আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আ.লীগ বিএনপি জাপা লড়বে আসন রক্ষায়

পারভেজ উজ্জ্বল, নীলফামারী
| শেষ পাতা

ডোমার ও ডিমলা উপজেলা নিয়ে গঠিত নীলফামারী-১ আসন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসনটিতে মাঠে নেমে পড়েছে প্রধান তিন রাজনৈতিক দল, জামায়াতে ইসলামী ও জোটভুক্ত অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। আসন রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে এবার লড়বে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। কেন্দ্রের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী মাঠে দৌড়ঝাঁপ করছেন এবং দলীয় নেতাকর্মীর খোঁজখবর নিচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে পোস্টার ও ফেস্টুন লাগিয়ে গণসংযোগ করছেন তারা। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নপ্রত্যাশীরা প্রচারে নামলেও বিএনপির কেউ মুখ খুলছেন না। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, আগে থেকে চূড়ান্ত থাকায় প্রার্থী নিয়ে দলের মধ্যে কোনো উত্তাপ নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকেও সরব রয়েছেন কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী।

এ আসনটিতে প্রধান তিন দলেরই আধিপত্য রয়েছে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬২ হাজার ৯৮৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮২ হাজার ২৫২ এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ৭৩৪ জন।
প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের হুইপ প্রয়াত আবদুর রউফ এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান দেশের বিশেষ বিশেষ কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির এনকে আলম চৌধুরী। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের হামিদা বানু শোভা এবং নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপার জাফর ইকবাল সিদ্দিকী।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী তৎপরতায় নিজ দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েন তিনি। এর পরও তিনি এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন নেতা। এর আগে ইউপি চেয়ারম্যান, এরপর দুইবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ফলে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি জনপ্রিয়।
আফতাব উদ্দিন সরকার বলেন, চিলাহাটি স্থলবন্দর গেজেট হয়ে আছে। ভারতের সমস্যার কারণে তা এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি আশাবাদী, এটি শিগগিরই চালু হবে।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আছেন ব্যারিস্টার ইমরান কবীর চৌধুরী। ডিমলা ও নীলফামারীর এক বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা তরুণ রাজনীতিবিদ তিনি। তার পিতামহ বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম রহমান চৌধুরী বৃহত্তর রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং দুইবার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপিএ)। বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নৃশংস হত্যাকা-ের পর রংপুর অঞ্চলে যে গুটিকয়েক মানুষ এর তীব্র প্রতিবাদ করেন ও আন্দোলনে শরিক হন, তাদের মধ্যে আবদুর রহমান চৌধুরী ছিলেন অন্যতম। ইমরানের বাবা আওয়ামী লীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউল কবির চৌধুরী (আলো) নীলফামারী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার। ব্যারিস্টার ইমরান চষে বেড়াচ্ছেন ডোমার-ডিমলারের সব গ্রাম। তার লক্ষ্য, সংসদ সদস্য হয়ে এলাকার সেবা করা, চিলাহাটি বন্দর সচল করা, ডোমার-ডিমলা প্রশস্ত রাস্তা করে নীলফামারী ও অন্যান্য এলাকার সঙ্গে ব্যবসা বৃদ্ধি করা। ফেইসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব তিনি। এ তরুণ ব্যারিস্টার টিকিটের দৌড়ে অনেকদূর এগিয়ে আছেন।
সরকার ফারহানা আক্তার সুমি ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড কল্যাণ পুনর্বাসন’ এর সাধারণ সম্পাদক। তিনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। বয়সে তরুণ এ নেত্রী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে গেল কয়েক বছর ধরে প্রচারণার পাশাপাশি দলীয় কর্মকা-ে অংশ নিচ্ছেন। তিনি এলাকার উন্নয়নের জন্য এরই মধ্যে চিলাহাটিতে ১০ বেডের হাসপাতাল এবং ২৬ কিলোমিটার পাকা রাস্তাসহ এলাকার জন্য অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। পাশাপাশি এসব ব্যাপারে সার্বক্ষণিক দিনরাত পরিশ্রম করছেন।
সরকার ফারহানা আক্তার সুমি মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি বলেন, তিনি নেতা নন, সেবক হতে চান। সেবক হয়ে জনগণের পাশে দাঁড়াতে চান। তিনি মনোনয়নে শতভাগ আশাবাদী উল্লেখ করে বলেন, আমি নির্বাচিত হলে এলাকাতেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব, যাতে কাজের জন্য এলাকা ছাড়তে না হয়। এজন্য এলাকায় নদীকেন্দ্রীক বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনসহ বাঁশ ও বালুনির্ভর শিল্প-কারখানা গড়ে তুলব। নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করব।
আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মনোয়ার হোসেন। তিনি গেল নির্বাচনেও প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিলেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই তিনি গণসংযোগের পাশাপাশি দলীয় কর্মকা-ে যোগ দিচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নেন বলে তিনি জানান। তিনি এলাকার মানুষের জন্য উন্নয়নমূলক অনেক কাজ করে যাচ্ছেন বলে অনেকে জানান। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি আসনটি ধরে রাখতে পারবেন বলে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা। ফেইসবুক প্রচারণায় তিনি এগিয়ে রয়েছেন।
ডোমার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আলম বাবুল রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে। তিনি ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি দীর্ঘদিন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগ উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৩ সালে উপজেলা ছাত্রলীগের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৭ সালে কৃষক লীগের উপজেলা সভাপতি ছিলেন। ২০০০ সালে ডোমার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ২০০৫ সালে আহ্বায়ক ছিলেন। ২০১৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বলেন, আমি অন্যায় করি না এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই না। আমি ডোমার-ডিমলাবাসীর পাশে সবসময় আছি এবং থাকব। আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতির পাশাপাশি বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি, শহীদ ধীরাজ ও মিজান স্মৃতি পাঠাগার ও নাট্য সমিতির সভাপতি তিনি। তিনি নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন।
নতুন মুখ হিসেবে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. তছলিম উদ্দিন। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন এবং ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের সেবায় নিজেকে জড়াতে চান তিনি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে আমি মনোনয়নপ্রত্যাশী। আমি নির্বাচনে গেলে নিশ্চিত জয়ী হবো আর এলাকার অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করব। তিনি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও উদ্দেশ্যের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কাক্সিক্ষত স্বপ্ন ও নৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নে দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও দিকনির্দেশনায় এলাকার উন্নয়ন ও কল্যাণ করে যাচ্ছি দীর্ঘদিন ধরে।
জামায়াতের জেলা সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুস সাত্তার এ আসনে জোরালোভাবে প্রচারে নেমেছেন। তবে জোটের সিদ্ধান্তে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়বেন তিনি। তিনি জানান, তিনি ডোমার ও ডিমলা উপজেলাকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত করবেন এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়বেন। এ আসনটিতে এবার জোটের জয় নিশ্চিত বলে তিনি আশাবাদী।
জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকলেও এ আসনটি আওয়ামী লীগকে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তে হাইকমান্ডের ওপর অসন্তুষ্ট স্থানীয় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। নবম জাতীয় সংসদের এমপি জাফর ইকবাল সিদ্দিকী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রচারে নেমেছেন। তিনি পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে প্রচারণার পাশাপাশি দলীয় কর্মকা- অব্যাহত রেখেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
গেল কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেখা গেছে, বিএনপি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা এ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়ে আসছেন। এর আগে খালেদা জিয়ার ভাগ্নে ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন এমপি নির্বাচিত হন। শাহরিন ইসলাম তুহিন বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় আগামী নির্বাচনে এ আসনে একক প্রার্থী হিসেবে খালেদা জিয়ার বড় বোন সেলিনা ইসলাম বিউটি অথবা ভগ্নিপতি রফিকুল ইসলাম থাকবেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ আসনটি খালেদা জিয়ার নিজস্ব আসন মনে করেন ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। তাই প্রার্থী নিয়ে বিএনপিতে কোনো রকম উত্তাপ নেই। বিএনপি কিংবা জোটের যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক, এ আসন থেকে জোটের জয় নিশ্চিত বলে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন।