আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আফগানিস্তানে কি আবার ফিরছে তালেবান

| আলোকিত বিশ্ব

আফগানিস্তানে একসময় হতাহতের ঘটনা সংবাদের শিরোনামে উঠে এলেও এখন সেগুলো খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ আফগানিস্তানে মার্কিন সমর্থিত সামরিক বাহিনী অবস্থান নেওয়ায় টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে তালেবান ও অন্য উগ্র গোষ্ঠীগুলো। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের দাউদ আজমী ব্যাখ্যা করেছেন, দৃশ্যত এ যুদ্ধের কোনো শেষ নেই। কেননা এটি ক্রমাগত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। 

সহিংসতা কি আরও খারাপ রূপ নিয়েছে?
২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন শক্তি অভিযান শুরুর আগ পর্যন্ত আফগানিস্তান কখনোই এতটা অনিরাপদ ছিল না। যেমনটা এখন হয়েছে। ১৭ বছর আগে তালেবান শাসনের অবসানের আগ পর্যন্ত আফগানিস্তানের বেশিরভাগ স্থান তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের যুদ্ধ এরই মধ্যে মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংঘাত শুধু তীব্র থেকে তীব্রতর হয়নিÑ সেই সঙ্গে আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এখনকার হামলাগুলো যেমন বড়, তেমনি বিস্তৃত এবং মারাত্মক। তালেবান এবং মার্কিন/ন্যাটো সমর্থিত আফগান সরকার দু-পক্ষই এখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
কাবুলের দক্ষিণে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক রাজধানী গজনীতে ১০ আগস্ট তালেবানরা প্রবেশ করে। মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী বিমান হামলার মাধ্যমে জঙ্গিদের পিছু হটানোর আগেই তালেবান শহরটি দখলে নেয়। এর আগে ১৫ মে তালেবানরা ইরানি সীমান্তবর্তী আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফারাহ প্রদেশের রাজধানীতে প্রবেশ করেছিল। সে সময় তাদের হটাতে পাল্টা অবস্থান নেয় মার্কিনপন্থি বাহিনী। এতে বহু তালেবান যোদ্ধা হতাহত হন। কিন্তু তালেবান গোষ্ঠীর জন্য এ ধরনের হামলাগুলো বড় ধরনের প্রোপাগান্ডার মতো। এসব হামলা তাদের প্রচারণা বাড়ায়, যা তাদের মনোবল শক্তিশালী করার পাশাপাশি সদস্য নিয়োগের মাধ্যমে দল ভারী করতে সাহায্য করে। তালেবানদের কোনো স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে তারা যাওয়ার সময় নিজেদের অস্ত্র ও যানবাহন নিয়ে যায়।
হেলমান্দ এবং কান্দাহারের মতো প্রদেশগুলোর বেশ বড় অংশ বর্তমানে তালেবান নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে অনেক শহর ও গ্রাম। একসময় হেলমান্দ এবং কান্দাহারে যুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশের সেনারা নিহত হয়েছিল। এখন ওই অঞ্চলে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
জাতিসংঘের হিসাব মতে, ২০১৭ সালে ১০ হাজার জনেরও বেশি বেসামরিক মানুষ মারা গিয়েছে বা আহত হয়েছে এবং ২০১৮ সালে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের কৌশল কি কোনো পার্থক্য আনতে পেরেছে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানের জন্য যে নতুন কৌশল উন্মোচন করেছেন, তার এক বছর পেরিয়ে গেছে। সেখানে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ‘জয়ের জন্য লড়বে’। এ অচলাবস্থার অবসানে তালেবানদের শান্তির পথে ফেরাতে সর্বোপরি তাদের আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে ট্রাম্প প্রশাসন তালেবানের ওপর চারটি উপায়ে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে। সেগুলো হলো :
১. সর্বাধিক সামরিক চাপ, ২. তালেবানদের আর্থিক উৎসগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা, ৩. তালেবানের যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে জনসমক্ষে বিশেষ করে ধর্মীয় দলগুলোর কাছে প্রশ্ন তোলা এবং ৪. পাকিস্তানের ভূখ-ে থাকা আফগান তালেবানদের ধরতে ও তাদের বহিষ্কার করতে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রয়াসগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ :
নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে তালেবান : তীব্র সামরিক চাপ তালেবানদের আঞ্চলিক সম্প্রসারণের গতি কমিয়ে দিয়েছে। কেননা গত বছর অনেক তালেবান যোদ্ধা (কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারসহ) হামলায় নিহত হয়েছেন।
কিন্তু তারপরও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে তালেবান। সেই সঙ্গে দেশজুড়ে প্রাণঘাতী হামলা বা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তালেবানদের লক্ষ্য করে একের পর এক বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
অর্থ সরবরাহ বেড়েছে : তালেবানের মাদকের আখড়ায় বোমা হামলা সত্ত্বেও তারা আর্থিক সংকটের মুখে পড়েনি। বরং তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা গেছে যে, তাদের সম্পদ আরও বেড়েছে।
আলোচনায় অস্বীকৃতি : সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ইসলামি চিন্তাবিদরা বিভিন্ন সভার আয়োজন করেছেন। মূলত যখন আফগানিস্তানে সহিংসতার ঘটনায় নিন্দার ঝড় উঠেছিল তখন তালেবানকে আহ্বান জানানো হয়, যেন তারা আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনা যোগ দেয়। তবে তালেবানরা সাফ অস্বীকৃতি জানায়। তাদের মতে এটি ওয়াশিংটনের যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের জন্য ‘আমেরিকান প্রক্রিয়ার’ একটি অংশ।
পাকিস্তানের আফগান কৌশল : ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি ত্রাণ ও নিরাপত্তা সহায়তা স্থগিত করে দিয়েছে। তবে তালেবানকে সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইসলামাবাদ। তারা জানায়, আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য তারা সাহায্য করতে প্রস্তুত আছে। তবে পাকিস্তানের আফগান কৌশল নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আভাস দেখা দিয়েছে।
 সূত্র : বিবিসি