির মতোই ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী। আবুল বারাকাতের ‘সহিহ আদিল্লাতুল নাকলি ফি মাহিয়াতিল আকলি’ এর ওপর রচিত গবেষণাকর্ম ‘আল-জানিবুন নাকদি’ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। দর্শন ও আকিদা বিষয়ে তিনি প্রায় ২০টি মৌলিক গ্রন্থ এবং ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় সমানসংখ্যক অনুবাদগ্রন্থ রচনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছেÑ ‘তালিকু আল কাসমিল ইলাহিয়াত’, ‘বুহুসু ফি সাকাফাতিল ইসলামিয়া’, ‘উসুল নাজরিয়াতিল ইলমি ইনদাল আশআরি’ প্রভৃতি। ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন ইবনে আরাবির ‘আল-ওলায়াত ওয়ান নুবুয়্যাত’, নবীজির নির্বাচিত হাদিসের সংকলন, শিয়াদের কোরআন বিকৃতকরণ বিষয়কগ্রন্থ ‘আন-নাজরাতু ফি কাজিয়্যাতি তাহরিফিল কুরআন’ ইত্যাদি।
২০১১ সালে আল আজহারের একটি সমাবেশে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তির জন্য প্রধানভাবে ইহুদিদের দায়ী করেন, যা পশ্চিমা বিশ্বের প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে এবং মুসলিম বিশ্ব স্বাগত জানায়। তিনি বলেন, ‘১৪০০ বছর আগে ইসলামের সূচনা হওয়ার পর থেকে আমরা মুসলিমরা ইহুদি ও ইহুদিবাদী হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছি।’ এমনকি জেরুজালেমে ইসরাইলি আগ্রাসনের সূত্র ধরে তিনি হোয়াইট হাউজে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ ফিরেয়ে দেন। ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে ‘হিজাব বিতর্ক’ সৃষ্টি হলে তিনি পরিষ্কার ভাষা বলেনÑ মুসলিম নারীদের জন্য হিজাব ফরজ, যদিও নেকাব ফরজ নয়, মুস্তাহাব।
২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামি সম্মেলনে জর্ডানের বাদশা তাকে ‘অর্ডার অব ইনডিপেন্ডেন্স’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ২০১৩ সালে ‘বছরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে আরবের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার ‘শেখ জয়েদ বুক অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।