আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

১ অক্টোবর ওফাত দিবস

শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে শায়খ সায়্যিদ মানযূর আহমাদ (রহ.) ও নেদায়ে ইসলামের অবদান

প্রফেসর ড. এম শমশের আলী
| তাসাউফ
সমাজকে আলোকিত করতে আলোর প্রয়োজন। জ্ঞানের আলো। জ্ঞানহীন সমাজে অজ্ঞতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যায় সভ্যতার অসীম সম্ভাবনা। ইতিহাস যাকে জাহেলিয়াত নামে চিহ্নিত করেছে। তাই মানবাত্মার বিকাশ তখনই উৎকর্ষ স্পর্শ করেছে, যখন সমাজ ধন্য হয়েছে প্রজ্ঞাবান আলোকিত মানুষের পদচারণায়। আলোকিত মানুষের মিছিলে যেসব প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব চির স্মরণীয়, তাদের মধ্যে শায়খ মানযূর আহমাদ (রহ.) এক বিরল জ্যোতির্ময় সত্তা। আল্লাহ প্রদত্ত বহুমাত্রিক প্রতিভার মানসছবি আল্লামা শায়খ সায়্যিদ মানযূর আহমাদ (রহ.) ছিলেন আধ্যাত্মিক ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাচেতনার সমন্বিত দীপাধার। ফলে পশ্চাৎপদ সমাজের সমস্যাগুলো তিনি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন নিপুণ দক্ষতায়। সুশিক্ষাই যে পারে একটি জ্ঞানভিত্তিক আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে মুখ্য ভূমিকা রাখতে, সেটা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। পরশমণিতুল্য বাবার পরশে সৃষ্টির সেবার মহান আদর্শ ধারণ করে, নেদায়ে ইসলাম নামক সেবা সংস্থার মাধ্যমে শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে তার অবদান কালোত্তীর্ণ এক অনন্য উদাহরণ। আল্লামা শায়খ সায়্যিদ মানযূর আহমাদ (রহ.) এর বাবা যুগশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক ইমামুত তরিকত আল্লামা শায়খ সায়্যিদ মুহাম্মাদ বোরহানুদ্দীন উয়াইসী (রহ.) ১৯৪৯ সালে ‘নেদায়ে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করে এর আওতাধীন মাদ্রাসা, এতিমখানা, কারিগরি শিক্ষালয়, দাতব্য হাসপাতালসহ প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নেদায়ে ইসলাম তাই একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; বরং বহু প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি। যেন বটবৃক্ষের মতো বহুমুখী সেবা কার্যক্রমের এক বিশাল আয়োজন। ১৯৬৪ সালের ৯ মে, ইমামুত তরিকত (রহ.) এর ইন্তেকালের পর নেদায়ে ইসলামের চেয়ারম্যান হিসেবে হাল ধরেন আল্লামা শায়খ মানযূর আহমাদ (রহ.)। নেদায়ে ইসলামের মাধ্যমে বাবার বৈপ্লবিক ইতিহাসের মর্মদীক্ষাকে মননে লালন করে তিনি জন্ম দিলেন ইতিহাস-উত্তর মহাইতিহাস। তার এ অর্জনের মর্মপাঠ করতে হলে পাঠ করতে হবে তার পরিবেশ ও সমকাল। তিনি যখন নেদায়ে ইসলাম নামক একটি সংস্থার দায়িত্ব পান, তখন তার বয়স মাত্র ২১ বছর। তখনও তিনি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। সেই সঙ্গে আছে পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে দায়িত্ব ও বাবার আধ্যাত্মিক সিলসিলার দায়িত্ব। এ রকম বহুমাত্রিক বিশাল দায়িত্বের চাপে যখন স্তিমিত হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক, তখনই মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৬৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা মহানগরীর প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। নেদায়ে ইসলামের ২১তম প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই ঐতিহাসিক কলেজের নামকরণ করা হয় শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ। ছাত্রজীবনেই এরকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদাহরণ সত্যিই বিরল। আরও অবাক করা বিস্ময়, কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে তার আদর্শিক চেতনার দিকে অবলোকন করলে জানতে পারা যায়, আলীগড় আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তার দর্শন ছিল পশ্চাৎপদ মুসলিম জাতির অবনতির মূল কারণ নির্ণয়। সেটা হচ্ছে, জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় মুসলমানদের পিছিয়ে পড়া। তাই আবারও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার দিকে ফিরিয়ে নিতেই তিনি এ কলেজ প্রতিষ্ঠাকে প্রাসঙ্গিক মনে করেছেন। ছাত্র বয়সেই কত নিখুঁত ছিল তার ভাবনা। কত পরিপূর্ণ ও পরিপক্ব ছিল তার চিন্তার জগৎ! নেদায়ে ইসলাম যার বাংলা অর্থ ইসলামের ডাক। শান্তির ডাক। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধানের নাম। ফলে ইসলামের পথে যেই আহ্বান সেটাও তো পরিপূর্ণ আহ্বান হবে। ইসলাম এসেছে মানবমুক্তির মহাসনদ নিয়ে। ইসলামের সেই কল্যাণধর্মী শিক্ষার সুন্দর ও সার্থক চর্চার আয়োজন আমরা নেদায়ে ইসলামের প্রতিটি কর্মকা-ে দেখতে পাই। সৃষ্টির সেবাই স্রষ্টার সেবাÑ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মানুষ, প্রকৃতি তথা সৃষ্টিকে সেবার মহাব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এ সেবা সংস্থাটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন আল্লামা শায়খ সায়্যিদ মানযূর আহমাদ (রহ.) আরও যেসব জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বান্তবায়ন করেন তার মধ্যে ১৯৯২ সালে নারী শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবনে প্রতিষ্ঠা করেন নেদায়ে ইসলাম মহিলা ফাজিল (বিএ) মাদ্রাসা, উচ্চতর গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন নেদায়ে ইসলাম রিসার্চ সেন্টার, এছাড়া সুস্থ ও ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ ও অপসংস্কৃতি রোধে নেদায়ে ইসলাম কালচারাল ফোরাম, নেদায়ে ইসলাম শিশু-কিশোর সেনা, নেদায়ে ইসলাম স্পোর্টস ফেডারেশন, নেদায়ে ইসলাম আশিক্ব শিল্পীগোষ্ঠী, আলেম সমাজকে সঠিকভাবে দায়িত ¡সচেতন করে তুলতে নেদায়ে ইসলাম আলেম সমাজ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবায় ফ্রি ফ্রাইডে-মানডে ক্লিনিক, জাতীয় দুর্যোগে ত্রাণ সহায়তা ও স্বেচ্ছাসেবার জন্য নেদায়ে ইসলাম ভলান্টিয়ার্স কোর্স, বেকারত্ব মোচন ও দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী যুবকদের জন্য নেদায়ে ইসলাম কম্পিউটার ও কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন, নেদায়ে ইসলাম যুবা, বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমসহ ইত্যাদি বহুমাত্রিক সেবা কার্যক্রমের সূচনা ও বাস্তবায়ন করেন, যা এক মহাবিপ্লব। তিনি ইমামুত তরিকত আল্লামা শায়খ সায়্যিদ মুহাম্মাদ বোরহানুদ্দীন উয়াইসী (রহ.) এর অসম্পূর্ণ কাজগুলোর বাস্তবায়নে আমরণ নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। আমরা দেখতে পাই ইমামুত তরিকত (রহ.) প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো শায়খ মানযূর আহমাদ (রহ.) দায়িত্বকালীন উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় মাইলফলক রচনা করেন। যেমনÑ উয়াইসীয়া আলিয়া মাদ্রাসা ১৯৫৯ সালে ফাজিল স্বীকৃতি লাভ করে এবং যা শায়খ মানযূর আহমাদ (রহ.) পরবর্তী সময়ে কামিল পর্যন্ত উত্তীর্ণ করে হাদিস ও ফিকহ বিভাগ চালু করেন। এ মাদ্রাসার অনেক কৃতী শিক্ষার্থী আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। অনেক শিক্ষার্থী মেধাবৃত্তি লাভ করে মিশর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়সহ আন্তর্জাতিক বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত। ইমামুত তরিকত (রহ.) প্রতিষ্ঠিত পির প্রফেসর আবদুল খালেক (রহ.) মেমোরিয়াল লাইব্রেরিতে মিশর, বৈরুত ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রন্থ সংগ্রহ করে লাইব্রেরিটিকে আন্তর্জাতিক মানের গ্রন্থশালায় পরিণত করেন, যা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার নবদিগন্ত উন্মোচন করে। তিনি এ অঞ্চলের কৃষিজ সম্ভাবনার দিক বিবেচনায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার মত প্রকাশ করে ভাতের ওপর চাপ কমিয়ে আলুকে প্রাধান্য দেওয়ার মতামত দেন, যা গুণীমহলে সমাদৃত হয়। ১৯৬৪-২০১২ নেদায়ে ইসলামের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বকালীন এর পাশাপাশি তিনি (১৯৭৮-১৯৮০) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টাসহ জাতীয় পর্যায়েও বিভিন্ন কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মানুষ, সমাজ তথা সৃষ্টির কল্যাণ। শিক্ষা, সমাজকল্যাণে নানাবিধ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ১৯৭৮ সালে সমাজসেবায় কুমিল্লা ফাউন্ডেশন কর্তৃক স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হন এবং তার যোগ্য নেতৃত্বে সমাজ সংস্কার ও উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮১ সালে নেদায়ে ইসলামকে জাতীয় সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে আল্লামা শায়খ সায়্যিদ মানযূর আহমাদ (রহ.) ও নেদায়ে ইসলামের অবদান ইতিহাসে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং আমাদের সৃষ্টির সেবায় উৎসাহ প্রদানে চেতনার বহ্নিশিখা হিসেবে পথ দেখাবেÑ এই হোক সবার প্রত্যাশা।