আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

প্রকৃতির বিশালতায় জীবনের উপকরণ

মাওলানা জালাল উদ্দীন
| প্রকৃতি ও পরিবেশ

পাখির সুমধুর মিষ্টি গান শুনে সত্যের জয়গান গাওয়া শিখতে পারি। সকালে পূর্ব আকাশে হাস্যোজ্জ্বল রক্তিম সূর্য দেখে জীবন চলার পথে নতুন উদ্যমে গতি লাভ করতে পারি। সন্ধ্যায় লাল টুকটুকে সূর্যটাকে পশ্চিমাকাশে অস্তমিত 
হতে দেখে এ মায়াময় পৃথিবীর নশ্বরতার কথা ভেবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে পারি

আল্লাহ তায়ালার অপরূপ সৃষ্টি এ বসুন্ধরা। তিনি সুনিপুণ শিল্পীর তুলিতে এঁকেছেন এ পৃথিবীটাকে। তিনি এ ধরাটাকে সাজিয়েছেন বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ গাছগাছালি, পাখপাখালি, নদনদী, খালবিল, পাহাড়-পর্বত ও তরুলতা দিয়ে। তিনি সবুজের মাঝে নিখুঁতভাবে এঁকে দিয়েছেন অনন্ত মায়া ও ভালোবাসা। কোনো সবুজ গাছ বা লতাপাতা দেখলেই কেমন যেন তার প্রতি একটা মায়া কাজ করে। সবুজের প্রতি একটা ভালোলাগা অনুভব হয়। তিনি এ পৃথিবীটাকে আরও সাজিয়েছেন রং-বেরঙের ফুল দিয়ে। বাহারি ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য অবচেতন মনকে জাগিয়ে তোলে। আমাদের চারদিকটা ঘিরে রেখেছে আল্লাহ প্রদত্ত হাজারো নেয়ামত ও তাঁর শিল্পের নিখুঁত ছোঁয়া। এসবই শিক্ষাগ্রহণের নানা উপকরণে ভরপুর। আমরা আল্লাহ তায়ালার সেসব অপরূপ সৃষ্টি থেকে নানাভাবে শিক্ষা নিতে পারি। 

বিশাল সুনীল আকাশ থেকে উদারতা শিখতে পারি। সাগরের উত্তাল তরঙ্গ থেকে বাতিলের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা শিখতে পারি। কুলকুল অবিরাম বয়ে যাওয়া নদী থেকে কল্যাণের পথে অবিরত নিরন্তর চলা শিখতে পারি। সুদৃঢ় মজবুত পাহাড় ও পর্বতমালা থেকে সত্যের পথে অবিচল ও অটল থাকার শিক্ষা নিতে পারি। শীতল ছায়াবিশিষ্ট গাছ দেখে বিপদগ্রস্ত কোনো অসহায় ব্যক্তির জন্য গাছের মাতো ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়ানো শিখতে পারি। জোনাকির মিটিমিটি আলো দেখে শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের কাছে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার সবক নিতে পারি। বাহারি রং-বেরঙের প্রজাপতির নয়নাভিরাম ডানার নাচন দেখে দুঃখীজনের দুঃখ-বেদনায় তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্ত¡না প্রদানে উদ্বুদ্ধ হতে পারি। ফুলের হাসি ও সুবাস থেকে অপর ভাইদের কুফরির পূতিগন্ধময় বীভৎস পরিবেশে ঈমানের সুবাস বিলিয়ে দিতে উৎসাহ পেতে পারি। পাখির সুমধুর মিষ্টি গান শুনে সত্যের জয়গান গাওয়া শিখতে পারি। সকালে পূর্ব আকাশে হাস্যোজ্জ্বল রক্তিম সূর্য দেখে জীবন চলার পথে নতুন উদ্যমে গতি লাভ করতে পারি। সন্ধ্যায় লাল টুকটুকে সূর্যটাকে পশ্চিমাকাশে অস্তমিত হতে দেখে এ মায়াময় পৃথিবীর নশ্বরতার কথা ভেবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে পারি। 
তবু কেন জানি আমরা সেই শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকি। আলো আঁধারকে দূর করে দেয়; বাস্তব জীবনচিত্রে আমরা আলোকে দূরে ঠেলে দিয়ে আঁধারকেই আপন করে নিই। ভালোর বদলে মন্দটাকেই বন্ধু বানাই। 
ভালো কথা ও ভালো কাজ, এমনকি সৎ কর্মশীল ভালো মানুষও আমাদের কাছে খুব অপছন্দনীয় ও ঘৃণার পাত্র। ভালো নয়; কিন্তু মন্দে ভরপুর, এমন কথা, কাজ ও মানুষকে আমাদের ভীষণ ভালো লাগে। 
আমাদের বিবেক-বুদ্ধি দিন দিন লোপ পাচ্ছে। সৎচিন্তা বরফের মতো গলে গলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আকাশকুসুম কল্পনার পাখিগুলোও এতদিনে মনে হয় ডানাবিহীন হয়ে পড়েছে। স্বপ্নের পায়রাগুলো ডানা মেলে ওড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। হৃদয়-বাগানটাও মনে হয় বসন্তহীন হয়ে পড়ছে। হৃদয়কাননের কলিগুলো ফুল হয়ে ফোটার আগেই ঝরে পড়ছে। ফলে সমাজ জীবনে পুষ্প কাননের সৌরভ ছাড়ানোর বদলে স্বয়ং বাগানটি সুবাসবিহীন নিষ্ফলা ও পুষ্পহীন রয়ে যাচ্ছে। 
আজ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণির পেশাজীবীর মাঝে যেমন মন্দ লোকের ছড়াছড়ি, তেমনি সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে ছড়িয়ে রয়েছে অসৎ ও মন্দ কাজের সয়লাব। মানুষ আলোকিত না হয়ে দিন দিন আঁধারের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে শুধু গভীর অন্ধকার আর অন্ধকার। কোথাও আলোর লেশমাত্র নেই। আলোকিত মানুষের দেখা নেই। দ্যুতিময় চাঁদের মিষ্টি হাসি নেই। ভোর-বিহানে দোয়েলের মিষ্টি মধুর গান নেই। শ্রাবণের রিমঝিম বৃষ্টি নেই। কৃষ্ণচূড়ার লাল টুকটুকে ফুল দিয়ে পথে বিছানো লাল গালিচা নেই। বসন্তে কোকিলের কুহুকুহু ধ্বনি নেই। আছে শুধু হাহুতাশ। হাহাকার চারদিকে মন্দ আর অসৎ কারবার। হে রাব্বুল আলামিন! মোদের দেখাও আলোর দিশা বারবার! 
আমাদের কর্তব্য হচ্ছে মহান আল্লাহর অপার সৃষ্টি-প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা ও কোরআন-হাদিসের আলোকে জীবন গড়ে তোলা। সর্বদা সদা সদাচার ও সবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, সাধ্যমতো জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা, নিজেরা সৎকাজ করার পাশাপাশি অন্যদেরও সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করা এবং অসৎ কাজে বাধা প্রধান করা। তাহলেই সমাজটা সুখের স্বপ্ননীড়ে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ!