আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

চুলে ভাগ্য তাজা

মনিরুজ্জামান রিপন, শেরপুর
| সুসংবাদ প্রতিদিন
আঁচড়ানোর সময় নারীদের মাথা থেকে ঝরে পড়া চুল প্রক্রিয়া করে ভাগ্য বদল করেছেন শেরপুর জেলা সদরের তিন ইউনিয়নের ১০ গ্রামের ১০ হাজারের অধিক নারী। ওইসব গ্রামের বেকার, বিধবা. বৃদ্ধা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীরা তাদের সংসার ও লেখাপড়ার ফাঁকে এসব চুল প্রক্রিয়ার কাজ করে বাড়তি আয় করছেন। অনেকে ভাঙা ঘরবাড়ি থেকে পাকা ঘরবাড়ি গড়ে তুলেছেন। সরেজমিন জানা যায়, শেরপুর সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত বাদা তেঘুরিয়া গ্রামের কালু মিয়া একসময় ঢাকার উত্তরায় একটি হেয়ার ক্যাপ কোম্পানিতে কাজ করতেন। ২০০৭ সালে তিনি বাড়ি ফিরে এসে পরিকল্পনা করেন নিজেই গ্রামগঞ্জ ও শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়ির মহিলাদের কাছ থেকে ঝরে পড়া মাথার চুল সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়া করে ঢাকায় ওই হেয়ার ক্যাপ এবং চায়না বায়ারের কাছে বিক্রি করবেন। কথামতো কাজ, প্রথমে গ্রামের কয়েকজন বেকার যুবককে উদ্বুদ্ধ করে তাদের হরেক মাল (সংসারের বিভিন্ন সরঞ্জামাদি, শিশুদের প্লাস্টিকের বিভিন্ন খেলনা) দিয়ে পাঠানো হয় শহর-বন্দর-গ্রামে। তারা সাইকেলে করে হরেক মাল সাজিয়ে বিভিন্ন বাসাবাড়ির মহিলাদের কাছ থেকে ওই হরেক মালের বিনিময়ে সংগ্রহ করেন আঁচড়ানোর সময় ঝরে পড়া মাথার চুল। এরপর তারা গ্রামের ওই মহাজনের কাছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। মহাজন বা ব্যবসায়ীরা সে চুল কিনে নিয়ে গ্রামের বেকার, বিধবা বৃদ্ধা এবং দরিদ্র পরিবারের বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের দিয়ে প্রথমে ওই চুল বাছাই করেন। এরপর শেম্পু দিয়ে ওয়াশ করে এবং সর্বশেষ বিভিন্ন সাইজের চুলের আলাদা মুঠি বা গোছা করেন। পরবর্তী সময় তা ঢাকায় চায়না বায়ারের কাছে গিয়ে সরাসরি ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। তবে লম্বা চুলের কদর বেশি। সেগুলো ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। এদিকে কালুর দেখাদেখি দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে আরও অনেক বেকার যুবক এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ১০ বছরের ব্যবধানে ওই গ্রামের পাশাপাশি সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের বাদা তেঘুরিয়া, চৈতনখিলা, গাংপাড়, তারাগড়, বালুয়াকান্দা, ভাটিয়াপাড়া, গাজির খামার ইউনিয়নের পলাশিয়া, ধলা ইউনিয়নের পাঞ্জরভাঙ্গা ও গির্দাপাড়াসহ ১০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার নারী চুল প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হয়ে বাড়তি আয় করছেন, নিজেদের পোশাক কিনছেন, আবার কেউবা নিজেদের পড়াশোনার খরচ মেটাচ্ছেন। তবে বয়স্ক নারীরা বিশেষ করে বিধবা মহিলারা তাদের নিজেদের ওষুধপত্র এবং সাংসারিক নানান কাজে ওই আয়ের টাকা খরচ করছেন । হকার বা হরেক মালের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জট লাগানো চুলগুলো প্রথমে জট ছাড়ানো হয়। পরে তা বিশেষ কায়দায় সোজা করে সেগুলো মুঠি করা হয়। এ কাজগুলো করে এসব গ্রামের বেকার, দরিদ্র কিছু শিক্ষার্থী এবং বিধবা বয়স্ক নারীরা। সারাদিন সর্বচ্চো ১০০ গ্রাম পর্যন্ত চুল বাছাই করতে পারে একজন শ্রমিক। সে হিসাবে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয় প্রতি শ্রমিককে। কেউ বা আবার রাতের বেলায় কাজ করে মাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকাও আয় করেন। সদর ইউনিয়নের তারাগড় গ্রামের হামিদ খন্দকার জানান, তিনি আগে অটো চালাতেন। এখন চুল প্রক্রিয়া করেন। এ কাজের আয় দিয়ে বাড়িতে বিল্ডিং করছেন। শতাধিক নারী শ্রমিক তার এখানে চুল বাছাইয়ের কাজ করেন। বিধবা খুকি বেওয়া বলেন, ‘চুলের কাজ করি বলে বুড়া বয়সেও পুলাপানের মুহের দিহে (মুখের দিকে) চাইয়া থাহন নাগে না। নিজের ওষুদ নিজেই কিনি।’ গৃহিণী সমলা, রিতা, রিপা, ইতি, জোসনা বলেন, ‘বাইত বইয়া (বাড়িতে বসে) সামান্য আয় হইলেও ভালো আছি। স্বামী সংসারে সাহায্য করবার পাইতাছি।’ এইচএসসিতে পড়–য়া শিক্ষার্থী উম্মে তামান্না জোনাকি জানায়, এ কাজ করে তারা যে আয় করছেন তাতে একদিকে বাবাকে সাহযোগিতা করছে অন্যদিকে নিজেদের জামা-কাপড় ও পড়াশোনার খরচও চালাচ্ছেন।