আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সংসদ নির্বাচন

কৌশলে এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ

দীপক দেব
| প্রথম পাতা

বিতর্ক এড়াতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রস্তুতি
বিভিন্ন দল ও জোটের সঙ্গে যোগাযোগ
চলছে বিএনপিকে একঘরে করার চেষ্টাও

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের মধ্যদিয়ে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে কৌশলে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দেশে-বিদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিতর্ক এড়াতে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন করার জন্য বিভিন্ন দল ও জোটের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। বিএনপি যেন তাদের কাছে টেনে সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে না পারে, এজন্য ওইসব দল ও জোটকে কিছুটা ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে। এর মধ্যদিয়ে বিএনপিকেও একঘরে করার কাজটা করে ফেলতে চায় শাসক দল। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপিকে সঙ্গীহারা করাও এর আরেকটি উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা বর্জনে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না বলেও মনে করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। 

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগ বদ্ধ পরিকর। এ ক্ষেত্রে বিএনপি যদি নির্বাচন বর্জনও করে তাহলে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে দলের পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে। ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির বাইরের অন্যান্য দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও করা হচ্ছে। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক, বামপন্থি ও ইসলামীক দল ও জোটের সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ করছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা। ওই সব দলকে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের কিছুটা ছাড় দেওয়ার মনোভাবও পোষণ করা হচ্ছে। এদের অনেকেই সরকারের সঙ্গে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এছাড়া বিএনপি যেন কাউকে কাছে টানতে না পরে, সেই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিএনপির পক্ষে না গিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ অবলম্বন করলেও আওয়ামী লীগ সেই প্রক্রিয়াকেও স্বাগত জানাবে বলে জানান এক নেতা। 

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, সবাই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চান। যারা ভোটে জিততে পারবেন না, তারও এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। আর তাদের সেই সখ আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে থাকলে বা বিএনপির বিপক্ষে থাকলেই শুধু সম্ভবÑ এটা অনেকেই বুঝতে পেরেছে। তিনি বলেন, নেপাল থেকে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে আমাদের নেত্রী ড. কামাল হোসেন ও বদরুদ্দৌজা চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। ওই সময় তিনি বলেছেনÑ এটা ভালো, আমরাও চাই নির্বাচনটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হোক। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে সমমনা  দলগুলোর সঙ্গে আসন  ভাগাভাগি করবে আওয়ামী লীগ। আর নির্বাচনে অংশ না নিলে একাধিক জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ছাড়াও ছোট ছোট অনেক জোট জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের আসন নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। মূলত এসব বিষয় নিয়েই নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে দর কষাকষি করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়াও অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচনে বর্জন করে। ওই নির্বাচনে ১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। জামায়াতে ইসলামী বাদে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪১টি। অথচ বর্তমান সংসদে প্রতিনিধি রয়েছে মাত্র সাতটি রাজনৈতিক দলের। এ অবস্থায় পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও বিষয়টি নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয় আওয়ামী লীগকে। তাই আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা একাদশ সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চসংখ্যক দলের অংশগ্রহণ দেখতে চান। 
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি না এলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বির অভাব নেই, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফাঁদ তৈরির কোনো সুযোগ নেই। সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই এবার নির্বাচিত হবে। সম্প্রতি এক শ্রমিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, এ দেশে আবার বিএনপি ও তার সাম্প্রদায়িক দোষররা নাশকতার ছক আঁকছে। আন্দোলনের নামে আবারও দেশকে ২০১৪ সালের মতো সহিংসতার চক্রান্ত করছে। তিনি বলেন, সকল ষড়যন্ত্র নসাৎ করে দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক নৌকা ভাসতে ভাসতে ডিসেম্বর মাসে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছাবে। আমি আপনাদেরকে অনুরোধ করবো প্রস্তুত থাকুন।’
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টচার্য্য আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, আমরা এখনও বিশ্বাস করি বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। এজন্য আমাদের আলাদাভাবে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রয়োজন হবে না। তবে, বিএনপি যদি না আসে, সেক্ষত্রে অন্যদের আনার বিষয়ে নতুন করে চিন্তা করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, দুই মেরুকেন্দ্রীক রাজনীতি ততই পরিষ্কার হতে শুরু করবে। এখন রাজনীতি বিভিন্ন দল ও জোটের মধ্যে দর কষাকষি পর্যায়ে রয়েছে। এখন তারা হিসাব কষছেন কোন জোটের সঙ্গে থাকলে বা রাজনৈতিক অবস্থান নিলে নিজেদের জন্যে ভালো হবে। এজন্য অধিকাংশ দল ও জোট দুই মেরুর নেতাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তাছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গণে এ মুহূর্তে বেশ কয়েকটি জোট নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে ড. কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রতিষ্ঠা ও আটটি বাম দল নিয়ে গঠিত ‘গণতান্ত্রিক বাম জোট’ বেশ আলোচনায় আছে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা বিএনপির সঙ্গে ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে আলোচনার পাশাপাশি বাম জোটের সঙ্গেও আলোচনা চালাচ্ছেন। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে জামায়াত ইস্যুতে ঐক্য প্রক্রিয়া থমকে রয়েছে। এ অবস্থায় বাম দলগুলোর নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করেছেন তারা। বৃহস্পতিবার ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রতিষ্ঠা সঙ্গে সম্পৃক্ত যুক্তফন্টের নেতারা সিপিবি অফিসে ‘গণতান্ত্রিক বাম জোট’ এর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই জোটের বিপক্ষে থাকা সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বে যে আটদলীয় জোট তার সঙ্গে ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রতিষ্ঠা হলে তাতে ক্ষমতাসীনদের জন্য ভালো হবে বলে মনে করেন অনেকেই। এক্ষেত্রে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। আন্দোলনের মাঠেও একঘরে হয়ে যাবে। 
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্যতম নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের অবসান চাই, আবার বিএনপিকেও চাই না। আমরা একটা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠুক এটা নিশ্চিত করতে কাজ করছি। তাই আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগের কোনো প্রয়োজন বোধ করছি না। এরই মধ্যে আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন চেয়ে আন্দোলন শুরু করেছি। যারা এ আন্দোলনে আসতে চায়, তারা আসতে পারে। যোগাযোগ করতে পারে।’ ড. কামাল হোসেন ও বদরুদ্দৌজা চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা যোগাযোগ করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা আগে নিজেদের মন ঠিক করুক তারা কাদের সঙ্গে থাকবে। তারা বিএনপির সঙ্গে থাকবে না কী আমাদের সঙ্গে আসবেÑ আগে তাদের এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকার নিজের অবস্থানে অনড় থাকলে নির্বাচন নিয়ে তাদের ভাবনা কী জানাতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এবার নির্বাচন বয়কটও করতে পারি আবার অংশও নিতে পারি। পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেব।’ এদিকে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলন থেকে বিরত রাখার জন্য সিপিবিসহ অন্য বাম দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও শরিক দলের একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ২০ দলীয় জোটের বাইরে আছেÑ এমন আরও কিছু দল ও জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল ও শরিকদের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এর বাইরে সম্প্রতি ১৫টি ইসলামী দল নিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটানো ইসলামিক গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে সরকারের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এক সময়ের ১৪ দলের শরিক তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব এমএ আউয়াল ইসলামিক গণতান্ত্রিক জোটের নেতৃত্বে রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব ও ইসলামীক গণতান্ত্রিক জোটের মুখপাত্র এমএ আউয়াল আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমসহ অনেকের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ আছে। ২৭ সেপ্টেম্বর আমাদের প্রতিনিধি সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া দেশে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করা ও বিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ৬ অক্টোবর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশ হবে। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব ইসলামী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হবে । 
এছাড়া বাংলাদেশ ন্যাশনাল এলায়েন্স বিএনএ চেয়ারম্যান বিএনপির সাবেক নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাও সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চান বলেও আলোকিত বাংলাদেশকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ১৪ দলীয় জোটনেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে ঢাকা ১৭ আসন থেকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।