আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

চরিত্রবান সন্তান সেরা নেয়ামত

মাহফুজুর রহমান তানিম
| নবী জীবন

মানবজাতির শুরু থেকে শেষ, দিনের সূচনা থেকে অন্ত আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত আর কৃপা ছাড়া এক সেকেন্ড বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই। আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের অঢেল অনুকম্পায় ঢেকে রেখেছেন। জলে-স্থলে, তাদের শরীর ও পরিপার্শ্বে তথা সমগ্র পৃথিবীতে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অসংখ্য নেয়ামত ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের কল্যাণে। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, ‘যদি আল্লাহর নেয়ামত হিসাব করে দেখ, তবে গুনে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।’ (সূরা ইবরাহিম : ৩৪)। এই নেয়ামতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চরিত্রবান সন্তান। কোরআন-হাদিসের অনেক স্থানে এ ব্যাপারে বর্ণনা রয়েছে।

বার্ধক্যের অবলম্বন নেক সন্তান
মানুষের অক্ষমতা ও অসহায়ত্বের সময় হলো বৃদ্ধকাল। এ সময়ের একমাত্র অবলম্বন হয়ে থাকে নেক সন্তান। আল্লাহ তায়ালাও সন্তানকে বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা করার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশÑ ‘যদি তোমাদের কাছে তাদের (মা-বাবা) কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদের ‘উহ’ পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমকের সুরে জবাব দিও না বরং তাদের সঙ্গে মর্যাদাসহকারে কথা বল। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাক এবং দোয়া করতে থাক এই বলে : হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতাসহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।’ (বনি ইসরাইল : ২৩-২৪)। মা-বাবার বাধ্য ও অনুগত নেক সন্তানÑ এ আসমানি বাণীর প্রতি লক্ষ্য করে কখনোই মা-বাবার বার্ধক্যের সময় তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে না। 
চরিত্রবান সন্তান দুনিয়ার শোভা
চরিত্রবান সন্তান দুনিয়ার সৌন্দর্য। মানুষ ভালো সন্তানের বাবা হলে এ নিয়ে গর্ব করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা।’ (সূরা কাহাফ : ৪৬)। আল্লামা ইবনে কাসিরসহ অনেক মুফাসসির বলেন, ‘উত্তম সন্তান মোমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার।’ 
মৃত্যুর পর নেক সন্তানের অবদান
নেক সন্তানই মা-বাবা মৃত্যুবরণ করলে ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সগিরা’ এ আকুতি জানিয়ে কবরের পাশে গিয়ে ক্রন্দন করবে, দোয়া করবে। তাতে মা-বাবার মর্যাদা আল্লাহ তায়ালা বৃদ্ধি করবেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর ৪টি আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে : ১. যে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দিল তার সওয়াব, ২. ভালো কাজ চালু করার ফলে তাকে যারা অনুসরণ করল তার সওয়াব, ৩. যে ব্যক্তি এমন সদকা করল, যা প্রবহমান থাকে তার সওয়াব, ও ৪. এমন নেক সন্তান রেখে যাওয়াÑ যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২২২৪৭)। অন্য হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মৃত্যুর পর যখন কোনো বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়, তখন সে বলে, হে আমার রব, এ পুরস্কার কোন আমলের বিনিময়ে? (আমি তো এত আমল করিনি) তখন বলা হবে, তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছে।’ (আল আদাবুল মুফরাদ : ৩৬)।
নেক সন্তানের জন্য নবীদের দোয়া
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ তায়ালার কাছে যে কয়েকটি আর্জি পেশ করেছেন এর মধ্যে অন্যতম হলো নেক সন্তানের জন্য দোয়া। কোরআনে তার দোয়াটি এভাবে এসেছে, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করো।’ (সূরা সাফফাত : ১০০)। জাকারিয়া (আ.)ও উত্তম সন্তান চেয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। কোরআনের বর্ণনাÑ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পূতপবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা কবুলকারী।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩৮)। এর দ্বারা বোঝা যায়, চরিত্রবান সন্তান নবী-রাসুল সবার জন্যই বিশেষ দান। আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের পরিচয় দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, তারা পুণ্যবান স্ত্রী ও সন্তানের জন্য দোয়া করেন। এরশাদ হয়েছে, ‘(তারা দোয়া করে) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর করো এবং আমাদের মোত্তাকিদের আদর্শস্বরূপ করো।’ (সুরা ফুরকান : ৭৪)।
তবে চরিত্রবান সন্তান আল্লাহর দান হলেও এ বিশেষ নেয়ামত পাওয়ার জন্য চেষ্টাসাধনা করতে হয়। সন্তানের প্রতি কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ বিষয়েও কোরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। 
শিষ্টাচারের দীক্ষাদান 
সন্তানকে আদব শিক্ষা দিতে হবে। আদববিহীন কোনো শিক্ষাই তার উপকারে আসবে না। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে বাঁচাও, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সূরা তাহরিম : ০৬)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আলী (রা.) বলেন, ‘অর্থাৎ, তাদের আদব শিক্ষা দাও এবং ইলম শেখাও।’ (তাফসির ইবন কাসির, উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)। তিরমিজি শরিফের একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘সন্তানকে একটি আদব শিক্ষা দেওয়া এক ‘সা’ পরিমাণ সদকা করা অপেক্ষা উত্তম।’
ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান 
সন্তান জ্ঞানবান হলেই তাকে নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষাবিহীন কোনো শিক্ষাই পরিপূর্ণ নয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের ৭ বছর হলে তাদের সালাতের নির্দেশ দাও, তাদের বয়স ১০ বছর হলে এ জন্য তাদের শাসন করো এবং তাদের পরস্পরে বিছানা পৃথক করে দাও।’ (আবু দাউদ : ৪৯৫)। 
মোটকথা, সন্তান ভালোমন্দ হওয়ার ব্যাপারে মা-বাবার ভূমিকা অনেক বেশি। এ প্রসঙ্গে ইমাম গাজালি (রহ.) এর একটি উক্তি দিয়ে প্রবন্ধের ইতি টানছি। তিনি বলেন, ‘জেনে রাখ, শিশু প্রতিপালন পদ্ধতি একটি অতি গুরত্বপূর্ণ বিষয়। আর সন্তান তার মা-বাবার কাছে আমানতস্বরূপ। তার পবিত্র অন্তর অমূল্য মানিক্য, যে কোনো নকশা বা ছবি থেকে যা মুক্ত। ফলে তা যে কোনো নকশা গ্রহণে প্রস্তুত এবং তাকে যার প্রতিই ধাবিত করা হবে সে দিকেই ধাবিত হয়। তাই তাকে ভালোয় অভ্যস্ত করা হলে, সুশিক্ষায় প্রতিপালন করলে, সেভাবেই সে গড়ে উঠবে। ইহকালে ও পরকালে সে সুখী হবে। তার নেকিতে তার মা-বাবা এবং তার প্রত্যেক শিক্ষক ও শিষ্টাচারদানকারীই অংশীদার হবেন। পক্ষান্তরে তাকে খারাপে অভ্যস্ত করা হলে, তাকে পশুর মতো অবহেলা করা হলে, সে হবে হতভাগ্য ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। আর এর দায় বর্তাবে তার কর্তা ও অভিভাবকের ওপর।’ (ইহয়াউ উলুমিদ্দীন : ৩/৬২)।