আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৪-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

হারাতে হয়েছে রেফারিকেও!

শফিক কলিম
| খেলা

যেভাবে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ১০ : ০ বাহরাইন
বাংলাদেশ ৮ : ০ লেবানন
বাংলাদেশ ৭ : ০ আমিরাত
বাংলাদেশ ২ : ০ ভিয়েতনাম
* সর্বোচ্চ গোলদাতা
আনুচিং মুঘিনি (৫টি)

দুটি গোল অফসাইডে বাতিল; একটি তো নিশ্চিত গোল ছিল। তবে এটিকে বিতর্কিত করেছেন খোদ অস্ট্রেলিয়ান রেফারি ক্যাথরিন জ্যাকুইজ। শামসুন্নাহার দারুণ শটে গোল করলেও স্বদেশি সহকারী রেনে কোহিল অফসাইডের সংকেত দেননি। রেফারি প্রথমে গোলের বাঁশি বাজালেও সহকারীর সঙ্গে কথা বলে বাতিল করেন। তহুরার করা প্রথম গোলটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছেন একই সহকারীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে। রেফারিং নিয়ে ‘কিছু বলব না’ বললেও স্বাগতিক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন ম্যাচ শেষে ক্ষোভ ঝাড়লেন, ‘এ রেফারি ২০১৬ সালেও আমাদের বিপক্ষে ঢাকা মাঠে ইরানের বিপক্ষে ভুল পেনাল্টি দিয়েছিলেন, কৃষ্ণাকে লালকার্ড দেখিয়েছিলেন। রেফারিং নিয়ে কথা বলায় ভুটানে আমাকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।’ তিনি যোগ করেন, ‘সাফে এটা নিয়ে কথা বললে বলা হয় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে এসেছে; আর এএফসির টুর্নামেন্টে বলা হয় ওরা এলিট।’ অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, ঘরের মাঠেই ১৩ জনের বিপক্ষে খেলতে হয়েছে বাংলাদেশকে!
তবে রেফারিং যা-ই হোক, গ্রুপ পর্বের প্রথম তিন ম্যাচে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ, ভিয়েতনামও। দুই দলই বাহরাইন, লেবানন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে গোল বন্যায় ভাসিয়ে ২৫টি করে গোল করেছে। ‘এফ’ গ্রুপে ফেভারিট স্বাগতিকদের রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটি। কিন্তু মাঠের খেলায় যে তারা স্বাগতিকদের চেয়ে ঢের পিছিয়ে, কাল বুঝিয়ে দিলেন লাল-সবুজ কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। ভিয়েতনামকে ২-০ গোলে হারিয়ে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবলে টানা দ্বিতীয়বার অপরাজিত গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্ব খেলার সম্ভাবনা উজ্জ্বল করেছেন মারিয়া, মনিকা, রিতুরা।
তবে আরেকটি পরীক্ষা দিতে হবে মারিয়া, তহুরাদের; ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ হবে দ্বিতীয় পর্ব, সেখানে অন্তত সেমিফাইনাল খেলতে হবে। গ্রুপ সেরা হয়ে বাংলাদেশ ছাড়াও দ্বিতীয় পর্বে উঠেছে চীন, লাওস, ইরান, অস্ট্রেলিয়া ও মিয়ানমার; সেরা রানার্সআপ হয়ে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন। এরা দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে। চার সেমিফাইনালিস্ট মূল পর্ব খেলবে উত্তর কোরিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও স্বাগতিক থাইল্যান্ডের সঙ্গে। দ্বিতীয় পর্বে ওঠা দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, লাওসের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে বাদ পড়েছে কাল ভারত।
বছর পাঁচেক ধরে দারুণ খেলছেন লাল-সবুজ নারী ফুটবলরা। সাফে রানার্সআপ, টানা দুইবার এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন, গত বছর অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে চ্যাম্পিয়ন, মাস দুয়েক আগে হংকংয়ে তিন জাতি টুর্নামেন্টে ট্রফি জিতেছেÑ সিনিয়র সাফ ছাড়া বাকি সব আসরেই অপরাজিত ছিল। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবলে গত আসরে গ্রুপ সেরা অপরাজিত, এবারও। দুই আসর মিলিয়ে টানা ৯ ম্যাচ অপরাজিত ছোটনের দল, গোল করেছে ৫৩টি!
ঈর্ষণীয় সাফল্যই লাল-সবুজ দলের। এখানেও স্বাগতিকদের সামনে দাঁড়াতে পারেনি চার প্রতিপক্ষ। কাল দাঁড়াতে দেয়নি ভিয়েতনামকেও। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কোচ ছোটন জানান, ‘কঠোর পরিশ্রম সাফল্যের মূল কারণ। মেয়েরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। সারা বছর পরিশ্রম করলে সুফল পাওয়া যায়, প্রমাণ দিয়েছি।’ এতটা প্রতাপে খেলেছে, যে গোটা ম্যাচে মাত্র একবার গোলরক্ষক রুপনা চাকমাকে বল ধরতে হয়েছে, তা-ও শেষ দিকে ফ্রিকিকে। কিন্তু সেটাও ভয়ংকর কিছু ছিল না।
৪ ম্যাচে ২৭ গোলÑ আধিপত্য রেখেই গ্রুপ সেরা বাংলাদেশ। প্রতি ম্যাচে রণকৌশল বদল করায় প্রতিপক্ষ কোচ ছোটনের ভাবনায় বাধা হতে পারেনি। ৪-১-৪-১ ছকে শুরুটাও দারুণ করেছিল মারিয়া, রিতুরা। মনিকাকে কিছুটা পেছনে খেলে অধিনায়ক মারিয়াকে রাখেন আক্রমণে, দুই প্রান্ত দিয়ে ওভারল্যাপ করে উঠেছেন বড় শামসুন্নাহার ও আনাই। মারিয়া-রিতু-তহুরা-ছোট শামসুন্নাহার মিডফিল্ডে, ফলস নাইনে খেলেছেন সাজেদা। তাদের আক্রমণের তোড়ে ত্রস্তব্যস্ত ছিল ভিয়েতনাম রক্ষণ। সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে স্বাগতিক কোচ জানান, ‘গতবার মূল পর্ব খেলেছি, এবারও একই লক্ষ্য। আপাতত গ্রুপ সেরা হয়ে প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। ম্যাচ নিয়ে কোচের বিশ্লেষণ, ‘ভিয়েতনাম শক্তিশালী দল হলেও শুরু থেকে আধিপত্য ছিল আমাদের। প্রথমার্ধে ওরা কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধে আমরা ম্যাচের লাগাম ধরে রেখে জিতেছি।’
বাংলাদেশ দলের প্রশংসা করেছেন ভিয়েতনামের কোচ থি মাই লানও, ‘বাংলাদেশ যোগ্য দল হিসেবে গ্রুপ সেরা হয়েছে। তবে আমরাও হতাশ নই, কেননা আমরা যা চেয়েছি, সেটা কিছুটা হলেও পেরেছি।’ গোল গড়ে দ্বিতীয় পর্ব নিশ্চিত করেছে যে তারা।
অফসাইডে দুটি গোল বাতিল হলেও তহুরা খাতুনই দলকে এগিয়ে দেন। অন্যটা আঁখি খাতুনের। তহুরার কণ্ঠেও পরিশ্রমের কথা, ‘অনেক কষ্ট করেছি আমরা, ভোর ছয়টায় উঠে যেমন অনুশীলন করতে হয়েছে, দুপুর ১২টায় কড়া রোদেও অনুশীলন করেছি।’ ডিফেন্ডার আঁখির কথা, ‘জয় দিয়ে গ্রুপ সেরা হওয়ায় আমরা খুশি। রক্ষণ ঠিক রেখে গোল করার লক্ষ্য ছিল আমাদের; আমরা পেরেছি।’ এখন চোখ অনূর্ধ্ব-১৮ সাফে। দুই দিন পর ভুটান যাচ্ছে এই দলের ১৩ ফুটবলার। অন্যরাও বিশ্রাম পাচ্ছেন না!