আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৪-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

টিআইবির গবেষণা তথ্য

বুড়িমারী-মংলা বন্দরে ঘুষ ছাড়া সেবা মেলে না

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রথম পাতা

বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন এবং মংলা বন্দর ও কাস্টম হাউজে ঘুষ ছাড়া সেবা মেলে না। পণ্য ছাড় ও শুল্কায়নের প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই উভয় প্রতিষ্ঠানে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন হয়। পণ্য ছাড় ও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশ এবং শ্রমিক, দালাল ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের একাংশের যোগসাজশে গড়ে ওঠা অসৎ চক্র; দুর্নীতির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি এবং পুরোপুরি ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সেবা প্রদান ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটছে এবং এসব অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘মংলা বন্দর ও কাস্টম হাউজ এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন : আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পণ্যের শুল্কায়ন, পণ্য ছাড় এবং জাহাজের আগমন-বহির্গমন প্রক্রিয়ায় কার্যকর ওয়ানস্টপ সার্ভিস প্রদান নিশ্চিতে সব পর্যায়ে অটোমেশন চালু করার সুপারিশসহ আট দফা সুপারিশ পেশ করেছে টিআইবি। মংলা ও বুড়িমারী বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউজের বুড়িমারী-মংলা বন্দরে ঘুষ মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান সুশাসনের চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনাসহ চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। জুলাই ২০১৭ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৮ সময়ে পরিচালিত এ গুণগত গবেষণায় বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, স্টিভিডোর, ক্যারিয়ার, সাংবাদিক, ব্যবসায়িক নেতা, শ্রমিক ও অন্যান্য অংশীজন থেকে প্রত্যক্ষ তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট বন্দর ও কাস্টম হাউজ সংক্রান্ত বিভিন্ন দাপ্তরিক দলিল, প্রবন্ধ, সাময়িকী, ওয়েবসাইট এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রকাশনা থেকে গবেষণার পরোক্ষ তথ্য সংগৃহীত হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান এবং আউটরিচ ও কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মনজুর ই খোদা ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. খোরশেদ আলম।
টিআইবির গবেষণা বলছে, কেবল গাড়ি নয়Ñ দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মংলা দিয়ে যে কোনো পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিতে হয় ব্যবসায়ী কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের। আমদানি পণ্যের প্রতি চালানের (বিল অব এন্ট্রি) বিপরীতে শুল্কায়নের জন্য কাস্টমসে ৩৫ হাজার ৭০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। সেই পণ্য বিকাল ৫টার মধ্যে ছাড় করতে হলে ৬ হাজার টাকা এবং এর পরে ছাড় করতে হলে বাড়তি ১ হাজার ২০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া বন্দরে প্রতিটি জাহাজ আগমন ও বহির্গমনে কাস্টম হাউজে ৮ হাজার ৩৫০ টাকা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ২১ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়।
মংলার পাশাপাশি বুড়িমারী স্থলবন্দর এবং শুল্ক স্টেশন নিয়েও গবেষণা করেছে টিআইবি। সেখানেও পণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেন বা ঘুষের প্রমাণ পেয়েছেন সংস্থাটির গবেষকরা। এখানে আমদানি পণ্যের প্রতিটি চালানের (বিল অব এন্ট্রি) বিপরীতে শুল্ক স্টেশনে ১ হাজার ৭৫০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। রপ্তানির বেলায় এটি দেড় হাজার টাকা। আবার আমদানি করা পণ্য ছাড় করতে স্থলবন্দরের কর্মকর্তাদের ৩০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। রপ্তানিতে এ ঘুষ ২০০ টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উভয় বন্দরেই ইতিবাচক কিছু অগ্রগতি ও পরিবর্তন হয়েছে যা সুশাসনের ঘাটতি সামান্য হলেও উন্নতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পদক্ষেপ ও পদ্ধতির উপস্থিতির বিষয়টিও ইতিবাচক। কিন্তু এসব ইতিবাচক অগ্রগতি ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উভয় বন্দরেই যোগসাজশের দুর্নীতি ও বলপূর্বক ঘুষ আদায়ের দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ গ্রহণ করেছে।
সেবা প্রদান প্রক্রিয়া যত দীর্ঘ ও জটিল হয়, সেবাগ্রহীতাদের দুর্নীতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি তত বৃদ্ধি পায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সেবার আধুনিকায়ন, ডিজিটাইজেশন ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে সেবা প্রদানকারীর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের বাধ্যবাধকতা কমিয়ে আনতে পারলে দুর্নীতির সম্ভাবনা ও সুযোগ কমে যায়। দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সেবার ডিজিটাইজেশন অত্যন্ত বড় একটি সমাধান উল্লেখ করে তিনি দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সেবা খাতে ডিজিটাইজেশন পদ্ধতি প্রচলনের লক্ষ্যে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে শুল্কায়ন দ্রুত ও সহজতর করতে মংলা বন্দর এলাকায় কাস্টম হাউজের পূর্ণাঙ্গ কার্যালয় স্থাপন এবং প্রযুক্তির ব্যবহারকে প্রাধান্য দিয়ে পণ্যের শতভাগ কায়িক পরীক্ষণের পরিবর্তে দৈবচয়নের ভিত্তিতে আংশিক (১০%-২০%) পণ্যের কায়িক পরীক্ষণ করার সুপারিশ করে টিআইবি। আট দফা সুপারিশের অপর উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হলো : প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা সাপেক্ষে বিভিন্ন স্তরে শূন্য পদের বিপরীতে নতুন জনবল নিয়োগ করা; প্রতি বছর সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা; বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্যতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা; নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ লেনদেন বন্ধে বন্দর ও কাস্টমসের সম্পূর্ণ এলাকা সার্বক্ষণিকভাবে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা ও দৃশ্যমান স্থানে মনিটর স্থাপন করা এবং সব ধরনের মাশুল ও শুল্ক অনলাইনে এবং ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ নিশ্চিত করা।