আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সংসদ নির্বাচন

ধোঁয়াশার আবর্তে বিএনপির তৃণমূল

খালেদার মুক্তি, জাতীয় ঐক্য, আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে অনিশ্চয়তা-উৎকণ্ঠা

রকীবুল হক
| প্রথম পাতা
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে চরম ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের দাবি পূরণ, যথাসময়ে অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি নাÑ এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মাঝে। এছাড়া সম্প্রতি যে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া চলছে তার ভবিষ্যৎ কী? এ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক কোথায় দাঁড়াবে? বর্তমানে যেভাবে নেতাকর্মীদের নামে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বেড়েছে, এ পরিস্থিতিতে আন্দোলনে নামা কতটুকু সম্ভব ও সফল হবে? এসব নিয়েও অনিশ্চয়তা-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, সব ধোঁয়াশাই সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনের আগে সরকারই বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি ও ইস্যু তৈরি করছে। যেমন বিএনপি যে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া করছে, সেটা নিয়ে সরকার বিতর্ক করছে। জাতীয় ঐক্য তো আওয়ামী লীগকে নিয়েও হতে পারে, যদি তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় আদর্শ-অনাদর্শ মিলিয়ে জোট হয়। আওয়ামী লীগও বিতর্কিতদের নিয়ে জোট করেছে। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য জামায়াতকে নিয়েও আন্দোলন করেছে। অথচ এখন তারা বিএনপির জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক ছড়াচ্ছে। আসলে বর্তমানে যেসব কথা বলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। দেশে বর্তমানে যেসব সমস্যা রয়েছে তা বড় কোনো সমস্যা নয় এবং সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিলেই সমাধান হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের দ-প্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ প্রায় আট মাস ধরে কারাবন্দি জীবনযাপন করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার মুক্তির জন্য আইনি প্রক্রিয়াসহ বিএনপির পক্ষ থেকে রাজপথে নানা কর্মসূচি পালন করা হলেও তাতে কোনো সফলতা আসেনি। ৩৫ মামলার মধ্যে ৩৩টিতে জামিন হলেও বাকি দুটিতে জামিন আটকে থাকায় তার মুক্তি হচ্ছে না বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন। আগামী নির্বাচনের আগে আদৌ তার মুক্তি মিলবে কি না, তা নিয়ে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তায় আছেন নেতাকর্মীরা। খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, নাকি তার মুক্তি ছাড়া এবারও নির্বাচন বর্জন করবেÑ এ নিয়েও অনেকটা সিদ্ধান্তহীনতায় আছে দলটি। এ প্রসঙ্গে বিএনপির আইনজীবী শহীদুল ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে আমরাও ধোঁয়াশার মধ্যে আছি। ন্যায়বিচার হলে অনেক আগেই তার জামিন হওয়ার কথা। কিন্তু সরকার চায় না যে খালেদা জিয়া এরপর পৃষ্ঠা ২ কলাম ৭ ষ রাজনীতির মুক্তি পেয়ে নির্বাচন করুক। তাকে কারাগারে রেখেই তারা নির্বাচন করতে চায়। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়ায় শুধু বিএনপি নেতাকর্মীরা নয়, সারা দেশের সাধারণ জনগণ এমনকি আওয়ামী লীগেরও অনেকে উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত। কারণ বর্তমানে খালেদা জিয়া যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন, ক্ষমতার পরিবর্তন হলে আওয়ামী লীগ নেতাদেরও একই পরিণতি হতে পারে। এদিকে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সরকারবিরোধী দলগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। এ নিয়ে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট এবং ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপি অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার একটি নাগরিক সমাবেশে সংশ্লিষ্ট সব দলের নেতারা হাতে হাত রেখে ঐক্য গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। তবে বি. চৌধুরীর পক্ষ থেকে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার শর্ত দেওয়ায় এ ঐক্য প্রক্রিয়ায় বেশ জটিলতা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া জাতীয় ঐক্য আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সরকার গঠন বিষয়েও শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা এবং আদৌ জাতীয় ঐক্য হবে কিনা তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপি জোটের নেতাকর্মীরা। সূত্র মতে, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির একটি টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে থাকা না থাকা প্রশ্নে আছে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। এমনি পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিএনপির শীর্ষনেতারা। এর আগে বুধবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেন, জাতীয় ঐক্য নিয়ে আমরা এখনও পরিষ্কার না। যেভাবে শর্ত দেওয়া হচ্ছে, তাতে আসলেও এ ঐক্য হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। তাছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব কিনা, নির্বাচনে গেলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হবে হবে কিনাÑ এসব বিষয় নিয়েও সবাই চিন্তিত। এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তফসিলের আগেই সংসদ ভেঙে দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামার কথা জানিয়ে আসছেন বিএনপি নেতারা। তবে এ আন্দোলন কবে, কীভাবে হবে তার সুস্পষ্ট কোনো পথনির্দেশনা ঠিক করতে পারেনি দলটি। তাছাড়া বর্তমানে সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ব্যাপক বেড়েছে। তাই আন্দোলন এবং এর সফলতা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে দলীয় নেতাকর্মীদের ১ অক্টোবর থেকেই আন্দোলনের জন্য ‘রেডি’ হয়ে যেতে বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, এবার আর খালি মাঠে গোল দিতে দেব না। জনগণকে নিয়ে থাকব, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আগামী নির্বাচনে অংশ নেব এবং শান্তিপূর্ণভাবে ভোটের মাধ্যমে সরকারকে অপসারণ করব। কোনো সহিংসতার মাধ্যমে নয়। বৃহস্পতিবার একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে মওদুদ আহমদ বলেন, ১ অক্টোবর থেকে আমাদের কর্মসূচি শুরু হবে। তাই সবাইকে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে হবে। আন্দোলন সফল হলে তারপর নির্বাচন হবে। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, রাজপথে নেমে কর্মসূচি সফল করতে হবে।