আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ধরে রাখা ও পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় বড় দুই দল

নোয়াখালী প্রতিনিধি
| শেষ পাতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই নির্বাচনি হাওয়া বইছে নোয়াখালী-৩ আসনে। ’৭৫-পরবর্তী এ আসনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একবারও জয়ী হতে পারেনি। বিএনপির দুর্গ হিসেবে খ্যাত এ আসনে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি হন মামুনুর রশিদ কিরন।  দীর্ঘ বছর দখলে থাকা হারানো আসনটি পুনরুদ্ধারে বিএনপির নেতাকর্মীরা বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যে কোনো মূল্যে এ আসনটি তাদের দখলে রাখার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে নোয়াখালী-৩ বেগমগঞ্জ আসনটি গঠিত। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৯৭ হাজার ২৮৬ জন। 

রাজনীতির ময়দানে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার প্রধান ব্যবসাবাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বেগমগঞ্জ উপজেলা। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী চৌমুহনী বাণিজ্য নগরী নিয়ে গঠিত এ আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে নির্বাচনি প্রচারণায় নেমে পড়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ্উপজেলা সদর থেকে শুরু করে পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের অলিগলি সম্ভাব্য প্রার্থীদের বর্ণিল ব্যানার, বিলবোর্ড আর পোস্টারে ছেয়ে গেছে। 

১৯৯১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মূলত এ আসনটি বিএনপির একক দখলে ছিল। ১৯৯১, ১৯৯৬ দুই দফায়, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনটি বিএনপি নেতা বরকতউল্লা ধরে রাখা ও পুনরুদ্ধারের
ষ শেষ পৃষ্ঠার পর
বুলুর একক দখলে ছিল। মাঝখানে ২০০১ সালে বিএনপি থেকে বরকতউল্লা বুলু  টেকনোক্রেট কোটায় প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তখন বিশিষ্ট শিল্পপতি পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম হাসেম বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এ আসনে একবার এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেত্রী লুৎফুন্নাহার মুন্নিকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি মাত্র ৫ হাজার ভোট পেয়ে জামানত হারান। সেবার আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে দোয়াত কলম প্রতীক নিয়ে  ভোট করেন বেগমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গ্লোব গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ কিরন। ২৪ হাজার ২৯১ ভোটে তিনি বিএনপির প্রার্থী বরকতউল্লা বুলুর কাছে পরাজিত হন। তখন সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ছোট ভাই বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মিনহাজ আহমেদ জাবেদও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় ৪৭ হাজার ভোট পান। 
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের অধ্যাপক মো. হানিফ এ আসনে নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে একবার আহম্মদ নজির ও একবার বোরহান উদ্দিন এমপি নির্বাচিত হন, তবে তখন এ আসনটি দুইভাগে বিভক্ত ছিল। এরপর দুইবার জাসদ-রব থেকে সৎ রাজনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান এমপি নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন পর চলতি সংসদে ২০১৪ সালে নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মামুনুর রশিদ কিরন এ আসনে এমপি হন। বর্তমান সরকারের একটানা প্রায় ১০ বছরের এলাকার নানা উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি এবারও এ আসন থেকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন চাইবেন এবং তিনি শতভাগ আশাবাদী তাকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দিলে তিনি জয়ী হবেন।
তিনি ছাড়া এ আসনে সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ছোট ভাই বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শিল্পপতি এটিএম এনায়েত উল্লাহ, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মিনহাজ আহমেদ জাবেদ ও চৌমুহনী পৌরসভার মেয়র এবং পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তার হোসেন ফয়সলও নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন এবং তারা তিনজনই দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেত্রী লুৎফুন্নাহার মুন্নিও এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন। জাতীয় পার্টি থেকে নজরুল ইসলাম, ফজলে এলাহি সোহাগসহ একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান, তবে তারা এও বলেন, জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে তখন তা থাকবে না। 
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. এবিএম জাফরউল্লাহ জানান, এ আসনটিতে আগের চেয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো। বিগত স্থানীয় নির্বাচনে ১৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টিতে ও চৌমুহনী পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনা যাকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেবেন তারা সবাই তার পক্ষে কাজ করবেন এবং তাকে জয়ী করবেন। 
অপরদিকে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা গেলেও বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলুর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে সে ক্ষেত্রে তার স্ত্রী শামিমা বরকত লাকী মনোনয়ন চাইতে পারেন। বিএনপির দুর্গ তথা ভোটব্যাংক হিসেবে খ্যাত এ আসনটিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষে বরকতউল্লা বুলু ভোট করলে এ হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করে খালেদা জিয়াকে উপহার দেবেন বলে মনে করেন নেতারা।
বিশিষ্ট শিল্পপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এটিএম এনায়েত উল্লা আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, এর আগে তিনি মনোনয়ন চেয়েছেন, এবারও মনোনয়ন চাইবেন। তিনি আশাবাদী মনোনয়ন পাবেন। কারণ সারা জীবন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন। ’৭৯ সালে ছাত্রলীগ থেকে ডাকসু কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। 
বর্তমান সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মামুনুর রশিদ কিরণ বলেন, তিনি সাড়ে বছর নোয়াখালী-৩ আসনে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, পুল, কালভার্ট, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরসহ অনেক উন্নয়ন হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জননেতা নুরুল হক আধুনিক জেনারেল হাসপাতালসহ অনেক কাজ হয়েছে। ৪০ বছরে যেই উন্নয়ন হয়নি, সাড়ে চার বছরে অনেক কাজ হয়েছে। 
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক প্রতিমন্ত্রী বরকতউল্লা বুলু বলেন, কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে বিএনপির ব্যর্থ হওয়ার কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে এসে সংসদে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের দাবি মেনে নিয়েছেন, শিশু-ছাত্রদের এ আন্দোলনে বিএনপির সমর্থন ছিল। তিনি বলেন, রায়ের আগে যখন সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান ও সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রীরা রায় নিয়ে কথা বলে থাকেন তখন বিচারকরা কি রায় দেবেন, এদেশে মানুষের কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সিলেট সিটি উপনির্বাচনে স্থগিত দুইটি কেন্দ্রে সুষ্ঠুু নির্বাচন প্রমাণ করে, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরেপক্ষ হয়, তাহলে ভোটের হার, ফল হবে বিএনপি জোটের চার-তৃতীয়াংশ আর আওয়ামী লীগ জোট পাবে চারের একাংশ। 
তিনি বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন ঐক্যবদ্ধ আর হয়নি সারা দেশে দমন-নিপীড়ন ও মামলা-হামলা, গুম-খুনের পর সবাই ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। এখন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে যে কোনো ত্যাগের জন্য নেতাকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে।