আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

খাদ্যে ভেজাল রোধে নৈতিকতা জাগ্রত হতে হবে আগে

আবু আফজাল মোহা. সালেহ
| সম্পাদকীয়

দিন দিন আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজালের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। নোংরা পরিবেশ আর নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের লেবেল লাগিয়ে ভেজাল পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। বাজার, দোকান, সুপারশপ কোথাও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য মিলছে না। মাছেও ফরমালিন, দুধেও ফরমালিন। ফলফলাদিতে দেওয়া হচ্ছে কার্বাইডসহ নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোটা রীতিমতো অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভেজালের বেপরোয়া দাপটের মধ্যে আসল পণ্য খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর। এছাড়া এমন জটিল ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় খাদ্যে ভেজাল দেওয়া হয়, যা সাধারণ ক্রেতা বা খুচরা ব্যবসায়ীদের পক্ষে 
অনুমান বা শনাক্ত করাও কঠিন

ওয়াটার লুর যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর নেপলিওনকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বন্দি রাখা হয়। কথিত আছে যে, প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে অল্প পরিমাণে আর্সেনিক মিশিয়ে নেপলিওনকে খেতে দেওয়া হতো। এভাবে সেøা পয়জনিংয়ের মাধ্যমে ফরাসি সেনাপতি নেপলিওনকে হত্যা করে তাদের চিরশত্রু ব্রিটিশরা। কিন্তু আজ আমরা নিজেরা নিজেদের সেøা পয়জনিং করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম, খাদ্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। কিন্তু পচা, বাসি, ভেজাল বা বিষাক্তদ্রব্য মানুষের খাদ্য হতে পারে না। এটা মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শিশুদের। কারণ তাদের পক্ষে ক্ষতিকর উপাদানের প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধ করার ক্ষমতা খুবই কম। অনেক সময় এ ধরনের দূষিত খাবার মানবদেহে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যা মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। অথচ দিন দিন আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজালের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। নোংরা পরিবেশ আর নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের লেবেল লাগিয়ে ভেজাল পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। বাজার, দোকান, সুপারশপ কোথাও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য মিলছে না। মাছেও ফরমালিন, দুধেও ফরমালিন। ফলফলাদিতে দেওয়া হচ্ছে কার্বাইডসহ নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোটা রীতিমতো অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভেজালের বেপরোয়া দাপটের মধ্যে আসল পণ্য খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর। এছাড়া এমন জটিল ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় খাদ্যে ভেজাল দেওয়া হয়, যা সাধারণ ক্রেতা বা খুচরা ব্যবসায়ীদের পক্ষে অনুমান বা শনাক্ত করাও কঠিন। খাদ্যে ভেজাল, খাদ্যে বিষক্রিয়ার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি এর ব্যাপ্তি যে হারে বাড়ছে তাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। দেশি-আন্তর্জাতিক সব গবেষণায় দেশে খাবারের বিষক্রিয়ার বিষয়টি বারবার উঠে আসছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যও এখন ভেজালমুক্ত নয়। গবেষণা থেকে শুরু করে ভেজালবিরোধী অভিযানে এসব প্রমাণ মিলছে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ভেজালের কারণে বর্তমানে মানবদেহে ক্যান্সারের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা আগে দেখা যেত না। তারা বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে এসব ক্যান্সারের মূল কারণ খাদ্যে ভেজাল মেশানো, প্রিজারভেটিভ ও বিভিন্ন ধরনের রঙের ব্যবহার।
দেশে দূষিত খাবারের ব্যাপ্তি কী পরিমাণে বাড়ছে পরিসংখ্যানেই তার প্রমাণ মিলছে। এছাড়া একাধিক গবেষণায় বারবার খাবারে ভেজালের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দূষিত খাবারের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মৃত্যু হচ্ছে ৪ লাখ ২০ হাজার জনের। অতি সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য মিলেছে। এতে দেখানো হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে প্রতি বছর দূষিত খাবার খেয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। আর অসুস্থ হয় ১৫ কোটি মানুষ। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রতি ১০ শিশুর তিনজনই ডায়রিয়ায় ভোগে। রোগটি এ অঞ্চলের শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী সবচেয়ে ভয়াবহ রোগগুলোর একটি। ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী, বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ইত্যাদির মাধ্যমে খাবার দূষিত হয়। সেই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে বমিভাব, ডায়রিয়ার মতো প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হিসেবে ক্যান্সার, কিডনি ও যকৃৎ বিকল হয়। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর বিভিন্ন অসুখ হয়। কম বয়সি শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রবীণরা খাবারে দূষণের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। টাইফয়েড জ্বর এবং হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার অর্ধেকের বেশি ঘটনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় অনিরাপদ খাবারের ছড়াছড়ি বেশি। সেখানে রান্নাবান্নার কাজে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয় না। তাই খাবারবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও ওই অঞ্চলে বেশি। 
বিভিন্ন সমীক্ষায় ভেজালের ভয়াবহতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিষাক্ত সাইক্লোমেট দিয়ে তৈরি হচ্ছে টোস্ট বিস্কুট, বিষাক্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয় কলা, আনারস। রুটি, বিস্কুট, সেমাই তৈরি করা হচ্ছে বিষাক্ত উপকরণ দিয়ে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে। ফরমালিন দেওয়া হচ্ছে মাছ-সবজিতে, মবিল দিয়ে ভাজা হচ্ছে চানাচুর, হাইড্রোজ মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে মুড়ি ও জিলাপি। এছাড়া ক্ষতিকর রং দেওয়া ডাল, ডালডা ও অপরিশোধিত পাম অয়েল মিশ্রিত সয়াবিন তেল, ভেজাল দেওয়া সরিষার তেল, রং ও ভেজালমিশ্রিত ঘি, পাম অয়েল মিশ্রিত কনডেন্সড মিল্ক, ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি প্যাকেটজাত জুস, মিনারেল ওয়াটার, মরা মুরগির গোশতও অবাধে বিক্রি হয়। ভেজালের এসব উপকরণসহ অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়েছে ব্যবসায়ীরা। এরপরও ভেজালের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। টেক্সটাইল রং মেশানো হচ্ছে বেকারি পণ্য, জুসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে। তেল, ঘি, আইসক্রিম, মিষ্টি, দই, ললিপপ, চকলেট, কেক ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্যেও ক্ষতিকর রং, ফ্লেভার ব্যবহার করা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের ব্যবহার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরি, হোটেল রেস্টুরেন্টে বাসি, মরা মুরগি, গরু, মহিষ, ছাগলের গোশত খাওয়ানোর ঘটনাও ঘটছে। আবার মিনারেল ওয়াটারের নামে বোতলজাত করে বাজারজাতকরণের ঘটনাও ঘটছে।
এটা এমন এক বিষয় যে, নিজে থেকে ব্যবসায়ীরা/মালিকরা সচেতন না হলে বন্ধ করা কঠিন। নৈতিকতার জায়গাটা জাগতে হবে আমাদের! আর একটা বিষয় হচ্ছে, ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়া। সরবরাহকারী সব জায়গা আইন করে বা পাহারা দিয়ে রুখে দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়! আর সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ভেজালকারীকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে! খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ করার জন্য শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না থেকে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মিডিয়া এবং সুশীল সমাজকে এক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে হবে। অনেক মিডিয়া এ বাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো মিডিয়া খাদ্যে ভেজালসংশ্লিষ্ট সংবাদ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। শুধু আইন প্রণয়ন করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ অনেক ব্যবসায়ী জানেই না সে যে ভেজাল মেশাচ্ছে এর প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়ংকর। আবার অন্যদিকে ভোক্তারাও যে সবসময় সচেতন তা-ও কিন্তু নয়। 

 

আবু আফজাল মোহা. সালেহ 
কলাম লেখক 
[email protected]