আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

১৪টির ব্যাখ্যা তলবের সিদ্ধান্ত

৯ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেনি ২১ ব্যাংক

জিয়াদুল ইসলাম
| প্রথম পাতা

ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে গড়িমসি করছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৯ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেনি অন্তত ২১টি ব্যাংক। ৯ আগস্টের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদ কর্তৃক এ সুদহার নির্ধারণের কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো সেটি আমলেই নেয়নি। ঋণের সুদ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি পরিচালিত পরিদর্শন (তদন্ত) প্রতিবেদনে এ অসঙ্গতি উঠে এসেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যাখ্যা তলবসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর ফজলে কবির। আগামী সপ্তাহে চিঠি পাঠিয়ে ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চাইবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৭ দিনের মধ্যে এ চিঠির জবাব দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

সূত্র জানায়, ৯ আগস্ট থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় আমানতে ৬ ও ঋণে ৯ শতাংশ সুদ কার্যকরে নির্দেশনা ছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এ মাসের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন-১ বিভাগ থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ২১টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঋণে ৯ শতাংশ সুদ কার্যকর না করার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, এবি ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, পূবালী ব্যংক ও মিডল্যান্ড ব্যাংক।
জানা যায়, ১৯ আগস্ট অভিযুক্ত এসব ব্যাংকের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দেন গভর্নর ফজলে কবির। এ বিষয়ে উপস্থাপিত নোটে গভর্নর বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার অন্যদের তুলনায় এত বেশি কেনÑ সে বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করুন’। প্রথম ১৪টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে গভর্নর এ নির্দেশ দেন। পরবর্তী ছয়টির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, পরিদর্শনে আমরা দেখেছি, সবক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ৯ থেকে ৬ সুদ কার্যকর করেনি। কী কারণে তারা নির্দেশিত মাত্রায় সুদ নামিয়ে আনছে না, সেটির বিষয়ে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হবে। তাদের থেকে সন্তোষজনক জবাব পাওয়া না গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। 
সূত্র জানায়, বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগেই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে ঋণের সুদহার ১ অঙ্কে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ১৪ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা-লীর সভায় তিনি ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংক নানা বিচার-বিশ্লেষণ ও ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করে এ হার কমানোর উদ্যোগ নেয়। এর আলোকে ২০ জুন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির এক সভায় সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে এবং আমানতের সুদ হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া হয়। ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হয়। কিন্তু ১ জুলাই থেকে সরকারি চার ব্যাংক ছাড়া কোনো ব্যাংকই তা কার্যকর করেনি। এক মাসেও সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ায় ২ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বৈঠক ডাকেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব, সব ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং এমডিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অর্থমন্ত্রী বলেন, ৯ আগস্ট থেকে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদ হার ৯ শতাংশ কার্যকর করতে হবে। পরে ৯ আগস্ট রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আবারও অর্থমন্ত্রী বলেন, ৯ আগস্ট থেকে ঋণে ৯ এবং আমানতে ৬ শতাংশ সুদহার কার্যকরের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যেক ব্যাংককে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু আগস্ট মাস শেষ হলেও অনেক ব্যাংকের ঋণের সুদহার ২ অঙ্কের ঘরে রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, ঋণের সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে বেশির ভাগই নয়-ছয় করছে। এখনও আগের হারেই সুদ আরোপ করছে অনেক ব্যাংক। আবার যেসব ব্যাংক নতুন সুদ ঘোষণা করেছে সেখানেও রয়েছে নানা ফাঁকি। রয়েছে বিভিন্ন রকমের চার্জের খড়গও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগস্ট মাসের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ মাসে প্রায় আড়াই ডজন বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের গড় সুদহার ১ অঙ্কের (সিঙ্গেল ডিজিট) ওপর ছিল। এ তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ এবি ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ও মধুমতি ব্যাংক।