আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

নির্বাচন ও রাজনীতি : প্রবাল দ্বীপের দেশে

মহসীন হাবিব
| সম্পাদকীয়

নিঃসন্দেহে ২৩ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে ইয়ামিনের পরাজয় ভারতকে মালদ্বীপ প্রশ্নে এক ধরনের জয় এনে দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, আমরা মালদ্বীপের জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানাই। সেই সঙ্গে আমাদের দুই 
দেশেরই গভীর সম্পর্ক অব্যাহত 
থাকবে বলে চীন আশা করে

 

আমাদের খুবই কাছের প্রতিবেশী সার্ক পরিবারভুক্ত দেশ মালদ্বীপ। ছোট্ট দেশ। সব মিলিয়ে ১১৫ স্কয়ার মাইল। অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপ। বেশিরভাগই দেখতে ঠিক যেন মহাসাগরে জলরাশিতে ভাসমান একেকটি নেকলেসের মতো। আর সে কারণেই দেশটির নাম মালদ্বীপ। সিংহলি ভাষায় মালাই (হয়তো বাংলায় মালা শব্দটিরও উৎপত্তি একই সূত্র থেকে, কোনো কোনো গবেষক বলেছেন, সংস্কৃতি মালাদ্বীপ থেকে মালদ্বীপ নাম হয়েছে) এবং দিভাইনা বা দ্বীপ শব্দ থেকে দেশটির নাম হয়েছে মালদ্বীপ। এ নেকলেসের মতো দ্বীপ কোনো কোনোটি এতটাই সরু যে, একটি ঘর তোলা সম্ভব নয়। সেগুলো প্রায় পানির সমতলে। একটু ঢেউ এলেই তা তলিয়ে যায়। আর লোকসংখ্যা? আমাদের একটি নির্বাচনি এলাকার সমানও নয়! ছেলে-বুড়ো সব মিলে মাত্র সাড়ে ৪ লাখ মানুষের বসবাস। রাজধানী মালে মাত্র ২.২ স্কয়ার মাইলের একটি দ্বীপ। এ শহরেই প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার লোকের বাস। অর্থনীতি বলতে শিল্পকারখানার কোনো বালাই নেই। বহুকাল ধরে দেশটির প্রধান আয় ছিল কড়ি এবং নারকেলের ছোবড়ার দড়ি। ট্যুরিজম শিল্প হিসেবে বিস্তার লাভ করার পর তা এখন প্রধান আয়ের উৎস মালদ্বীপের। আর আছে মাছের ব্যবসা। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের তুন মাছ মালদ্বীপ রপ্তানি করে থাকে। 
তা হলে কী হবে, দেশটির রাজনীতি কিন্তু ছোট নয়। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার লড়াই, বিচার বিভাগ ব্যবহার এবং বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার (১০০ ভাগ মুসলমানের দেশ) সবই আছে মালদ্বীপে। আমাদের মনে আছে, নিশ্চয়ই সার্ক সম্মেলনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক অনুষ্ঠানে একজন গোলগাল মুখের প্রেসিডেন্ট আসতেন। চোখে চশমা, ভদ্রলোকের মতো দেখতে। তিনি ছিলেন মামুন আবদুুল গাইউম। লন্ডন, মিশর ও শ্রীলঙ্কা থেকে পাস করা মালদ্বীপের ডিক্টেটর। ১৯৭৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৮০ থেকে ৮৩ সাল পর্যন্ত কয়েকবার মামুনকে উৎখাতের চেষ্টা হয়। তখন ব্যাপারটি কেউ বিশেষ গায়ে মাখেনি। কিন্তু ১৯৮৮ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল গেরিলাদের দল প্লটের ১৬০ জন স্পিডবোট নিয়ে দেশটিতে গিয়ে রেডিও স্টেশন, এয়ারপোর্ট, টেলিভিশন স্টেশন দখল করে নেয়। প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইউম এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি দৌড়ে পালিয়ে বেড়ান। আর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ভারত ও পাকিস্তানে ফোন করে সাহায্যের আবেদন জানাতে থাকেন। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রাজীব গান্ধী। রাজীব গান্ধী দ্রুত সেনা প্রেরণ করে পরিস্থিতি সামাল দেন। 
এ অভ্যুত্থান চেষ্টা বিশেষ কোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ ছিল না। শ্রীলংকায় বসবাসরত একজন মালদ্বীপের ব্যবসায়ীর প্ররোচনায় গাইউমকে উৎখাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। এখন মালদ্বীপ নিয়ে বড় দুই প্রতিবেশী চীন ও ভারতের অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষ করে চীনের ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের মহাপরিকল্পনার আওতায় চলে এসেছে মালদ্বীপ, যা স্বভাবতই ভারতের পছন্দ হচ্ছে না। আর সে কারণেই মালদ্বীপের রাজনীতি অধিকতর তীব্র হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে মালদ্বীপে একটি সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়। সে দেশের আদালত কয়েকজন বিরোধী দলের নেতাকে মুক্তির আদেশ দেন। প্রেসিডেন্ট আবদুুল্লাহ ইয়ামিন ৫ ফেব্রুয়ারি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং দেশের প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি, তারই সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, দুজন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ঘটনাক্রমে সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুুল গাইউমকে গ্রেফতার করেন। তিনি সরকারের সমালোচনাকারী যে কাউকে অন্তরীণ করতে দ্বিধাবোধ করতেন না। মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ভারত এ জরুরি অবস্থা এবং দমন-পীড়ন ভালো নজরে দেখেনি। একই সঙ্গে ভারত তার এ অগণতান্ত্রিক কাজকে ক্ষমতার পালাবদলের ক্যাটালিস্ট হিসেবে দেখেছে। আরও একটি বিষয় প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের প্রতি ভারতকে নাখোশ করে। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন রোড, ট্রান্সপোর্টসহ কয়েকটি বিষয়ে চীনের সঙ্গে চুক্তি করেন। চীন হয়ে ওঠে ইয়ামিনের অন্ধ সমর্থক। ওদিকে মালদ্বীপের বিরোধী দলের নেতারা জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে ভারতকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়। এমন পরিস্থিতিতে চীন ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেডসহ ১১টি যুদ্ধজাহাজ পূর্ব-ভারত সাগরে প্রেরণ করে। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন আবদুল গাইউম সৌদি আরবের কাছ থেকেও নিয়মিত আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন পেয়ে আসছিলেন। উল্লেখ্য, ইয়ামিন মামুন আবদুল গাইউমেরই সৎভাই। মামুন আবদুল গাইউমের বাবা গাইউম ইব্রাহীমের ছিল আট স্ত্রী এবং সেই আট স্ত্রীর গর্ভে ২৫ সন্তান জন্মগ্রহণ করে। 
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট কে হবেন, তা নিয়ে ভারত ও চীন দুই দেশেরই ছিল বিশেষ নজর। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। ফলে ভারত মনেপ্রাণে চেয়েছে মালদ্বীপ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ইব্রাহীম মোহাম্মদ সলিহ যাতে নির্বাচিত হন। সলিহকে সমর্থন দিয়েছেন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ। নাশিদ ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিন্তু নাশিদের মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্য তখন তার সঙ্গে থাকেননি। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অসহযোগিতা শুরু করেন। মাত্র চার বছর আগে প্রথম গণতান্ত্রিক পথে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ মানুষ। অবশেষে পুলিশ ও মিলিটারির অস্ত্রের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ২০১৩ সালে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসেন ইয়ামিন। এবার ২৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে তাকেও পরাজিত করল মালদ্বীপের জনগণ। আবার নাশিদের কোয়ালিশনকে জয়ী করল। বিদায় প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। 
মালদ্বীপের নির্বাচন থেকে শেখার আছে অনেক। একটি বিষয় পরিষ্কার যে, মালদ্বীপের মানুষ বারবার পরিবর্তন দেখতে চায়। আর এ পরিবর্তন দেখতে চায় দেশের রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক দৈন্যের কারণে। অন্যদিক এ পরিবর্তন দেখতে চাওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, জনগণ তাদের যাপিত জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তৃতীয় আরেকটি দুর্ভাগ্য মালদ্বীপের আছে। দেশটিতে ওয়াহাবি এবং সালাফি মতবাদ শক্ত করে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে চীন ও ভারতের মালদ্বীপ নিয়ে বাড়তি টানাপড়েন। 
নিঃসন্দেহে ২৩ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে ইয়ামিনের পরাজয় ভারতকে মালদ্বীপ প্রশ্নে এক ধরনের জয় এনে দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, আমরা মালদ্বীপের জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানাই। সেই সঙ্গে আমাদের দুই দেশেরই গভীর সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে বলে চীন আশা করে। তবে এ ধরনের বক্তব্য সাধারণত যে-কোনো দেশের নির্বাচনের পর দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু আদৌ চীনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক মালদ্বীপের বজায় থাকবে কি? চীন এবং মালদ্বীপ ২০১৭ সালে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে স্বাক্ষর করে। তখন বর্তমান প্রেসিডেন্টের কোয়ালিশন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ সেই অ্যাগ্রিমেন্টের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। এবার যদি নাশিদ ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বাতিলের জন্য ইয়ামিনকে চাপ দেন, তাহলে কি চীন সেটা খুব সহজভাবে মেনে নেবে? শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনের মাধ্যমে চীনকে অনেকটা হাত গুটিয়ে নিতে হয়েছিল। ইয়ামিনের মতোই শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকশে ছিলেন চীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হাম্বানটোটা শহরসহ বহু উন্নয়ন কাজে চীন ছিল শ্রীলংকার সহযোগী। চীন-সমর্থক রাজাপাকশের নির্বাচনে পরাজয়ের পর চীনের শ্রীলংকার প্রতি ভরসা বেশ খানিকটা কমাতে হয়েছে।
ইয়ামিন সরকারের সময় চীন যে কাজটি করেছে, তা মালদ্বীপের অর্থনীতিতে একটি ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে বলে অনেক আইএমএফ ও একাধিক অর্থনীতিবিদ বলেছেন। চীন মালদ্বীপকে উন্নয়ন কাজে ১.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি এ অর্থ সিবার্স করা হতো, তাহলে ২০২০ সালে অর্থাৎ মাত্র দুই বছর পরই মালদ্বীপের জিডিপির ১২০ শতাংশ ঋণের টাকা গুনতে হতো। 
সবকিছুর পর একটি বিষয় ছিল বড়ই সুন্দর। নির্বাচনটি অত্যন্ত সুষ্ঠু ও বিতর্কহীন হয়েছে, যা সাধারণত তৃতীয় বিশ্বে দেখা যায় না। মালদ্বীপের মতো একটি দেশে ৮৯ শতাংশ নাগরিক তাদের ভোট প্রদান করেছে। পরাজিত প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন ভোটের ফলাফল মেনে নিয়ে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এটি চাট্টিখানি কথা নয়। ভারত আগে থেকেই ধারণা করেছিল, এ নির্বাচনে চীন সমর্থিত ইয়ামিন হয়তো ভোট কারচুপির আশ্রয় নেবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য সবারই ধারণা ছিল এ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। আর সে কারণে তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। উপরন্তু ইয়ামিন সরকারকে বলে দিয়েছিল নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে মালদ্বীপের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। কিন্তু সব ধারণা ভুল প্রমাণ করে, সবাইকে অবাক করে দিয়ে মালদ্বীপের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ভারত সবাই নতুন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছে। মালদ্বীপের নির্বাচন কমিশনকে সাধুবাদ জানিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করে সলিহকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মালদ্বীপের নিয়মানুযায়ী নির্বাচনের সাত দিন পর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে ফলাফলের। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের দায়িত্ব শেষ হবে ১৭ নভেম্বর। এখন দেখার বিষয় মোহাম্মদ সলিহ ক্ষমতায় এসে একই সঙ্গে কীভাবে চীন, ভারত এবং বাকি বিশ্বকে সামলান। 

ষ মহসীন হাবিব
লেখক ও সাংবাদিক