আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আগস্টে দুই ডজন ব্যাংকে ডবল ডিজিটে ছিল

সুদহার নিয়ে নির্দেশনার বাস্তবায়ন নেই

জিয়াদুল ইসলাম
| প্রথম পাতা

আগস্ট মাস শেষ হলেও ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি অনেক ব্যাংক। গত মাসে অন্তত দুই ডজন ব্যাংকের সুদহার এক অঙ্কের ওপরে ছিল। কিছু কিছু ব্যাংকের সুদহার এখনও ১৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। মূলত বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা  বিপাকে রয়েছেন। তারা চড়া সুদের কারণে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্প প্রসারে আগ্রহী হচ্ছেন না। এতে শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এক অনুষ্ঠানে বলেন, শিল্প ঋণে সুদহার ৯ শতাংশ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী অনেক আগেই নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু সরকারি কয়েকটি ব্যাংক ও বেসরকারি অল্প সংখ্যক ব্যাংক এ নির্দেশনা প্রতিপালন করেছে। বাকিগুলো এখনও ৯ শতাংশ সুদহারে ঋণ দিচ্ছে না; কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ১২, ১৪, ১৫ শতাংশ সুদহারে ঋণ নিয়ে শিল্প স্থাপন সম্ভব নয়।  

সূত্র জানায়, সুলভ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিতে দীর্ঘদিন ধরেই ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি অর্থবছরের বাজেট  ঘোষণার আগেই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ লক্ষ্যে ১৪ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সভায় তিনি ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেন। ওই সভায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংক নানা বিচার-বিশ্লেষণ ও ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে  বৈঠক করে এ হার কমানোর উদ্যোগ নেয়। এর আলোকে ২০ জুন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির এক সভায় সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে এবং আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা   দেওয়া হয়। ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হয়। কিন্তু ১ জুলাই থেকে সরকারি ৪ ব্যাংক ছাড়া কোনো ব্যাংকই তা কার্যকর করেনি। এক মাসেও সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ায় ২ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বৈঠক ডাকেন। রাজধানীর  শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, সব ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং এমডিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অর্থমন্ত্রী বলেন, ৯ আগস্ট থেকে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করতে হবে। পরে ৯ আগস্ট রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আবারও অর্থমন্ত্রী বলেন, ৯ আগস্ট থেকে ঋণে ৯ এবং আমানতে ৬ শতাংশ সুদহার কার্যকরের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তা প্রত্যেক ব্যাংককে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু আগস্ট মাস শেষ হলেও অনেক ব্যাংকের ঋণের সুদহার দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, ঋণের সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে বেশিরভাগই নয়ছয় করছে। এখনও আগের হারেই সুদ আরোপ করছে অনেক ব্যাংক। আবার যেসব ব্যাংক নতুন সুদ ঘোষণা করেছে সেখানেও রয়েছে নানা ফাঁকি। রয়েছে বিভিন্ন রকমের চার্জের খড়গও। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগস্ট মাসে বড় ও মাঝারি খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ সুদারোপ করেছে নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক। এছাড়া ইউসিবি ১৭ শতাংশ, আইসিবি ইসলামিক সাড়ে ১৬ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ও দ্য সিটি ব্যাংক সাড়ে ১৪ শতাংশ, পূবালী, মিডল্যান্ড, মধুমতি ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ১৪ শতাংশ, ওয়ান ব্যাংক ১৩ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া, ইস্টার্ন, ডাচ্ বাংলা, ব্র্যাক, যমুনা,  ট্রাস্ট, সাউথইস্ট, প্রিমিয়ার, উত্তরা ও প্রাইম ব্যাংক ১২ শতাংশ এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক সাড়ে ১০ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। বড় ও মাঝারি খাতে আগস্টে বিদেশি খাতের সিটি ব্যাংক এনএ, ব্যাংক আল ফালাহ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, হাবিব ব্যাংক, এইচএসবিসি, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সর্বোচ্চ সুদহার দুই অঙ্কের ঘরে ছিল। আগস্টে ছোট শিল্পে মেয়াদি ঋণ বিতরণেও দুই অঙ্কের বেশি সুদ নিয়েছে প্রায় তিন ডজন ব্যাংক। এ খাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সুদ নিয়েছে নতুন প্রজন্মের এনআরবি ব্যাংক। এছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ সুদ নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। এছাড়া প্রাইম ব্যাংক সাড়ে ১৬ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ১২ শতাংশ, ডাচ্-বাংলা ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ইস্টার্ন সাড়ে ১৪ শতাংশ, ফারমার্স ও আইসিবি ১৮ শতাংশ, আইএফআইসি ও যমুনা ১২ শতাংশ, মিডল্যান্ড ১৬ শতাংশ, মেঘনা, মধুমতি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ওয়ান ও ন্যাশনাল ১৫ শতাংশ, এনসিসি ১১ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ১৫ শতাংশ, প্রিমিয়ার, পূবালী ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ১৪ শতাংশ। এছাড়া শিল্পের চলতি মূলধন খাত,  ট্রেড ফাইন্যান্স, হাউজিং, কনজ্যুমার ও ক্রেডিট কার্ড খাতেও অনেক ব্যাংকের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ২ অঙ্কের ঘরে রয়েছে।