আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আলঝেইমারস রোগ কীভাবে বুঝব?

হাসান আলী
| প্রবীণ কথা

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞসহ একদল চিকিৎসকের যৌথ মূল্যায়নের মাধ্যমে রোগটি শনাক্ত করা সম্ভব। রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিটি কতদিন বাঁচে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া অনেক জটিল। এটা নির্ভর করে ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও সেবাপ্রাপ্তির ওপর। সাধারণত ৮ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আলঝেইমারস রোগের চিকিৎসা এখনও আবিষ্কার হয়নি

আলঝেইমারস হলো মস্তিষ্কের এক ধরনের রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির স্মৃতি লোপ পায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারেন না, দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করতে পারেন না, দিন-তারিখ মনে করতে পারেন না, চেনা স্থানকে অচেনা মনে হয়, দৃষ্টিগত দূরত্ব নির্ধারণের সমস্যা, যোগাযোগ করতে সমস্যা, ভুল স্থানে জিনিসপত্র রাখা, বিচার-বিবেচনা বোধ কমে যাওয়া, সামাজিক কাজকর্ম থেকে নিজকে গুটিয়ে নেওয়া, মেজাজ এবং ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটা।

কেন এ রোগ হয় এর কারণ জানা যায়নি, প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যেই এ রোগটি দেখা যায়। পরিবারের কেউ আলঝেইমারস রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকলে অন্য সদস্যদের কিছুটা ঝুঁকি থেকে যায়। পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি এ রোগে আক্রান্ত হন। কারণ পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশিদিন বাঁচে। আলঝেইমারস রোগটি শনাক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা নেই। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞসহ একদল চিকিৎসকের যৌথ মূল্যায়নের মাধ্যমে রোগটি শনাক্ত করা সম্ভব। রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিটি কতদিন বাঁচে? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া অনেক জটিল। এটা নির্ভর করে ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও সেবাপ্রাপ্তির ওপর। সাধারণত ৮ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আলঝেইমারস রোগের চিকিৎসা এখনও আবিষ্কার হয়নি। রোগটি যেন দ্রুত বেড়ে গিয়ে রোগীর স্বাভাবিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে, সে জন্য কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কতটা কার্যকর সে নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আমেরিকায় মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আলঝেইমারস ষষ্ঠ স্থান দখল করে আছে। এটা স্তন ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের চেয়ে সংখ্যায় বেশি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মরণব্যাধি যক্ষ্মা, কলেরা, হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ অন্যান্য রোগেও আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে। যথাসময়ে চিকিৎসা নিলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯০ ভাগ। অন্যদিকে আলঝেইমারস রোগটির চিকিৎসা নেই। মৃত্যুর সম্ভাবনা শতভাগ, অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও আলঝেইমারস রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। দিন দিন এ রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। আমেরিকায় বর্তমানে ৫৭ লাখ মানুষ আলঝেইমারস রোগে আক্রান্ত। ধারণা করা হয়, ৫৫ লাখ লোক যারা ৬৫ বছর অতিক্রম করেছেন তারা এ রোগে আক্রান্ত। মোট প্রবীণ জনসংখ্যার ১০ ভাগ মানুষ আলঝেইমারস রোগী। বিপুলসংখ্যক আলঝেইমারস রোগীর সেবাযতœ-দেখাশোনা করার জন্য অনেক দক্ষ সেবাকর্মীর প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশে প্রায় ৪ লাখ মানুষ আলঝেইমারস রোগে আক্রান্ত। আলঝেইমারস রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে ১০টি সতর্কতামূলক লক্ষণ সাধারণ মানুষের নজরে আনা খুবই জরুরি বিষয়। ১. সাম্প্রতিক ঘটনা মনে করতে পারবে না কিংবা ভুলে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ দিন-তারিখের ঘটনা ভুলে যাবে। একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকবে। মনে রাখার জন্য ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর ওপর নির্ভরতা বাড়বে। স্বাভাবিক বার্ধক্যে নাম-ঘটনা-তারিখ তাৎক্ষণিক মনে না পড়লেও পরে সবকিছু মনে পড়বে। ২. পরিকল্পনা মাফিক কোনো কাজ করতে পারবে না কিংবা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে অপরাগ হবে। অতি পরিচিত রান্নার প্রণালি ভুলে যাবে। মাসিক বিলপত্র দেওয়ার কথা মনে থাকবে না। যে-কোনো কিছুতেই মনোসংযোগ রাখা কষ্টকর হবে। কোনো কাজ শেষ করতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগবে। স্বাভাবিক বার্ধক্যে সাধারণ ভুলভ্রান্তি হবে; কিন্তু বড় ধরনের ভুলভ্রান্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ৩. পরিচিত কাজগুলো নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করা কঠিন হবে কিংবা দীর্ঘ সময় লাগবে। পরিচিত জায়গা খুঁজে পাবে না। বাজেট অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে পারবে না। প্রিয় খেলার নিয়মকানুন ভুলে যাবে। স্বাভাবিক বার্ধক্যে মাঝে মাঝে ইলেকট্রনিক্স কাজে অন্যদের সহায়তা লাগবে। ৪. সময়, তারিখ, ঋতু এগুলো নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগবে। কোথায় আসছে, কীভাবে কে নিয়ে আসছে এগুলো মনে করতে পারবে না। স্বাভাবিক বার্ধক্যে মাঝেমধ্যে দিনক্ষণ, তারিখ, ঋতু মনে করতে না পারলেও কিছু সময় পর ঠিকই মনে করতে পারবে। ৫. পড়তে সমস্যা হবে। কোনো ছবি দেখে ছবির বিষয় বুঝতে না পারা। কোনো কিছুর মাঝখানে দূরত্ব, গভীরতা, উচ্চতা বুঝতে অক্ষম হবে। কোনটা কোন রং বুঝতে পারবে না কিংবা পার্থক্য ধরতে পারবে না। স্বাভাবিক বার্ধক্যে চোখের ছানি অপারেশন করলে পরিষ্কার দেখতে পাবে। ৬. কথা বলতে কিংবা লিখতে খেই হারিয়ে ফেলা। কথার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারা। সঠিক শব্দচয়ন করতে না পারা। একই কথা বারবার বলা। স্বাভাবিক বার্ধক্যে মাঝেমধ্যে সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া। ৭. কোনো জিনিসপত্র ভুল জায়গায় রাখা। কিছুক্ষণ আগে করা কাজের বর্ণনা দিতে পারবে না। জিনিসপত্র খুঁজে না পেয়ে মনে করবে কেউ নিয়ে গেছে। ৮. বিচার-বিবেচনা বোধ কমতে থাকবে। ভুল লোককে টাকা দেয়। প্রতারণার শিকার হয় বেশি। নিজের শরীরের যতœ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এগুলোর গুরুত্ব না দেওয়া। স্বাভাবিক বার্ধক্যে মাঝেমধ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতারণার শিকার হওয়া। ৯. সামাজিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। শখের কাজ, বেড়াতে যাওয়া, আড্ডা দেওয়া, খেলাধুলা থেকে বিরত থাকা। স্বাভাবিক বার্ধক্যে পরিবার ও সমাজের প্রতি বিরক্ত হয়ে মাঝেমধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। ১০. মেজাজ এবং ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন শুরু হবে। বিভ্রান্ত, বিষণœ, সন্দেহপ্রবণ, আতঙ্কিত হওয়া, দুশ্চিন্তা বেড়ে যাওয়া। অনাবশ্যক উত্তেজিত হয়ে যাওয়া। স্বাভাবিক বার্ধক্যে কোনো কিছু করার নিজস্ব নিয়ম-পদ্ধতি ভঙ্গ করলে উত্তেজিত হয়। সবসময় নিয়ম মাফিক করার প্রবণতা থাকে, এর ব্যত্যয় হলে রেগে যায়। উপরের এই ১০টি লক্ষণ আপনার কিংবা আপনার প্রিয়জনের মধ্যে লক্ষ করলে দেরি না করে কাছের হাসপাতালে চলে আসুন। আলঝেইমারস থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম করা, পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ, ইতিবাচক চিন্তা এবং সৃষ্টিশীল কাজকর্ম সম্পাদন করা।

লেখক : সভাপতি, এজিং সাপোর্ট ফোরাম
ট্রেজারার বাংলাদেশ জেরোন্টলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন