আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অবিশ্বাস এবং সন্দেহ কাম্য নয়

এমএ খালেক
| সম্পাদকীয়

দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে হোটেলে দাওয়াত দিয়ে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের অনুষ্ঠানে যখন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থা কোন পর্যায়ে চলে গেছে

 

রাজধানীর একটি হোটেলে শিডিউল ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বেশকিছু কথা বলেছেন, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, সন্দেহ ও অবিশ্বাস ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য একটি অশনিসংকেত। ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। সৃষ্ট সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর করতে এ সেক্টরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে। উপযুক্ত লোককে সঠিক জায়গায় বসাতে হবে। রপ্তানির তুলনায় আমদানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এটা কেন হচ্ছে? এর পেছনে কী অন্য কোনো কারণ আছে কি না, বাংলাদেশ ব্যাংক সে বিষয়ে নজর রাখছে। অনুষ্ঠানে তিনি অবশ্য বলেছেন, ওভার ইনভয়েসিংয়ের নামে বিদেশে অর্থ পাচার আগের তুলনায় অনেকেটাই কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর বলেছেন, সরকারের উদ্যোগে এন্ট্রি মানিলন্ডারিং কার্যক্রম গ্রহণের ফলে দেশ থেকে মুদ্রা পাচার অনেকটাই কমে গেছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বা প্রমাণ হচ্ছে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। 
আমাদের দেশে সাধারণত একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়, তা হলো সত্যকে সবসময় আড়াল করতে চাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ব্যাংকিং সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি সাধারণ মানুষের কী মনোভাব, তা তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের মনে সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের জন্ম নিয়েছে। ব্যাংক সাধারণ মানুষের অর্থ নিয়ে ব্যবসায় করে। মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সবচেয়ে নিরাপদ এবং আস্থার স্থান হিসেবে মনে করে। কাজেই সেই আস্থার স্থানে যদি চিড় ধরে সেটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন আর মানুষের প্রশ্নাতীত আস্থা ধরে রাখতে পারছে না। নানা ধরনের অবিশ্বাস আর সন্দেহে এ খাতের স্বাভাবিক বিকাশকে রুদ্ধ করছে। ব্যাংক সাধারণ মানুষের আমানত নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে। আর মানুষ ব্যাংককে সবচেয়ে আস্থার জায়গা হিসেবে মনে করে বলেই সেখানে তাদের সঞ্চিত আমানত গচ্ছিত রাখে। সামান্যতম সন্দেহ এবং সংশয় ব্যাংক ব্যবস্থার জন্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অযোগ্যতা বা ন্যক্কারজনক পক্ষপতিত্বের ফলে এ খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ অনেক আগে থেকেই বিরাজমান ছিল। বর্তমানে এ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের অর্থনীতির জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলিয়ে মোট ৫৭টি ব্যাংক রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক ব্যাংকের কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বারবার প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। কিন্তু নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। সর্বশেষ যে ব্যক্তি খাতে ৯টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয় তখন বিভিন্ন মহল থেকে এর বিরুদ্ধে কথা উঠেছিল। কিন্তু তখন বলা হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক স্থাপিত হবে দেশের মানুষের চাহিদার ভিত্তিতে। সেখানে উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক পরিচিতি প্রাধান্য পাওয়ার কথা নয়। অনেকেই প্রশ্ন উত্থাপন করেন, দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনও ব্যাংকিংসেবার বাইরে রয়েছে। কাজেই আরও নতুন ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। তাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকাতে বলব। ভারত অর্থনৈতিক এবং জনশক্তির দিক দিয়ে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়। কিন্তু তাদের দেশে কি বাংলাদেশের মতো এতগুলো ব্যাংক আছে? তারা ইউনিট ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তে ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মানুষের জন্য ব্যাংকিংসেবা প্রদান নিশ্চিত করছে। আমাদের মতো দেশেও ইউনিট ব্যাংকিংয়ের চেয়ে ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংই অধিক উপযোগী। ইউনিট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অসম প্রতিযোগিতার আশঙ্কা থাকে। ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা সেই দুষ্ট উপসর্গই লক্ষ করছি। রাজনৈতিক বিবেচনায় যেসব ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে তারা পরস্পর অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ৯টি ব্যাংকের মধ্যে অধিকাংশই ভালোভাবে চলছে না। তারা আগ্রাসী ব্যাংকিং করছেন। ফলে পুরো ব্যাংকিং সেক্টরে একধরনের অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা কারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে হোটেলে দাওয়াত দিয়ে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের অনুষ্ঠানে যখন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থা কোন পর্যায়ে চলে গেছে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন যেসব দাবি উত্থাপন করছে তার সবই কোনো না কোনোভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। যেমন কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডি রেশিও) কমানোর কথা বলা বলা হয়েছিল। অধিকাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংক নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ঋণ প্রদান করেছিল। আগের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংক বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ৮৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারত। ইসলামি ধারার ব্যাংকের ক্ষেত্রে এটা ছিল ৯০ শতাংশ। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগযোগ্য মোট আমানতের ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ দিতে পারবে। এছাড়া ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এটা ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদানকৃত অতিরিক্ত ঋণ জুন, ২০১৮ এর মধ্যে সমন্বয় করার জন্য বলেছিল। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করে প্রথমে এ সময়সীমা ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বর্ধিত করতে সমর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত মার্চ, ২০১৯ তারিখের মধ্যে তা বর্ধিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কেন তাদের এ সিদ্ধান্ত বারবার পরিবর্তন করল তার কোনো ব্যাখ্যা আমরা পেলাম না।
ব্যাংক মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধিবদ্ধ জমার পরিমাণ (সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। এতে বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের পরিমাণ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক মালিকরা বলেছিলেন, তারা এক মাসের মধ্যে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনবেন। কিন্তু তারা সেটা করেননি। পরবর্তী সময়ে তারা আবারও দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের তহবিল তাদের ৬ শতাংশ সুদে প্রদান করতে হবে। সরকার সে দাবিও মেনে নিয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আমানতের ৫০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে রাখার বিধান প্রণীত হয়েছে। আগে এটা ছিল ২৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ৭৫ শতাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে রাখতে হতো। তারও কয়েক মাস আগে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের উদ্যোক্তারা দাবি করেন তাদের ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে একই পরিবার থেকে চারজন পরিচালক নিযুক্তির বিধান করতে হবে। তাদের মেয়াদ হতে হবে অব্যাহতভাবে ৯ বছর। আগে একই পরিবার থেকে একটি ব্যাংকে সর্বোচ্চ দুজন পরিচালক নিযুক্ত হতে পারতেন। তারা অব্যাহতভাবে ৬ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। সরকার তাদের সেই দাবিও মেনে নিয়েছে। অনেকেই এই বলে সমালোচনা করেছিলেন যে, এই আইনের ফলে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। সমালোচনা উপেক্ষা করে তাদের এ সুযোগ দেওয়া হয়। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে একজন পরিচালক আগে অব্যাহতভাবে ৬ বছর দায়িত্ব পালনের পর এক টার্ম (তিন) বছর বিরতি দিয়ে আবারও ৬ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। এখন তারা অব্যাহতভাবে ৯ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। মাঝখানে এক টার্ম (তিন বছর) বিরতি দিয়ে আবারও ৯ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এতে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সব ব্যবস্থা পাকা করা হয়েছে। এখন অনেকেই হয়তো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন যে, ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের উদ্যোক্তা তথা মালিক হচ্ছেন ‘ব্যক্তি’। কাজেই তার প্রাধান্য থাকলে অসুবিধা কোথায়? আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের মালিক বা উদ্যোক্তা ব্যক্তি হলেও এটা অন্যান্য ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায়ের মতো নয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় ব্যক্তির একক পুঁজি দিয়ে। কিন্তু ব্যাংক পরিচালিত হয় সাধারণ মানুষের পুঁজি দিয়ে। ৯০ শতাংশ আমানতের মালিক হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কাজেই ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংককে অন্যান্য ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মতো মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, মানিলন্ডারিং আইন বাস্তবায়নের ফলে মুদ্রা পাচার আগের তুলনায় কমেছে। এ তথ্য মোটেও ঠিক নয়। কারণ আমাদের দেশ থেকে মুদ্রা পাচার অতীতের যে-কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছেÑ এটা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অবশ্য তারা যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছেন, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ মুদ্রা পাচারের সঠিক পরিসংখ্যান কারও পক্ষেইে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ যারা মুদ্রা পাচার বা এ ধরনের অপরাধ কর্মের সঙ্গে যুক্ত তারা কখনোই পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ কারও কাছে প্রকাশ করে না। এছাড়া একটি মাত্র চ্যানেলে মুদ্রা পাচার হয় না। ফলে চাইলেই কেউ একজন পাচারকৃত মুদ্রার সঠিক পরিমাণ প্রকাশ করতে পারবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর বলেছেন, মুদ্রা পাচার আগের তুলনায় কমেছে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে গত বছর সুইস ব্যাংকে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এ বক্তব্যও প্রশ্নাতীতভাবে মেনে নেওয়া যায় না। কারণ মুদ্রা পাচারের নতুন নতুন গন্তব্য বের হচ্ছে। কাজেই একমাত্র সুইস ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ হ্রাসের অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের মানুষ যারা মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা ভালো হয়ে গেছেন। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমানতকারীদের আমানতের পরিমাণ প্রকাশ করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করলে যে-কোনো দেশের সরকার তার নাগরিকদের আমানতের পরিমাণ জানতে পারছে। এ কারণেও সুইস ব্যাংকে টাকা আমানত রাখাটা এখন অনেকেই নিরাপদ মনে করছেন না। গেল অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও বিষয়টি সন্দেহজনক বলে মনে করছেন। দেশের মানুষের ভোগব্যয় এবং চাহিদা হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পায়নি। জাতীয় নির্বাচনের আগের সময়গুলোয় মুদ্রা পাচার বেড়ে যায়। কারণ নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশে সবসময়ই এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করে। জাতীয় নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক এবং সুষ্ঠু হয়, তাহলে ক্ষমতার হাতবদল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে অসুবিধায় পড়তে হবে, এ আশঙ্কায় অবৈধভাবে সম্পদ আহরণকারীরা এ সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের আহরিত অর্থ পাঠিয়ে দিতে পারেন। মুদ্রা পাচারের সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে আমদানিকালে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া। মূলত সে ধরনের ঘটনাই ঘটছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
ব্যাংক ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বা সুশাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে অনেক আগেই। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখন ‘দুষ্টের পালন আর শিষ্টের দমন’ চলছে। অপরাধ করেও অনেকেই শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন না। বিশেষ করে অপরাধী যদি রাজনৈতিক সমর্থনপুষ্ট হন। ব্যাংকের মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনা করাটা চাকরি বিধি অনুযায়ী মারাত্মক অপরাধ। কিন্তু প্রকাশ্যে অনেকেই রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কোনো সরকারই এ সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনোরকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। সকালবেলা উঠে অনেকেই আতঙ্কের সঙ্গে পত্রিকার পাতা খোলেন, এই বুঝি কোনো ব্যাংকের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিপর্যস্ত প্রায় ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি ব্যাংককে উদ্ধারের জন্য অন্য কয়েকটি ব্যাংক মিলে অর্থায়ন করছে। কিন্তু একবারও প্রশ্ন করা হচ্ছে না যে, সেই ব্যাংকের মূল উদ্যোক্তা, যিনি একজন আমলা তিনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মতো অর্থ কোথায় পেলেন? যারা ঋণখেলাপি তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে দিন দিন খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। দুর্দশাগ্রস্ত একটি ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় অর্থ দিয়ে উদ্ধারের আগে ভাবতে হবে যে টাকা দেওয়া হচ্ছে, তা কাদের? যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি তাদের ‘রাষ্ট্রীয় শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনার এখনই সময়। 

এমএ খালেক
অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক