আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

চুল প্রতিস্থাপনের বিধান

মুফতি মাহফুজুর রহমান তানিম
| ইসলাম ও সমাজ

ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় এসেছে, ‘মহিলাদের জন্য মানুষের চুল ব্যতীত অন্য কোনো পশুর পশম তার খোঁপায় লাগানোতে কোনো সমস্যা নেই।’ (১/৩৫৮)। প্রকাশ থাকে যে, কৃত্রিম চুল লাগালে তখনই জায়েজ হবে যখন তা শুধুই সৌন্দর্যচর্চা পর্যন্ত সীমিত থাকবে। কিন্তু এ ধরনের চুল ব্যবহার করার দ্বারা যদি প্রতারণা উদ্দেশ্য থাকে তাহলে তা নাজায়েজ হবে। (রদ্দুল মুহতার : ৬/৩৭২, বজলুল মাজহুদ : ১৭/৫৮)

যানবাহনে বা রাস্তার পাশের বিলবোর্ডে সবার চোখে পড়ে টাক সমাধানের বিজ্ঞাপনে। টাক সমাধান পদ্ধতির মধ্যে নন-সার্জিক্যাল প্রতিস্থাপন পদ্ধতি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। এর প্রক্রিয়া হলো, মাথায় যতুটুকু অংশ চুল পড়ে ফাঁকা হয়ে গেছে, পলি পেপারের মাধ্যমে এর একটা মাপ নেওয়া হয়। যার আরেক নাম Tamplate। এই Tamplate নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে পাতলা এক ধরনের মেমব্রেইন/টিস্যুর ওপর চুল বুনন করে পরিপূর্ণ একটি হেয়ার পিচ তৈরি করা হয়। এ হেয়ার পিচ ক্লিপ বা গ্লু পদ্ধতিতে মাথায় লাগিয়ে দেওয়া হয়।
ফিকহের দৃষ্টিকোণে চুল প্রতিস্থাপনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক, মানুষের চুল প্রতিস্থাপন। দুই, শূকরের পশম ব্যতীত অন্য পশুর পশম বা কৃত্রিম চুল প্রতিস্থাপন।

মানুষের চুল প্রতিস্থাপনের বিধান
মানুষের চুল প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ, হাদিসের একাধিক স্থানে পরচুলা লাগানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। বোখারি শরিফের বর্ণনায় এসেছে, ‘ইবন আবু শাইবাহ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা অভিসম্পাত করেন সে সব নারীকে যারা নিজে পরচুলা লাগায় এবং যারা অন্যদের তা লাগিয়ে দেয়, আর যারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে উল্কি আঁকে এবং অন্যকে এঁকে দেয়।’ (বোখারি : ৫৯৩৩)। রাসুল (সা.) নিজেও এ লোকদের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন। ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘পরচুলা লাগিয়ে দেওয়ার পেশাধারী নারী, যে নিজের মাথায় পরচুলা লাগায়, উল্কি অঙ্কনকারী নারী এবং যে অঙ্কন করেÑ আল্লাহর নবী তাদের অভিসম্পাত করেছেন।’ (বোখারি : ৫৯৪০)।

পরচুলার ব্যবহার প্রতারণা
হাদিসে পরচুলার ব্যবহারকে ইহুদিদের রীতি ও প্রতারণার শামিল হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ‘হুমাইদ ইবন আবদুর রহমান ইবন আওফ (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি মুয়াবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান (রা.) কে বলতে শুনেছেন যে, তার হজ পালনের বছর মিম্বরে নববিতে উপবিষ্ট অবস্থায় তার দেহরক্ষীদের কাছ থেকে মহিলাদের একগুচ্ছ চুল নিজ হাতে নিয়ে তিনি বলেন, হে মদিনাবাসী! কোথায় তোমাদের আলেম সমাজ? আমি রাসুল (সা.) কে এরকম পরচুলা ব্যবহার করতে নিষেধ করতে শুনেছি। রাসুল (সা.) বলেছেন, বনি ইসরাইল তখনই ধ্বংস হয়েছে, যখন তাদের নারীরা এরূপ পরচুলা ব্যবহার করতে শুরু করে।’ (বোখারি : ৩৪৬৮; মুসলিম : ৫৪৭১)। অন্য বর্ণনায় আছে, ‘এ কারণে বনি ইসরাইল সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে।’ (মুসলিম : ৫৪৭২)।
গ্রহণযোগ্য ফাতাওয়া-সংকলন রাদ্দুল মুহতারে এসেছে, ‘কারও জন্য চুল সংযোজন করা জায়েজ নেই, চাই তা নিজের চুল হোক বা অন্যের।’ (৯/৬১৫)।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এ চুল লাগিয়ে যদি অজু-গোসল করে এবং পানি যদি ভেতরে প্রবেশ না করে তাহলে তার অজু-গোসল হবে না। ফলে এর দ্বারা আদায়কৃত নামাজও হবে না।

কৃত্রিম চুল প্রতিস্থাপন
পরচুলা যদি কোনো মানুষের চুল না হয়ে শূকর ব্যতীত অন্য কোনো পশুর হয় অথবা কৃত্রিম চুল হয় তাহলে তা ব্যবহার করা অবৈধ নয়। সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, পশম দিয়ে তৈরি পরচুলা ব্যবহার করতে সমস্যা নেই। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ২৫৭৪৩)।
সুনানে আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, হজরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘করমাল’ ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই। (প্রাগুক্ত : ৪১৬৮)। ‘করমাল’ আরবি শব্দ। অর্থ হলো, রেশম বা পশমের সুতা দিয়ে তৈরি কেশগুচ্ছ যা মহিলারা চুলের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যবহার করে।
ফতোওয়ায়ে হিন্দিয়ায় এসেছে, ‘মহিলাদের জন্য মানুষের চুল ব্যতীত অন্য কোনো পশুর পশম তার খোঁপায় লাগানোতে কোনো সমস্যা নেই।’ (১/৩৫৮)। প্রকাশ থাকে যে, কৃত্রিম চুল লাগালে তখনই জায়েজ হবে যখন তা শুধুই সৌন্দর্যচর্চা পর্যন্ত সীমিত থাকবে। কিন্তু এ ধরনের চুল ব্যবহার করার দ্বারা যদি প্রতারণা উদ্দেশ্য থাকে তাহলে তা নাজায়েজ হবে। (রদ্দুল মুহতার : ৬/৩৭২, বজলুল মাজহুদ : ১৭/৫৮)।
কিন্তু একজন মুসলমানের মনে রাখা উচিত, আল্লাহর কাছে বাহ্যিক সৌন্দর্যের তুলনায় অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের মূল্য অনেক বেশি। আল্লাহর কাছে সেই বেশি মূল্যবান যার অন্তর যত পবিত্র, যার অভ্যন্তরীণ গুণগুলো যত উত্তম এবং যার আমল যত উন্নত।
অতএব নারী-পুরুষ সবার অভ্যন্তরীণ আমল সুন্দর করতে সচেষ্ট হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা না তোমাদের দেহের দিকে তাকান, না তোমাদের আকৃতির দিকে, বরং তিনি তোমাদের অন্তরের দিকে তাকান।’ (মুসলিম : ২৫৬৪)।