আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাড়ছে সামাজিক বৈষম্য

আরকে চৌধুরী
| সম্পাদকীয়
বাংলাদেশে অতিধনীর সংখ্যা বাড়ছে অতি দ্রুত হারে এবং এদিক থেকে বিশ্বে আমাদের দেশই প্রথম। অতিধনী তাদের বিবেচনা করা হয়, যাদের সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ডলার বা বাংলাদেশের আড়াইশ কোটি টাকার চেয়ে বেশি। লন্ডনভিত্তিক আর্থিক জরিপ প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলথ এক্স’ গেল সপ্তাহে এ অতিধনীদের ওপর সর্বশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, বিশ্বে অতিধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। সে দেশে ‘অতিধনী’র সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। দ্বিতীয় স্থানে জাপান। তাদের অতিধনীর সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। আর প্রায় ১৭ হাজার অতিধনী নিয়ে চীন তৃতীয় স্থানে। তালিকায় প্রথম ১০ দেশের মধ্যে আরও আছে জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স, হংকং, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও ইটালি। অতিধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে যেসব দেশে, সে তালিকায় বাংলাদেশ সবার উপরে। ওয়েলথ এক্সের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে অতিধনীর সংখ্যা বাড়ছে। দ্বিতীয় স্থানে আছে চীন। সেখানে অতিধনীর সংখ্যা বাড়ছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। এরপর আছে যথাক্রমে ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং ও আয়ারল্যান্ড। বাংলাদেশে অতিধনীর সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে। এটি অর্থনৈতিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র যেমন তুলে ধরেছে, তেমনি এ সমৃদ্ধির চিত্রের অন্য পিঠে রয়েছে উদ্বেগের ঘটনা। এ প্রসঙ্গে কলামিস্ট আলী রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের এ অতি ধনিকশ্রেণির বিকাশের আরও কিছু লক্ষণ আমাদের সবার জানা। বাংলাদেশ এ ধরনের আরও কিছু সূচকেও শীর্ষস্থান অধিকারের কৃতিত্বের দাবিদার। যেমন অর্থ পাচারের ক্ষেত্রেও স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল বাংলাদেশ। এ তথ্য ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটি’র (জিএফআই) ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে ছিল। মে ২০১৭-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। ১০ বছরে তার পরিমাণ ছিল সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। ২০১৭ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ১৭ হাজার সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। ২০১৬ সাল শেষে এর পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার সুইস ফ্রাঁ বা ৫ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। এক বছরে সামান্য হ্রাস সত্ত্বেও এর পরিমাণ যে কত বড়, তা ভারতীয়দের সঞ্চিত অর্থের সঙ্গে তুলনা করলেই খানিকটা ধারণা পাওয়া যাবে। ২০১৬ সালে ভারতীয়দের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ৪৮ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা প্রায় বাংলাদেশিদের সঞ্চিত অর্থের সমান। মালয়েশিয়া সরকারের ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির আওতায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশি সে দেশে তাদের আবাস কেনার অনুমতি পেয়েছেন। তাদের সূত্রে, জনপ্রতি খরচ ১২ কোটি টাকা হিসাবে প্রায় ৪২ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা অবৈধপথে মালয়েশিয়ায় চলে গেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়Ñ চীন ও জাপানের পরে। অতিধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বিবিসিকে বলেন, ‘এই তথ্য থেকে আমি মোটেও অবাক হইনি। কারণ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে যে একটা গোষ্ঠীর হাতে এ ধরনের সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা আসলে দেখাই যাচ্ছে। এ সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া তো একদিনে তৈরি হয়নি। এটা কয়েক দশক ধরেই হয়েছে। এখন এটি আরও দ্রুততর হচ্ছে।’ এ ধরনের অস্বাভাবিক হারে সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতির কোনো ভূমিকা আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এশিয়া বা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেটা হয়, যাদের হাতে সম্পদ আসে, সেটার পেছনে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের একটা বড় ভূমিকা থাকে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য যারা পান, বা যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যোগাযোগ থাকে, প্রাথমিকভাবে তারাই সম্পদের মালিক হন।’ (বিবিসি বাংলা, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮)। ফাহমিদা খাতুনের এ বক্তব্যের পক্ষে যথেষ্ট উপাত্ত হাজির করা যায়। সেই সূত্র ধরেই আমরা বাংলাদেশের দিকে তাকাতে পারি। বাংলাদেশে যেটা সহজেই দৃশ্যমান, তা হচ্ছে সেসব খাত থেকেই এ ধরনের অর্থের সঞ্চয় ঘটানো সক্ষম হচ্ছে, যেখানে একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের সুবিধা নিতে পারছে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে অবকাঠামো খাত। গেল বছরগুলোতে সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ ক্রমবর্ধমান, যদিও কাজের অগ্রগতির হার সীমিত। সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে দেখা যায় যে, একটি প্রকল্পে ছয় বছরে কাজ হয়েছে ২০ শতাংশ; কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। (ডেইলি স্টার, ২৬ আগস্ট ২০১৮)। বাংলাদেশ গেল এক দশকে দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে গেলেও তার সুফল নিচের পর্যায়ে তত দ্রুত হারে পৌঁছাচ্ছে না। ধনীরা আরও বেশি ধনী হয়ে ওঠায় গরিবের সঙ্গে তাদের পার্থক্য বাড়ছে। ওয়েলথ এক্সের সমীক্ষায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের খুশি হওয়ার কিছু না থাকলেও খুশি হওয়ার উপাদান রয়েছে মঙ্গলবার প্রকাশিত জাতিসংঘের আরেক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে তিন বছর ধরে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশে কমছে। ক্ষুধামুক্তির লড়াইয়ে বাংলাদেশের সাফল্য যে ঈর্ষণীয়, তা আবারও প্রমাণিত হলো জাতিসংঘের প্রতিবেদনে। দেশের অতিধনীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি সামাজিক বৈষম্যের বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। উন্নয়নের সুফল সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমানো সরকারের লক্ষ্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক