আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

৫০ শতাংশ মানুষ শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে

অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী

শব্দদূষণ

আফরোজা নাজনীন
| প্রথম পাতা

দিন দিন রাজধানীতে শব্দদূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি শব্দ দূষণের কবলে রাজধানীসহ সারা দেশ। চার পাশে নানাবিধ শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন নগরবাসী। ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য তালিকায় নাম লেখানোর একটি অন্যতম কারণও এ শব্দদূষণ। চিকিৎসকদের মতে, ৬০ ডেসিবল শব্দে সাময়িকভাবে শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে। আর ১০০ ডেসিবলে চিরতরে শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে। অথচ রাজধানী ঢাকার অনেক জায়গাতেই শব্দের তীব্রতা ১০৭ ডেসিবল পর্যন্ত ওঠে। 

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরীর ৪৫টি স্থানের শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করে তারা দেখেছে, ঢাকা শহরে এমন  কোনো জায়গা নেই যেখানে শব্দের মাত্রা স্বাভাবিক আছে। জানুয়ারিতে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপকৃত স্থানগুলো নীরব, আবাসিক, মিশ্র ও বাণিজ্যিক এলাকা। নীরব এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা ৮৩.৩ থেকে ১০৪.৪ ডেসিবল। আবাসিক এলাকায় দিনে ৯২.২ থেকে ৯৭.৮ ডেসিবল এবং রাতে ৬৮.৭ থেকে ৮৩.৬ ডেসিবল। মিশ্র এলাকায় দিনে ৮৫.৭ থেকে ১০৫.৫ ডেসিবল এবং রাতে ৮৫.৭ থেকে ১০৬.৪ ডেসিবল। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা ৯৪.৩ থেকে ১০৮.৯ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৭০টি পয়েন্টে দিনের বেলা শব্দ ৯৯.৬ থেকে ১৩০.২ ডেসিবল এবং রাতে ৪৩.৭ থেকে ৬৫.৭ ডেসিবল রয়েছে। ফার্মগেটে দিনের বেলা শব্দ ১৩০.২ ডেসিবল এবং রাতে ৬৫.৭ ডেসিবল। গাবতলী, আরামবাগ, গুলশান-২, গুলিস্তান, মিরপুর-১০, বাংলামোটর, নিউমার্কেট, উত্তরা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনের বেলা শব্দ ১২০ ডেসিবলের ওপর। উত্তরা ১৪নং সেক্টরে দিনের বেলা শব্দ ৯৯.৬ ডেসিবল এবং রাতে ৪৩.৭ ডেসিবল ।

রাজধানীতে শব্দদূষণে রোগব্যাধির মাত্রা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০টি বড় বড় রোগের কারণ ১২ ধরনের পরিবেশ দূষণ। তার মধ্যে শব্দদূষণও রয়েছে। শব্দের অত্যাচারে শুধু যে বিভিন্ন ধরনের কানের রোগ বাড়ছে তা নয়। গবেষণায় দেখা যায়, ঘুম, রক্তচাপ ও হজমের ক্ষেত্রে শারীরিক যে পরিবর্তন ঘটে তা শব্দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ভ্রƒণের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের ক্ষেত্রেও শব্দের সংযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব কারণে ঘুমের ব্যাঘাত হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো শব্দ। যখন ঘুমের ব্যাঘাত ক্রমবর্ধমান হয় তখন স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলে।
বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক, কান ও গলা বিভাগ পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে এক-তৃতীয়াংশ লোক কোনো না কোনো শ্রুতিক্ষীণতায় ভুগছেন এবং ৯ দশমিক ৬ শতাংশ শ্রুতি প্রতিবন্ধী। একই সঙ্গে দেশে ১৫ বছর বয়সের নিচের জনসংখ্যার মধ্যে শ্রুতি প্রতিবন্ধীর হার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণের বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা মহানগরীর ৫০ শতাংশ মানুষ ৩০ ডেসিবল শব্দ শোনার ক্ষমতা হারাবে, শিশুদের মধ্যে বধিরতার হার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে এবং তারা লেখাপড়ায় অমনোযোগী ও বিকার মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠবে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ও নাক, কান ও গলা বিভাগের চিকিৎসক মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, রাজধানীর শব্দদূষণ রোগের একটি কারণ। বিশেষ করে কানের যত রোগ রয়েছে তা শব্দের আঘাতে বাড়ে। তিনি আরও বলেন, ক্রমাগত শব্দদূষণের ফলে কানের টিস্যুগুলো বিকল হয়ে পড়ে তখন আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক শব্দ শুনতে পায় না। ফলে সে আর লেখাপড়ায় মনোযোগী থাকে না। ধীরে ধীরে বিকার মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠবে। এছাড়া শব্দদূষণের ফলে মানুষের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা ঘটতে পারে। শিশুদের মধ্যে মানসিক ভীতি দেখা দেয়। উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন মোহম্মদপুরের বাসিন্দা রেজা চৌধুরী। তিনি জানান, ঢাকার রাস্তায় তিনি হাঁটতে পারেন না। আধাঘন্টা হাঁটলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাসায় বা বাইরে কেউ ড্রাম পিটিয়ে গান করলেও তার অস্বস্তি হয়। উল্লেখ্য, গেল বছর ওয়ারিতে ড্রাম বাজিয়ে গান করার কারণে একজন হৃদরোগীর মৃত্যুর খবর বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তারিক চৌধুরী বলেন, অবশ্যই উচ্চ শব্দ হার্ট, ব্রেন ও উচ্চরক্তচাপ আক্রান্ত রোগীর জন্য খারাপ। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুষের করোনারি হার্ট ডিজিজ হতে পারে। তিনি বলেন, উচ্চ শব্দ শিশু, গর্ভবতী মা এবং হৃদরোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আকস্মিক উচ্চ শব্দ মানবদেহে রক্তচাপ ও হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেয়, মাংসপেশি সংকোচন করে। বক্ষব্যাধি, অ্যাজমা, অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ঢাকার মোহম্মদপুরস্থ ঢাকা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও নোয়াখালীর প্রাইস হসপিটালের চিকিৎসক ডা. বিজয় কৃষ্ণ দাস বলেন, শব্দদূষণে শ্রবণশক্তি কমে আসে, বধির হওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়, মাথাব্যথা, খিটখিটে  মেজাজ, বিরক্তিবোধ, বদহজম, অনিদ্রাসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ বিকট শব্দ যেমন যানবাহনের তীব্র হর্ন বা পটকা ফাটার আওয়াজ মানুষের শিরা ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর চাপ দেয়। এ ধরনের শব্দের প্রভাবে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়, রক্তনালি সংকুচিত হয়, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী হর্ন চালককে  বেপরোয়া গতিতে যান চালাতে উৎসাহিত করে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়।
পবার সভাপতি ড. আবু নাসের খান বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সব সময়েই বিভিন্ন সংস্থা সচেতনমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে, কিন্তু কাজ হয় না। তিনি আরও বলেন, ২০০৬ বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক বা শিল্প এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না। কিন্তু আইন ও বিধিবিধান থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগ না থাকায় রাজধানীতে শব্দদূষণের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।