আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বেড়ায় যখন খেত খায়

মো. মাঈন উদ্দিন
| সম্পাদকীয়

রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের আড়তে থরে থরে সাজানো চাল-আটার বস্তা। সেগুলোয় লেখাÑ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। খাদ্য অধিদপ্তর। নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় মেশিনে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে উৎপাদিত।’ প্রশ্ন হলো, সরকারিভাবে উৎপাদিত এসব চাল-আটা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির জন্য কৃষি মার্কেটে গেল কীভাবে? র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত রোববার সেই মার্কেটে অভিযান চালিয়ে ১২টি আড়তে মজুত করে রাখা ১০০ টন চাল-আটা জব্দ করেছেন। অনেকের ধারণা, ওই চাল ও আটা তেজগাঁওয়ের সিএসডির সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে হাতবদল হয়ে কৃষি মার্কেটে অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে। এর আগে গেল শনিবার মধ্যরাতে তেজগাঁও খাদ্যগুদাম থেকে পাচার হওয়া আরও ১১৫ টন চাল-গম-আটাবাহী আটটি ট্রাক জব্দ করেছে র‌্যাব। 
একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে খোলাবাজারে বিক্রির জন্য (ওএমএস) রাখা এ চাল-আটা বাইরে পাচার করে দিচ্ছিল। জানা যায়, এর সঙ্গে সিএসডির ম্যানেজার হুমায়ুন কবীরসহ ৪০ থেকে ৪৫ জনের একটি চক্র জড়িত বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। সঙ্গে আছেন কয়েকজন বড় আড়তদার, ঠিকাদার ও শ্রমিক নেতা। সরকারি চাল-গম গায়েব করার মধ্য দিয়ে তাদের অনেকে অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। 
এ ব্যাপারে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বয়ান এ রকমÑ প্রতিদিন ঢাকায় ১৪১টি পৃথক স্পটে ১৪১ টন চাল ও ২৮২ টন আটা স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রি করার কথা। তবে সিএসডির একটি অসাধু চক্র দিনের ২০০ টনের বেশি চাল-আটা কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ব্যাপারে তদন্ত করতে দুদকের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। শনিবার রাতে সিএসডি থেকে আট ট্রাক ভর্তি করে চাল ও আটা গায়েব করার জন্য অন্যত্র নেওয়া হয়। এতে ১১৫ টন পণ্য ছিল। এসবের গন্তব্য ছিল চুাডাঙ্গা, শ্রীমঙ্গল ও মাওনা। রোববার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটে অভিযান চালিয়ে আরও ১০০ টন চাল ও আটা জব্দ করা হয়।
এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে নিঃসন্দেহে জড়িত আছে রাঘব-বোয়ালরা। কারণ ১১টি আড়তে মজুত করে রাখা হয়েছিল ওএমএসের চাল-আটা। যারা এসব চাল বিক্রি করেছে কিংবা যেসব আড়তদার এসব সরকারি পণ্য কিনেছেন তারা এতটাই বেপরোয়া যে, সরকারি চাল-আটার প্যাকেট পরিবর্তন করেননি। তাদের মধ্যে রাহমানিয়া রাইস এজেন্সিতে অভিযান চালিয়ে ৫০ কেজি ওজনের ৪৭ বস্তা সরকারি চাল, কর্ণফুলী রাইস এজেন্সিতে ৭৫ বস্তা, এশিয়ান ট্রেডার্সে ৮০ বস্তা, বন্ধু রাইস এজেন্সিতে ৫৭৯ বস্তা ও জামি ট্রেডার্সে ৩০০ বস্তা চাল এবং জননী ট্রেডার্সে ৮৫ বস্তা, সুগন্ধা রাইস ট্রেডার্স-২-এ ৭৫ বস্তা, সুগন্ধা রাইস ট্রেডার্স-১-এ ৭০ বস্তা, মহানগর ট্রেডার্সে ১২ বস্তা ও সূর্য এন্টারপ্রাইজে ৫৮ বস্তা সরকারি আটা পাওয়া যায়। তবে এসব দোকানের সব মালিক গা ঢাকা দিয়েছেন। এসব পণ্য জব্দ করেছে র‌্যাব।
স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে চাল বিক্রি করতে সরকার ৩৯ টাকা কেজিতে কিনে ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রি করে ২৮ টাকা ধরে। আর ৩২ টাকা কেজি দরে আটা কিনে ১৬ টাকায় বিক্রি করছে। ভর্তুকি দিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে চাল-আটা বিক্রির এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সিএসডির একটি চক্র ওএমএসের এসব পণ্যের অধিকাংশ কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে কারা জড়িত এই তথ্য এরই মধ্যে গোয়েন্দারা পেয়েছেন। প্রতিদিন রাজধানীর ১৪১ টন চাল ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রি করার কথা থাকলেও ১০০ টনের মতো কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। প্রতি কেজি চাল ৪০ থেকে ৪৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। প্রতি টন চাল ও গম থেকে ১ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন সিএসডির ম্যানেজার হুমায়ুন। আর ৫০০ টাকা অন্যদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। এ হিসাবে প্রতিদিন কালোবাজারিরা অবৈধভাবে আয় করছে ৩ লাখ টাকা, মাসে ৯০ লাখ। এছাড়া আরেকটি অভিনব উপায়ে তারা অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সেটা হলো, ওএমএসের চাল-গম স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে বিক্রি না করে একটি চক্র সিএসডির ভেতরেই কম দরে কিনে থাকেন। এরপর তারা সে পণ্য বাইরে বেশি দরে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকার মালিক হচ্ছেন। 
এখন সাধারণ জনগণের প্রশ্ন হলো, খেতে বেড়া দেওয়া হয় খেতের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু বেড়া নিজেই যখন খেত খায়, তখন গৃহস্থের কপাল চাপড়ানো ছাড়া উপায় কী? সরকার ভর্তুকি দিয়ে হতদরিদ্রদের জন্য চাল বিতরণের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু রক্ষকরাই ভক্ষক হলে এ দেশের সার্বিক উন্নয়ন যে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। ইতিহাস বলে যুগে যুগে ধনীরা দরিদ্রের হক মেরে আরও ধনী হতে চায়। তাই হয়তো কবি বলেছেনÑ এ জগতে হায় সেই বেশি চায় যার আছে ভূরি ভূরি; রাজার হস্ত করে কাঙালের সমস্ত ধন চুরি। কিন্তু আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা, এখনই এসব রাঘব-বোয়ালের চোয়াল টেনে ধরার সময়। 

প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রেজিস্ট্রার দপ্তর 
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
[email protected]