আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

জান্নাতে নবীজির হাউজে কাউসার

শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান হুজায়ফি
| নবী জীবন

মুসলিমমাত্রেই আপনার সংকল্প হওয়া উচিত মানবজাতির সর্দার নবী মুহাম্মদ (সা.) এর হাউজ থেকে পানি পান করার সৌভাগ্য অর্জন এবং এ লক্ষ্য অর্জনে কীভাবে আমল করা, তা জানা। এটি জান্নাতবাসীর সর্বপ্রথম পানীয়। আল্লাহ যাকে এ হাউজ থেকে পান করার তৌফিক দান করবেন এবং অনুগ্রহ করবেন এর পর তার আর কোনো ভয় থাকবে না। যে ব্যক্তি নবীর হাউজে আগমন করবে আল্লাহ তার জন্য এর আগের ভয়ানক ধাপগুলো সহজ করে দেন। হাউজের ওপর ঈমান আনা আখেরাতের প্রতি ঈমান আনার মতোই। যে হাউজের ওপর ঈমান আনে না তার ঈমান নেই। কেননা ঈমানের রুকনগুলোর মাঝে পার্থক্য করা হয় না। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো একটি রুকনের প্রতি ঈমান আনেনি, সে যেন সবই অস্বীকার করল।
হাউজ আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নবী মুহাম্মদ (সা.) এর জন্য সম্মাননা। কেয়ামতের দিন তাঁর উম্মত হাশরের ময়দানে বিচারের অবস্থানে থাকাকালে সেখান থেকে পানি পান করবে। সেদিনটি কাফেরদের জন্য ৫০ হাজার বছরের সমান হবে। মোমিনের জন্য আল্লাহ সেদিনটিকে খাটো করে দেবেন। এ দিনে বিচারের অবস্থানস্থলে মানুষকে এমন ভয়ংকর বিভিন্ন পরিস্থিতি আচ্ছন্ন করে রাখবে, যা তারা সহ্য করতে পারবে না। আল্লাহ যদি তাদের শরীরে সহ্য করা এবং টিকে থাকার শক্তি না দেন, তাহলে তারা সবাই মারা যাবে। বিচারের ময়দানে তাদের এমন প্রচ- তৃষ্ণা পাবে, যা তাদের কলিজা পুড়িয়ে দিতে থাকবে, তাদের পেটে এমন প্রবল তৃষ্ণার আগুন জ্বালাবে যে রকম তৃষ্ণার্ত তারা আগে কখনও হয়নি।
আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মদ (সা.) কে হাউজের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন। তাঁর উম্মত সেখান থেকে পানি পান করবে। তিনি সেটার মূল অংশে দাঁড়িয়ে থাকবেন। নিজের উম্মতের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। এটা দেখে তিনি অনেক আনন্দিত হবেন। নিজের উম্মতকে সেখান থেকে পানি পান করতে ডাকবেন। এ হাউজের প্রশস্ততা ও বর্ণনা প্রসঙ্গে নবী (সা.) এর অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সূরা কাউসারে কোরআন এটার আলোচনা করেছে। প্রত্যেক নবীরই একটি হাউজ থাকবে। সুমরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, নবীরা কার থেকে কোন নবীর উম্মত বেশি, এটা নিয়ে গর্ব করবেন। আমি আশা করি সেদিন তাদের সবার চেয়ে আমার কাছে আগমনকারী বেশি হবে। তাদের প্রত্যেকেই সেদিন পূর্ণ হাউজের সামনে দাঁড়ানো থাকবেন। সঙ্গে থাকবে একটি লাঠি, উম্মতের মধ্যে যাকে চিনবেন তাকে ডাক দেবেন। প্রত্যেক উম্মতের চিহ্ন থাকবে, তা দেখে তাদের নবীরা তাদের চিনতে পারবেন। (তিরমিজি)।
আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এর হাউজ তাঁর শরিয়তের মতোই সবচেয়ে বড়, বিশাল ও সুমিষ্ট হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমার হাউজের আয়তন আইলা নগরী থেকে এডেন নগরীর দূরত্বের চেয়েও বেশি। সেটি দুধের চেয়েও বেশি সাদা, মধুর চেয়ে বেশি মিষ্টি, বরফের চেয়ে বেশি ঠান্ডা। তার পানপাত্রের সংখ্যা তারারাজির চেয়েও অধিক।’ (মুসলিম)। 
আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যার হাতে আমার জীবন তার কসম! এর পানপাত্রের সংখ্যা গভীর নির্মল আকাশের তারকাম-লী ও গ্রহরাজি থেকেও বেশি। জান্নাতের এ পাত্র থেকে যে পান করবে, সে আর কখনও তৃষ্ণার্ত হবে না। এখানে জান্নাত থেকে দুটি প্রবাহ এসে পড়ে।’ (আহমাদ ও মুসলিম)। 
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমার হাউজ এডেন ও আম্মান নগরীর মধ্যবর্তী আয়তনের মতো বিশাল। সেটি অনেক অনেক প্রশস্ত। সেখানে স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরি দুটি পানির প্রবাহস্থল আছে। তার পানি দুধের চেয়ে সাদা, এর স্বাদ মধুর চেয়ে বেশি মিষ্টি এবং মেশকের চেয়ে বেশি সুরভিত এর ঘ্রাণ। এখান থেকে যে পান করবে, সে আর তৃষ্ণার্ত হবে না, তার চেহারা কখনও মলিন হবে না।’ (আহমাদ ও ইবনে মাজাহ)।
জায়েদ বিন খালেদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তোমরা কি জানো ‘কাউসার’ কি? সেটি জান্নাতের একটি নদী, যা আমার রব আমাকে দান করেছেন। তাতে আছে প্রভূত কল্যাণ। কেয়ামতের দিন আমার উম্মত সেখানে অবতরণ করবে। তার পানপাত্রের সংখ্যা গ্রহরাজির মতো। সেখান থেকে তাদের কাউকে টেনে বের করা হলে আমি বলব, হে রব, সে তো আমার উম্মত। তখন বলা হবে, আপনার পরে সে কী বেদাত সৃষ্টি করেছে তা তো আপনি জানেন না।’ (আহমাদ ও মুসলিম)।
হাউজটি হবে কেয়ামতের অবস্থানস্থলের ভূমিতে একটি বিশাল জায়গা, কাউসার নদীর পানি দিয়ে আল্লাহ সেটাকে পূর্ণ করে রাখবেন। এখানে কাউসার নহর থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের দুটি প্রবাহ এসে পড়বে, যেটাকে আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) কে দান করেছেন। এ হাউজের পানি কমবে না। প্রবল তৃষ্ণার মুহূর্তে প্রত্যেক মোমিন নারী-পুরুষ সেখান থেকে পান করবে। সেটি পান করার পরে কেউ আর কখনও তৃষ্ণার্ত হবে না। আর যারা নবীর এ হাউজে আগমন করে পানি পান করবে তারা হলেন তাঁর সুন্নাহর অনুসারী, তাঁর দিকনির্দেশনা পালনকারী, কবিরা গোনাহ পরিহারকারী। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি বড় বড় গোনাহ থেকে বিরত থাক যেগুলো করতে তোমাদের নিষেধ করা হয়, আমি তোমাদের পাপ মোচন করব এবং তোমাদের সম্মানজনক জায়গায় প্রবেশ করাব।’ (সূরা নিসা : ৩১)।
নবী করিম (সা.) এর সুন্নাহ ও পথনির্দেশ আঁকড়ে ধরার পাশাপাশি তারা দূরদর্শিরতার সঙ্গে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, এটা আমার পথ, আমি এবং আমার অনুসারীরা দূরদর্শিতার সঙ্গে আল্লাহর দিকে ডাকি। আল্লাহ সবকিছু থেকে পবিত্র। আমি মোশরেকদের দলভুক্ত নই।’ (সূরা ইউসুফ : ১০৮)। 
তারা কথা, কাজ ও আদর্শের মাধ্যমে নবীর শরিয়তের দিকে দাওয়াত দেয়। দ্বীনের মধ্যে বিভিন্ন বেদাত ও কুসংস্কার বর্জন করে। শরিয়তের ক্ষেত্রে অগ্রাহ্য বিষয়গুলো পরিহার করে। যশ ও লোকদেখানো মনোভাবের বিপরীতে আন্তরিকতা ও ইখলাস অবলম্বন করে। সব ধরনের শিরক থেকে বিরত থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হাউজ থেকে পানি পান করার অন্যতম উপায় ও পন্থা হলো রাসুলের জন্য বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। তাই আপনি আপনার রবের জন্য নামাজ পড়–ন এবং কোরবানি করুন। নিশ্চয়ই আপনার শত্রুই নির্বংশ।’ (সূরা কাউসার : ১-৩)।
রাসুলের হাউজে আগমন করার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় প্রতিবন্ধক, সেগুলোর অন্যতম হলো দ্বীনের মধ্যে বেদাত ও কুসংস্কার সৃষ্টি করা, কথা, কাজ ও ফতোয়া দিয়ে ইসলামের পথে বাধা তৈরি করা এবং কবিরা গোনাহে লিপ্ত হওয়া। শরিয়ত পালনে রিয়া তথা লোকদেখানো মনোভাব পোষণ করা, খ্যাতির লোভ করা এবং মানুষের ওপর জুলুম করাও হাউজে আগমনের ক্ষেত্রে বড় বাধা। মোটকথা যে ব্যক্তি নবী করিম (সা.) এর শরিয়তের অনুসরণ করবে, সে হাউজে আগমন করবে আর যে বেদাতে লিপ্ত হয়ে শরিয়ত পরিবর্তন করবে, সে তা থেকে বঞ্চিত হবে।

১১ মহররম ১৪৪০ হিজরি 
মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 
ভাষান্তর মাহমুদুল হাসান জুনাইদ