আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বিপর্যয়ে মানসিক রোগ

ডা. মুনতাসীর মারুফ
| সুস্থ থাকুন

বিপর্যয়-পরবর্তী এ মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো দুর্ঘটনার গ-ি ছাড়িয়ে বড় কোনো দুর্যোগের প্রতিক্রিয়ায় হয়ে থাকে। সিডর, আইলা, সুনামির মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, টর্নেডো, হারিকেন, বন্যা, ভূমিকম্প অথবা যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক সহিংসতা, অপহরণ, যৌন নির্যাতন, সড়ক দুর্ঘটনা, ভবন ধস বা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এ ধরনের দুর্যোগের উদাহরণ

দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায়ই দুর্ঘটনার সম্মুখীন হই। কখনও কখনও এমন কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যায়, যা একেবারেই অনভিপ্রেত ও আকস্মিক। হয় নিজেরাই সেই দুর্ঘটনার শিকার হই, অথবা হই প্রত্যক্ষদর্শী। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে কোনোভাবেই সেই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই না কেন, তা আমাদের চিন্তাজগতকে এলোমেলো করে দেয়, আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। এ ধরনের ঘটনা আমাদের মনে চাপ ও কষ্টের সৃষ্টি করে। কারও কারও ক্ষেত্রে সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। প্রাথমিকভাবে কোনো সমস্যা না হলেও পরে এমনকি বছর কয়েক পরেও এ দুর্ঘটনার সূত্র ধরেই মানসিক অসুস্থতার শিকার হতে পারেন অনেকে।

বিপর্যয়-পরবর্তী এ মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো দুর্ঘটনার গ-ি ছাড়িয়ে বড় কোনো দুর্যোগের প্রতিক্রিয়ায় হয়ে থাকে। সিডর, আইলা, সুনামির মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, টর্নেডো, হারিকেন, বন্যা, ভূমিকম্প অথবা যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক সহিংসতা, অপহরণ, যৌন নির্যাতন, সড়ক দুর্ঘটনা, ভবন ধস বা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এ ধরনের দুর্যোগের উদাহরণ। এ রোগের উপসর্গগুলো প্রবল যন্ত্রণাদায়ক। ভয়ঙ্কর ওই ঘটনার দুঃসহ স্মৃতি বারবার ফিরে আসে। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো শব্দ, দৃশ্য বা আলোচনা মনে সে স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে পারে। মনে হয় যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে জীবনে। রোগী একই রকম ভয়, আতঙ্ক, বেদনা অনুভব করেন, যেমন অনুভূতি হয়েছিল প্রকৃত ঘটনাটির সময়। ঘুমের মাঝে দুঃস্বপ্নেও হানা দেয় সেই স্মৃতি। 
অনেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেন চারপাশ থেকে। লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেন। নিজের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করতে অক্ষম হয়ে পড়েন।
কেউ কেউ আবার হয়ে পড়েন অস্থিরচিত্ত। তারা উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত আচরণ করেন, সবসময় কোনো বিপদের শঙ্কায় মাত্রাতিরিক্ত সতর্ক থাকেন। কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না, ঘুম কমে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে শারীরিক নানা সমস্যা যেমনÑ মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা বা ম্যাজম্যাজ করা, বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা, খাওয়ায় অরুচি প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। অনেকে বিষণœতায় আক্রান্ত হন। আক্রান্তদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয় অন্যদের চেয়ে বেশি। শিশুদের মধ্যে পরে পরিবেশ ও মানুষ সম্পর্কে অতিরিক্ত ভীতি গড়ে উঠতে পারে। 
সহিংসতা ও দুর্যোগের কারণে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওষুধ এবং বিশেষ কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপিÑ উভয়ের সমন্বয়ে চিকিৎসা করা হয়। আর দুর্যোগ পরিস্থিতির পরপরই আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তিদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণসহ তাদের আবেগ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে মানসিক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি কমে যায়।

ডা. মুনতাসীর মারুফ 
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল