আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আ.লীগ জয় ধরে রাখতে চায়, মরিয়া বিএনপি

আজহারুল হক, গফরগাঁও
| শেষ পাতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশসহ নানা সমীকরণ চলছে ময়মনসিংহ-১০ সংসদীয় আসন গফরগাঁওয়ে। নানা কারণে আলোচনায় উঠে আসে গফরগাঁও। ১৫ ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা আর দুইটি থানা নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৭৩ জন। এ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলে মনে করে থাকেন তারা। গফরগাঁওয়ের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন ঐতিহ্যবাহী দুই পরিবার। আওয়ামী লীগের রাজনীতির কা-ারি প্রয়াত সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ এবং বিএনপির রাজনীতির দিকপাল প্রয়াত সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান সুলতান। আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের মৃত্যুতে তার ছেলে ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল আওয়ামী লীগের রাজনীতির হাল ধরেছেন। রাজনীতিতে অভিষেক হয় ২০০৯ সালে উপজেলা নির্বাচনে জয়ী হয়ে। 

তবে ১/১১ এর রাজনীতির পটভূমিতে আচমকা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন। দলীয় মনোনয়নে এমপি হয়ে দ্রুত তিনি নানাভাবে সংবাদের শিরোনাম হয়ে আলোচনার ঝড় তোলেন। তাই দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল রেকর্ড ভোটে এমপি হলেন। তবে ওই সময় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না কেউ। এবার নির্বাচনে বিএনপিকে অংশীজন ধরেই রাজনীতির মাঠ গুছিয়েছেন তিনি। এছাড়া আওয়ামী লীগের হয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন সাবেক এমপি ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) রেজাউল করিম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, সাবেক জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল্লাহ আনোয়ার বুলবুল, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ ও উপকমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ আবুল হোসাইন দিপু, সাবেক মেয়র ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কায়ছার আহমেদ। এছাড়া জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা কারি হাবিবুল্লাহ বেলালীর নাম শোনা যায়। 
রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ’৭৯ ও ’৯৬ সালে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত ফজলুর রহমান সুলতান। এছাড়া শুধু একবার নতুন মুখ হিসেবে এসেছিলেন তারই সহোদর অনুজ এবি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি ভোটের হিসাবে কিছুটা আগোয়ান ছিলেন বড় ভাইয়ের ভোটের অনুপাতে। এ পরিবারের উত্তরসূরি ফজলুর রহমান সুলতানপুত্র মুশফিকুর রহমান আপন চাচাকে নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়ে নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। ইদানীং রাজনীতিতে আবারও কিছুটা সরব হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ আবুল কাশেম। এবার তিনি মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া এখানে জাতীয় পার্টির কর্মকা- ঘরোয়া রাজনীতির বৃত্তে আবদ্ধ। 
আওয়ামী লীগের ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল রাজনৈতিক কারিশমা তার রাজনীতির আদর্শ ও শিক্ষাগুরু প্রয়াত বাবা সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন গোলন্দাজকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এছাড়াও ২০দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধ-হরতাল কর্মসূচির সময়েও স্ফুলিঙ্গের মতো তিনি রাজপথ দখলে রেখে একক নেতায় পরিণত হয়ে তখনকার এমপির বিরোধিতার মুখেও প্রায় ৩০ হাজার ভোট বেশি পেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি মনোনয়ন পেলে এ আসনটি আবারও আওয়ামী লীগের দখলে থাকবে বলে মনে করে উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা মাসুদ হোসেন সোহেল। এমপি ফাহমী গোলন্দাজ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলার জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। আমি আমার নির্বাচনি এলাকায় তারই প্রতিনিধিত্ব করে থাকি। 
১/১১ এর রাজনীতির পটভূমিতে প্রথমবার এসেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে যান ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন। দলীয় মনোনয়নে বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি ফজলুর রহমান সুলতানকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন। এবারও তিনি মনোনয়নের অন্যতম দাবিদার। নির্বাচন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তিনি গণসংযোগ করছেন। সাবেক এ এমপিরও এলাকায় রয়েছে সুসংহত অবস্থান।
মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মেজর (অব.) রেজাউল করিম ২০০৯ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রত্যাহার করেন। এবার বেশ জোরেশোরেই মাঠে নেমেছেন। রেজাউল করিম বলেন, জিয়া হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেল খেটেছি। ছাত্র অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিয়ে গফরগাঁওবাসীর সেবা করার সুযোগ দেবেন বলে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি ওবায়দুল্লাহ আনোয়ার বুলবুল বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার এমন অনেক দলীয় নেতাকর্মীর পাশে থেকে আর্থিক সহযোগিতা করেন। 
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে স্ফুলিঙ্গের মতো যিনি রাজপথ উত্তপ্ত রেখেছিলেন বর্তমান ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল। মনোনয়নের প্রত্যাশায় কাজ করে যাচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ উপকমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ আবুল হোসাইন দিপু একজন শিক্ষাবিদ রাজনীতিক। এর আগেও দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। বর্তমান সময়ে এ নেতা বেশ সক্রিয়। তিনিও মনোনয়ন প্রত্যাশায় উঠান বৈঠক, মতবিনিময় ও গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের দখলে থাকা আসনটি পুনরুদ্ধার এবং মনোনয়নের প্রত্যাশায় কাজ করছেন ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও গফরগাঁও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ এবি সিদ্দিকুর রহমান। দৃঢ়চেতা এ নেতারও এলাকায় রয়েছে সুসংহত অবস্থান। তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে হেরে গেলেও বিএনপির ভোটব্যাংক আরও শক্তিশালী করতে পেরেছিলেন। এ সরকারের সময়ে তিনি সংগঠন শক্তিশালী করতে পর্যায়ক্রমে উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে কমিটি গঠন করেন। কমিটির সুবাদে বর্তমানে তিনি অন্যদের চেয়ে সুসংহত অবস্থানে থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশায় উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল চষে বেড়াচ্ছেন। এছাড়াও বিএনপি সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এ নেতার সঙ্গে যুগপৎ কাজ করে যাচ্ছেন। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমার নামে ১২টি মামলা চলমান। এছাড়াও বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের শত শত নেতাকর্মী মামলার আসামি হয়েও জীবন বাজি রেখে দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। 
কেন্দ্রীয় তৃণমূল দলের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আল ফাতাহ খান ছাত্রদলের রাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সে সময়ের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত রেখেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের অনেক নির্যাতিত নেতাকর্মীকে সহযোগিতা করায় বিএনপির এ নেতাকে বিপদের কা-ারি হিসেবে চেনেন সবাই। ফাতাহ খান বলেন, বিএনপির দুর্দিনের কা-ারি হয়ে রাজপথে লড়াই-সংগ্রামে আমি ও আমার অনুসারীরা রয়েছে। এলাকায় গণসংযোগ করছি। দলীয় মনোনয়ন পাব এ প্রত্যাশায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পথ চলছি।
মানব সেবায় নিবেদিত হয়েও রাজনীতির মাঠে নিজেকে কর্মীবান্ধব রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোফাকখারুল ইসলাম রানা ছাত্রজীবনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। ১/১১ এর পর থেকে অদ্যাবধি বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর শাসক দলের যে খড়গ, সেখানে তিনি নির্যাতিতদের অন্যতম ভ্রাতা হিসেবে উঠে এসেছেন। তার পক্ষে নির্যাতিত বিএনপির এমন হাজারো নেতাকর্মী গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলার শিকার বিএনপির এমন অনেক নেতাকর্মীর সুচিকিৎসার পাশাপাশি দুঃসময়ে আর্থিক সহযোগিতা করায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভরসায় পরিণত হয়েছেন সৎ ও সদালাপি এ নেতা। তৃণমূল পর্যায়ের নির্যাতিত নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে সার্বিক সহযোগিতা করায় কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় এ নেতা। ডা. রানা বলেন, আমার নির্বাচনি এলাকার নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের জন্য আমার যা কিছু করার প্রয়োজন আমি তাই করব। জনগণের সঙ্গে ছিলাম। জনগণের সঙ্গেই থাকব।