আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ইসলামে ন্যায়বিচার

হেলাল উদ্দীন হাবিবী
| ইসলাম ও সমাজ

 

আদল আরবি শব্দ, এর আভিধানিক অর্থ ইনসাফ, ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য রক্ষা করা ইত্যাদি। শরিয়তের পরিভাষায়Ñ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবন তথা জীবনের সব ক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাকে আদল বলা হয়।
ন্যায়বিচার এমন এক অনুকরণীয় নীতি, সুস্থ সমাজ সংরক্ষণে যার প্রয়োগ অপরিহার্য। ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো জাতি নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। তাই সমাজের সর্বক্ষেত্রে ও সর্বস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। মহান আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও নিকটাত্মীয়দের দান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি অশ্লীলতা, গর্হিত কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।’ (সূরা নাহল : ৯০)।
মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের (প্রত্যেক) আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে ফয়সালা করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সুন্দর উপদেশ দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সবকিছু শোনেন এবং দেখেন।’ (সূরা নিসা : ৫৮)।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আরও এরশাদ করেন, ‘হে মোমিনরা! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, আল্লাহর জন্য সাক্ষীস্বরূপ। যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা বাবা-মা কিংবা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে হয়। কেউ যদি বিত্তবান কিংবা বিত্তহীন হয়, আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করতে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বলো অথবা এড়িয়ে যাও, তবে তোমরা যা করো আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক খবর রাখেন।’ (সূরা নিসা : ১৩৫)।
যারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না বরং বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে প্রবৃত্তির অনুগামী হয়, মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারণ করেছেনÑ ‘যারা আল্লাহ তায়ালার নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না তারাই জালেম।’ (সূরা মায়িদা : ৪৫)।
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না তারাই কাফের।’ (সূরা মায়িদা : ৪৪)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকার জান্নাতে যাবে, আর বাকি দুই প্রকার জাহান্নামে যাবে। যে সত্যকে উপলব্ধি করে সে অনুযায়ী রায় প্রদান করে, সে জান্নাতে যাবে। আর যে সত্যকে উপলব্ধি করা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করে রায় প্রদান করে, সে জাহান্নামে যাবে। যে অজ্ঞতাপ্রসূত রায় প্রদান করে, সে-ও জাহান্নামে যাবে।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
মহানবী (সা.) ছিলেন ন্যায়-ইনসাফের মূর্ত প্রতীক। তিনি প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ন্যায়বিচার ও ইনসাফভিত্তিক সমাজব্যবস্থার যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তা আজও বিশ্ববাসীর জন্য মাইলফলক।
জাতি-ধর্ম, বর্ণ-শ্রেণি, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, ধনী-দরিদ্র, মালিক-শ্রমিক সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা তাঁর আনীত ধর্ম ইসলামের শাশ্বত নীতি। যেখানে পক্ষপাতিত্বের কোনো অবকাশ নেই।
একদা কোরাইশ বংশীয় মাখজুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা চুরির অপরাধে ধরা পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার হাত কাটার নির্দেশ প্রদান করেন। আভিজাত্য ও বংশ মর্যাদার উল্লেখ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একান্ত স্নেহভাজন ওসামা ইবনে জায়দ (রা.) মহিলার জন্য সুপারিশ করলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘তুমি কি আল্লাহর দ-বিধির ব্যাপারে সুপারিশ করছ? অতঃপর তিনি লোকদের আহ্বান করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করলেন, হে মানবজাতি! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী মানুষ পথভ্রষ্ট হয়েছে এ জন্য যে, তাদের কোনো সম্মানিত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত। আর সমাজের নিচু শ্রেণির লোক চুরি করলে তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করত তবে অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দিতাম।’ (বোখারি, মুসলিম)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সব ধর্মের লোকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মদিনায় বিশর নামক একজন (নামধারী মুসলমান) মোনাফেক বাস করত। একবার এক ইহুদির সঙ্গে তার বিবাদ বেধে যায়। ইহুদি লোকটি বলল, চল মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে গিয়ে এর মীমাংসা করে আসি। কিন্তু বিশর এ প্রস্তাবে সম্মত হলো না। বরং সে ইহুদি নেতা কাব ইবনে আশরাফের কাছে মীমাংসার জন্য যাওয়ার প্রস্তাব করল। কাব ইবনে আশরাফ ছিল ইহুদিদের সর্দার ও মুসলমানদের কট্টর দুশমন।
বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ইহুদি নিজেদের সর্দারকে বাদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মীমাংসাকে পছন্দ করছিল, অথচ নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয়দানকারী বিশর রাসুল (সা.) এর স্থলে ইহুদি সর্দারের মীমাংসা চাইছিল। এর আসল কারণ হলো, রাসুল (সা.) এর ন্যায়বিচারের অবিচল নীতি সম্পর্কে তারা উভয়ে পূর্ণ অবগত ছিল। আর (নামধারী মুসলমান) বিশর জানত ন্যায়বিচার হলে সে হেরে যাবে।
অনেক বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত ইহুদির মত অনুযায়ী রাসুল (সা.) এর কাছে গিয়ে মীমাংসার সিদ্ধান্ত হলো। অতঃপর রাসুল (সা.) উভয়ের কথা শুনে তদন্ত ও অনুসন্ধান সাপেক্ষে ইহুদির পক্ষে রায় দিলেন।
কিন্তু বিশর এ রায় মেনে নিতে পারল না। সে ইহুদিকে নিয়ে ওমর (রা.) এর কাছে মোকাদ্দামা পেশ করল। কারণ সে জানত, ওমর (রা.) কাফেরদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর, তাই হয়তো তিনি মুসলমান হিসেবে বিশরের পক্ষে রায় দেবেন।
অতঃপর যখন ইহুদি বলল, এ মামলার ফয়সালা মুহাম্মদ (সা.) করেছেন; কিন্তু বিশরের তা পছন্দ হয়নি, তাই আপনার কাছে ফের মামলা দায়ের করেছে।
ওমর (রা.) বিশরকে জিজ্ঞেস করলেন, ঘটনাটি কি তাই? সে স্বীকার করল। ওমর (রা.) বললেন, তাহলে এখানে অপেক্ষা করো, আমি এখনই আসছি। এ কথা বলে তিনি নিজের ঘরে প্রবেশ করে একটি তলোয়ার নিয়ে এলেন এবং বিশরকে উদ্দেশ করে বললেন, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ফয়সালা মানে না তার ফয়সালা এই তলোয়ার। (রুহুল মাআনি)।
 
লেখক : খতিব, মাসজিদুল কোরআন জামে মসজিদ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা