আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ফুলে ফুলে সুরভিত দেশ

মোস্তফা কামাল গাজী
| প্রকৃতি ও পরিবেশ

ফুল ভালোবাসার প্রতীক। সৌন্দর্যের আলয়। স্নিগ্ধতার পেলব স্পর্শ। মানুষমাত্রই ফুলের পাগল। ফুল পছন্দ করেন না, এমন মানুষ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাহারি রঙের ফুল মানুষের অন্তরে এনে দেয় প্রশান্তির ছোঁয়া। কোমলতায় ভরে দেয় মন ও মনন। মহান আল্লাহ তায়ালার অপূর্ব সৃষ্টি ফুলের সৌন্দর্য দেখে ঈমানে আসে প্রবলতা। সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে স্রষ্টার সৌন্দর্য কিঞ্চিৎ উপলব্ধি করা যায়।

বাংলাদেশকে ফুলের নিকুঞ্জ বললে অত্যুক্তি হবে না। ঋতুভেদে হাজারো ধরনের ফুলের সমাহার ঘটে চিরসবুজ এ দেশে। একেক ঋতুতে একেক ফুলের সৌন্দর্য। ফুলে ফুলে সেজে থাকে এ দেশ।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কিছু ফুল বৈশিষ্ট্যসহ তুলে ধরা হলোÑ
শাপলা : বাংলাদেশের বিলে-ঝিলে প্রচুর শাপলা ফোটে। কাটা ধান ক্ষেতে জমে থাকা অল্প পানিতে এ ফুল ফুটে থাকতে দেখা যায় বেশি। এটি মূলত জলজ উদ্ভিদ। বিশ্বে এ উদ্ভিদের প্রায় ৩৫টি প্রজাতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে তিন ধরনের শাপলা বেশি দেখা যায়। সাদা, লাল ও সাদা পাপড়ির মধ্যে হালকা নীল। এর মধ্যে সাদা শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। শাপলা ফোটা ঝিলে ডিঙি নৌকা দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দটাই অন্যরকম। মনে হয় যেন বিশাল বিলে অসংখ্য ঝাড়বাতি একসঙ্গে জ্বলছে। এটি যেমনভাবে দর্শক হৃদয়ে আনন্দ বয়ে আনে, তেমনি এটি খাবারের জন্যও বেশ উপযোগী। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বিলেই দেখা যায় বিভিন্ন রঙের শাপলার।
গোলাপ : গোলাপ ফুলকে বলা হয় প্রণয়ের প্রতীক। অপূর্ব এ ফুলটি ছোট-বড় সব বাগানেই মেলে। গোলাপের উপহার পরস্পর ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। এক ধরনের গুল্মজাতীয় গাছে এ ফুল ফুটে থাকে। পৃথিবীতে প্রায় ১০০ প্রজাতির বিভিন্ন বর্ণের গোলাপ ফুল পাওয়া যায়। গোলাপি, লাল, হলুদ, সাদা, কালো, সবুজ ইত্যাদি। গোলাপের পাপড়ির গড়ন ও বিন্যাসে এক ধরনের জাদুময়ী নান্দনিকতা রয়েছে, যা মানুষের মনকে সহজেই আকৃষ্ট করে। সুগন্ধি গোলাপের ঘ্রাণও মানুষের প্রিয়।
কদম : বর্ষার আগমনি বার্তা বয়ে আনে কদম ফুল। এ যেন বর্ষার দূত! লম্বা গাছের ডালে থরে থরে ঝুলে হাজারো কদম। বৃষ্টির ছোঁয়ায় আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বাতাসের ঝাপটায় দুলতে থাকা কদম অপূর্ব সুন্দর দেখায়। কদম ফুলের সৌন্দর্যের মতোই এর আরও কিছু চমৎকার নাম রয়েছে। বৃত্তপুষ্প, সর্ষপ, ললনাপ্রিয়, সুরভি, মেঘাগমপ্রিয়, মঞ্জুকেশিনী, কর্ণপূরক, পুলকি ইত্যাদি। পুরো ফুলটি আমরা একটি ফুল মনে করলেও এটি আসলে অসংখ্য ফুলের গুচ্ছ। টেনিস বলের মতো দেখতে এ ফুলের ভেতরের ভাগে রয়েছে মাংসল পুষ্পাধার, যাতে হলুদ রঙের ফানেলের মতো পাপড়িগুলো আটকে থাকে। পাপড়ির মাথায় থাকে সাদা রঙের পরাগদ-। হলুদ-সাদা কদম ফুল গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁকে দেখায় সোনার বলের মতোই! বর্ষাপ্রেমীদের কাছে কদম একটি প্রিয় ফুল। 
কাশফুল : শরৎকালে নদী বা বিলের পাড়ের শুভ্র কাশফুল যে-কারোর মনকে ছুঁয়ে যায়। শরৎ মানেই নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা আর কাশের বনে স্নিগ্ধ ফুলের মেলা। কাশফুলের এ অপরূপ সৌন্দর্য কবিমনেও এঁকে যায় কবিতার পঙ্ক্তিমালা। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র খালবিল, নদীর তীরে এবং চরাঞ্চলের অবারিত মাঠজুড়ে শরতে রেশমি সাদা কাশফুল ফোটে ব্যাপক হারে। ফুল ঊর্ধ্বমুখী ও গন্ধহীন। ফুটন্ত ফুল দীর্ঘদিন ধরে সৌন্দর্য বিলিয়ে যায়। এর গাছের উচ্চতা গড়ে ৫ থেকে ১০ ফুট হয়ে থাকে। শরৎজুড়ে এ ফুল ফোটার ব্যাপ্তি থাকে। 
শিউলি : বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফুলগুলোর মধ্যে শিউলি অন্যতম। এটি শেফালি নামেও পরিচিত। এ ফুল রাতে ফোটে, সকালে ঝরে যায়। সকালের শিশিরস্নাত শিউলিতলা অপূর্ব সুন্দর দেখায়। পাড়াগাঁয়ের ছেলেমেয়েরা কোঁচড়ে ভরে এ ফুল কুড়ায়। মালা গেঁথে গলায় পরে। শিউলি ছোট আকারের বৃক্ষজাতীয় ফুল গাছ। গাছের শাখা-প্রশাখার অগ্রভাগে ফুল ধরে। পাতার রং সবুজ, মধ্যশিরা স্পষ্ট, অগ্রভাগ সূচালো। পাতার অন্য বৈশিষ্ট্য হলো কচিপাতার কিনারা খাঁজকাটা থাকে। শিউলি মূলত শরৎ ঋতুর ফুল। তবে বছরের অন্য ঋতুতেও গাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। 
স্বর্ণচাঁপা : স্বর্ণচাঁপা মূলত পাহাড়ি ফুল। সমতলেও দেখা যায়। অপরূপ সুন্দর এ ফুলের কা- সরল, উন্নত, মসৃণ ও ধূসর। পাতা চ্যাপ্টা, উজ্জ্বল-সবুজ, একান্তরে ঘনবদ্ধ। ফুল একক, কাক্ষিক এবং মøান-হলুদ, রক্তিম কিংবা প্রায় সাদা। পাপড়ির সংখ্যা প্রায় ১৫। পরিপূর্ণ প্রস্ফুটিত চাঁপা তীব্র সুগন্ধি। গ্রীষ্মের প্রথমভাগ থেকে বর্ষা-শরৎ অবধি ফুল থাকে। ফুল শেষ হলে গুচ্ছবদ্ধ ফল ধরে।
হাসনাহেনা : রাতের বেলা সুগন্ধি ছড়ানোর জন্য হাসনাহেনার জুড়ি নেই। মনমাতানো ঘ্রাণে চারদিক ম-ম করতে থাকে। সুগন্ধির জন্যই অনেকের কাছে এ ফুলটি খুব প্রিয়। গাছ ঝোপালো লতানো ধরনের হয়। ডালের গায়ে অজস্র সাদা সাদা তিল থাকে। বছরে কয়েকবার ফুল ফোটে। তবে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় বেশি ফোটে। ডালের আগায় ঝুলানো থোকা সন্ধ্যায় ফোটে ও সুগন্ধ ছড়ায়।
কেয়া : কেয়াফুলের সৌন্দর্য অপূর্ব। এটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। লম্বায় ৩-৪ মিটার হয়ে থাকে। এ গাছের কা- গোলাকার এবং কাঁটাযুক্ত। কা- থেকে শাখা-প্রশাখা বের হয়। পাতার কিনারায় করাতের মতো কাঁটা বিদ্যমান। পুরুষ কেয়াকে বলা হয় সিত কেতকী এবং স্ত্রী কেয়াকে স্বর্ণ কেতকী। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে কেয়া ফুল ফোটে। এ কারণে বাংলাদেশে কেয়াকে বর্ষার ফুল বলা হয়। এর ফুলের রং সাদা এবং গন্ধযুক্ত। 
কৃষ্ণচূড়া : ঋতুরাজ বসন্তের ফুল হলো কৃষ্ণচূড়া। এ ফুল ছাড়া বসন্তের মনোহারী যেন প্রকাশই পায় না। আগুনঝরা ফাগুনে গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকে এ ফুল, যা সহজেই দর্শক হৃদয়ে ভালোলাগার তুলির স্পর্শে পেলব আঁকে। লাল, কমলা, হলুদ ফুল এবং উজ্জ্বল সবুজ পাতা কৃষ্ণচূড়া গাছকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ফুল জন্মে। সৌন্দর্যবর্ধক গুণ ছাড়াও এ গাছ উষ্ণ আবহাওয়ায় ছায়া দিতে বিশেষভাবে উপযুক্ত।
গাঁদা : হলুদ পাপড়িযুক্ত গাঁদা ফুল দেখতে খুবই চমৎকার। শীতকালে সাধারণত এ ফুল ফোটে বেশি। বাড়ির আঙিনা, উঠোনের কোণ ভরে যায় গাঁদা ফুলে। এ ফুল সাধারণত উজ্জ্বল হলুদ ও কমলা রঙের হয়ে থাকে। বাগানের শোভাবর্ধন ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান ও গৃহসজ্জায় এর ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে।
চাঁপা : বসন্ত-গ্রীষ্মে সাধারণত এ ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুলের পাপড়ির রং হালকা হলুদ বা সোনালি। ফুল তীব্র সুগন্ধিযুক্ত। পাপড়ির সংখ্যা প্রায় ১৫টি। এ ফুলের প্রতি ভ্রমর আকৃষ্ট হয় না, কারণ এর রস তেতো। কিন্তু উজ্জ্বল রং ও স্নিগ্ধ সৌরভ দর্শকের মনকে মুগ্ধ করে তোলে সহজেই। 
বেলি : বেলি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। গাছের পাতা উজ্জ্বল সবুজ। পাতার মধ্যে ছোট অসংখ্য ফুল থোকায় থোকায় ফুটে বেরোয়। ফুলের পাপড়ি সুবিন্যস্ত। ফাল্গুন থেকে শুরু করে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত ফুল ফোটে। বর্ষাকালেও ফুল থাকে। বেলি ফুল ফোটে সন্ধ্যায় এবং পরদিন দুপুরে ঝরে যায়। সাদা রঙের তীব্র সুগন্ধযুক্ত, মালা গাঁথার বিশেষ উপযোগী। এ বেলি ফুল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পরিচিত। বাগানে ও টবে চাষ করা যায়।
এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন ঋতুতে অসংখ্য ফুলের মেলা বসে। যার গণনা শেষ করার মতো নয়। বাহারি ফুল আমাদের মনে দিয়ে যায় ভালোলাগার অপূর্ব ছোঁয়া।