আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৪-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

নির্বাচনী হাওয়া- দিনাজপুর-৩

বিএনপিতে অনিশ্চয়তা আওয়ামী লীগে স্বস্তি

কামরুল হুদা হেলাল, দিনাজপুর
| শেষ পাতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দিনাজপুর সদর-৩ আসনে প্রচারাভিযান, জনসংযোগ, হাটে-বাজারে কুশল বিনিময় আর দলীয় কর্মীদের নিয়ে চলছে ঘন ঘন বৈঠক। ভোটের আবহাওয়ায় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের পাশাপাশি সমর্থকদের মনেও সৃষ্টি হয়েছে চাঙ্গা ভাব। নিজেদের প্রতিশ্রুতি আর উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টার কমতি নেই। তবে নির্বাচনি প্রচারাভিযানে এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি গা-ঝাড়া দিয়ে না উঠলেও ভেতরে ভেতরে নিচ্ছে নির্বাচনি প্রস্তুতি। অন্যান্য দলগুলোর ক্ষেত্রে এখনও চোখে পড়ার মতো তৎপরতা দেখা যায়নি। 

উত্তরের জনপদ দিনাজপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন দিনাজপুর সদর-৩। জেলা সদরের এ আসন একটি পৌরসভা ও সদর উপজেলার ১০ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৩। এর মধ্যে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৪৩ পুরুষ ও ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৫০ নারী ভোটার। গত ১০টি নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ পাঁচবার, বিএনপি চারবার ও জাতীয় পার্টি একবার করে জয়ী হয়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তরুণ প্রার্থী অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন, ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট এসএ বারী এটি, ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট আমজাদ 
হোসেন, ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট মোখলেসুর রহমান, ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট এম আবদুর রহিম, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ, ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার বড় বোন বেগম খুরশিদ জাহান হক (চকলেট আপা) বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন এবং নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইকবালুর রহিম সদর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। 
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইকবালুর রহিম ৩৩ হাজার ৬০০ ভোটের ব্যবধানে ২০ দলীয় প্রার্থী জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধানকে পরাজিত করে প্রথমবারের এমপি নির্বাচিত হন। দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী মাহমুদুল হাসান মানিককে ৯৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন।
টানা তিনবার বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে সদর আসনের শক্তিশালী প্রার্থী জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম ১০ বছর ধরে তার নির্বাচনি এলাকায় অনেক উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়িত করেছেন। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকা-ের মাধ্যমে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট এবং স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার অবকাঠামো নির্মাণ, দেশের বৃহত্তম মোহনপুর রাবার ড্যাম নির্মাণ, প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এশিয়ার বৃহত্তম ঈদগাহ মিনার ও ময়দান নির্মাণ, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান ও শ্মশানসহ বিভিন্ন ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং গ্রামীণ জীবনমানোন্নয়ন ও সম্প্রসারণে তার নেওয়া প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সদর উপজেলার চিত্র পাল্টে দিয়েছে। তিনি গ্রামীণ ও নগর জীবনের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং প্রসারে কয়েকশ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। দিনাজপুর স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামে পরিণত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধনের কাজ অব্যাহত রয়েছে। হুইপ ইকবালুর রহিম সদর উপজেলার ১০ ইউনিয়নে শতভাগ বিদ্যুতায়তন কার্যক্রম সম্পন্ন করে গ্রামগুলোকে আলোকিত করেছেন। ১০ বছরে তার কর্মপ্রচেষ্টার অংশ হিসেবে উন্নয়নের রোল মডেল দিনাজপুর সদর-৩ আসনকে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রশংসা ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে। দিনাজপুরের ১০ মাইলে প্রায় ৩০০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও শিল্প-কলকারখানা স্থাপনে তার নেওয়া উদ্যোগ এখন প্রায় বাস্তবায়নের পথে। 
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান এমপি ইকবালুর রহিম তার নির্বাচনি এলাকায় বহু আগে থেকে গ্রামে-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, পাড়ায়-মহল্লায় জনসংযোগ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। সেইসঙ্গে নানা সামাজিক ও জাতীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন তিনি। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী অপর দুইজন হলেন জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর এপিএস মির্জা আশফাক হোসেন ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুকুজ্জামান চৌধুরী মাইকেল। তবে এ দুইজনের নির্বাচনি কোনো ধরনের তৎপরতা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। 
সদর আসনে চারবারের বিজয়ী দল বিএনপির প্রার্থিতা নিয়ে বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। কখনও শোনা যাচ্ছে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হচ্ছেন তিনবারের নির্বাচিত এমপি প্রয়াত বেগম খুরশিদ জাহান হকের পুত্র শাহরিয়ার আক্তার হক ডন। কিন্তু সাংগঠনিক কর্মকা-ের পাশাপাশি নির্বাচনি কোনো তৎপরতায় তার অংশগ্রহণ তেমন নেই। দলীয় কোন্দলের শিকার বিএনপির একটি দুর্বল অংশ শাহরিয়ারকে প্রার্থী হিসেবে পেতে চান। বিএনপির অন্য যাদের নাম মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে শোনা যাচ্ছে, তারা হলেন দিনাজপুর পৌরসভার দুইবারের নির্বাচিত মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম এবং দিনাজপুর-২ আসনের সাবেক এমপি ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান। দলীয় বেশিরভাগ নেতাকর্মীর ইচ্ছ সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন। পরপর দুইবার তিনি প্রথম শ্রেণীর গুরুত্বপূর্ণ দিনাজপুর পৌরসভায় বিপুল ভোটের ব্যবধানে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার নির্বাচনি এলাকায় বহু আগে থেকে সাংগঠনিক ও ভোটের জনসংযোগ শুরু করেছেন। জাহাঙ্গীর তুলনামূলকভাবে বিএনপির অন্যান্য মনোনয়ন প্রত্যার্শীদের দৌড়ে এগিয়ে আছেন। সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। তিনি তার নিজ নির্বাচনি এলাকা বোচাগঞ্জ ও বিরল উপজেলা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-২ আসনে মনোনয়ন চাইবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে দিনাজপুর সদর আসনে তার নির্বাচনি কোনো তৎপরতা তেমন চোখে পড়ে না। 
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর সদর আসনে জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ শফি রুবেল, জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান বাদল, ইসলামী আন্দোলনের উপজেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা খায়রুজ্জামান ও ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য মাহমুদুল হাসান মানিক দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।