আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

তাসাউফ সম্পর্কে ইমাম ইবনে তাইমিয়া

মাহফুজুর রহমান তানিম
| তাসাউফ
তাসাউফ আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ আধ্যাত্মিকতা বা অধ্যাত্মবাদ। মুসলিম দর্শনে তাসাউফ সুফিবাদ নামে পরিচিত। অনন্ত সৌভাগ্য লাভের উদ্দেশ্যে আত্মশুদ্ধি ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের প্রক্রিয়া এবং কোরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের জাহির ও বাতিন গঠন করাকে তাসাউফ বলা হয়। ইলমে শরিয়ত ও ইলমে মারেফাতকে অনেকে আলাদা করে দেখে; কিন্তু এ দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাসাউফ প্রসঙ্গে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহির মূল্যায়নের ওপর এ প্রবন্ধে আলোকপাত করা হবে। প্রকাশ থাকে, আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ছিলেন হিজরি সপ্তম শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত ধর্মীয় সংস্কারক। যিনি ছিলেন একাধারে অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন হাদিস বিশারদ, ফকিহ, আল্লাহর রাস্তার অকুতোভয় সৈনিক। ইবনে তাইমিয়ার দৃষ্টিতে সুফি ও তাসাউফ : যারা বিশুদ্ধ তাসাউফের চর্চা করেন তাদের প্রকৃত তাসাউফপন্থি আখ্যা দিয়ে ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তার মাজমুউল ফাতাওয়াতে লিখেছেনÑ ‘সুফিরা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা করেন। যেমন অন্যান্য শাস্ত্রের ব্যক্তিরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সাধনা করেন। তাদের মধ্যে অনেকেই তার সাধনা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছেন।’ (খ--১১, পৃষ্ঠা-১৮)। তাসাউফের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেনÑ ‘সর্বপ্রথম বসরা শহরে হাসান বসরির ছাত্র আবদুল ওয়াহিদ ও ইবনে জায়েদের মাধ্যমে তাসাউফের উৎপত্তি হয়। তারা ছিলেন অত্যন্ত দুনিয়াবিমুখ, ইবাদতগুজার ও আল্লাহভীরু।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--১১, পৃষ্ঠা-৬)। এ ধরনের ব্যক্তিরা হলেন প্রকৃত সুফি। (পৃষ্ঠা-১৯)। তাসাউফপন্থিদের প্রশংসা : তাসাউফশাস্ত্রের বিখ্যাত ইমামদের প্রশংসা করে ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, ‘সুফিদের ইমাম ও পূর্বযুগের প্রসিদ্ধ শায়েখদের মধ্যে জুনায়েদ বাগদাদি, আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) প্রমুখ আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলার ব্যাপারে অগ্রগামী ছিলেন এবং লোকদেরও একই নির্দেশ দিতেন।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--৮, পৃষ্ঠা-৩৬৭)। তিনি আরও লিখেছেনÑ ‘সুফিদের মধ্যে যারা জুনায়েদ বাগদাদির পথ অবলম্বন করবে তারা হেদায়াতপ্রাপ্ত।’ (পৃষ্ঠা-৩৩৫)। প্রতারক সুফিদের বিরোধিতা : তাসাউফের নাম দিয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ইবনে তাইমিয়া অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসব বেদাত দমনে অতিবাহিত করেছেন। তার রচনাবলির অজস্র স্থানে ধর্মবিরোধী ভ- পিরদের সমালোচনা করা হয়েছে। শরিয়তবিরোধী নামধারী পীরদের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘ধর্মত্যাগী বেদাতপন্থিদের অনেকে সুফিদের অন্তর্ভুক্ত করে; কিন্তু বাস্তবতা হলো এরা মোটেও তাসাউফপন্থি নয়। কেননা তরিকতপন্থি অধিকাংশ মাশায়েখ ধর্মবিরোধী কার্যক্রমকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেমনÑ তাসাউফের শিরোমণি জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.)।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--১১, পৃষ্ঠা-১৮)। বাতেনি আমল প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া : তাসাউফে প্রচলিত বাতেনি আমল সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ আমলগুলো যেগুলোকে তাসাউফপন্থিরা আহওয়াল, মাকামাত ইত্যাদি নামে নামকরণ করে থাকেন, সেগুলোতে এমন আমল রয়েছে, যা আল্লাহ বা তাঁর রাসুল ফরজ করেছেন। এমন কিছু আমল রয়েছে, যা শরিয়তে মুস্তাহাব করা হয়েছে। সুতরাং প্রথম প্রকার আমলের ওপর ঈমান আনয়ন ফরজ, দ্বিতীয় প্রকার আমলের ওপর ঈমান আনয়ন মুস্তাহাব।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--৭, পৃষ্ঠা-১৯০)। সুফিদের বিভিন্ন পরিভাষা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জেনে রেখ, তাসাউফ এবং তার ইলম বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। সুফিদের কথায় তাসাউফসংক্রান্ত বিভিন্ন ইঙ্গিত থাকে। কখনও কখনও তারা শব্দকে ব্যাপক রাখেন, তাদের পরিভাষার ওপর বিভিন্ন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেন, তারা বিভিন্ন সূক্ষ্ম বিষয়ের আলোচনা করে থাকেন, যার মর্ম শুধু তারাই অনুধাবন করেন। প্রকৃতপক্ষে যে তাদের সংস্পর্শ অবলম্বন না করে এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত না হয়ে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করবে, তবে সে অপদস্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--৫, পৃষ্ঠা-৭৯)। ফানাফিল্লাহ বা স্রষ্টায় বিলীন হওয়ার আকিদা : সুফিদের মধ্যে বহুল আলোচিত ফানাফিল্লাহ বা স্রষ্টায় বিলীন হয়ে যাওয়ার আকিদা সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘ফানা তিন প্রকার। প্রথম প্রকার হলো, নবী ও কামেল ওলিদের ফানা। দ্বিতীয় প্রকার হলো, ক্বাসেদিন তথা আল্লাহর ওলি ও সৎকর্মশীলদের ফানা। তৃতীয় প্রকার ফানা হলো, মোনাফেক ও ধর্মদ্রোহী অনুকারীদের ফানা। প্রথম প্রকারের ফানা হলো, গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছু থেকে নিজের ইচ্ছাকে মিটিয়ে দেওয়া অর্থাৎ বান্দা একমাত্র আল্লাহকেই মহব্বত করবে এবং একমাত্র তারই ইবাদত করবে, তার ওপরই তাওয়াক্কুল করবে এবং তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না। শায়খ আবু ইয়াজিদ বুস্তামি (রহ.) এর উক্তির উদ্দেশ্য এটিই। তিনি বলেন, ‘আমি কামনা করি যে, তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছুর ইচ্ছা করব না।’ অর্থাৎ তাঁর প্রিয় ও সন্তুষ্টপূর্ণ ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। আর দ্বীনি বিষয়ে যে-কোনো ইচ্ছার ক্ষেত্রে এটিই কাম্য। বান্দা তখনই কামেল হবে, যখন সে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছুর ইচ্ছা করবে না, আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত কোনো কিছুতে সন্তুষ্ট হবে না এবং আল্লাহর মহব্বত ব্যতীত কোনো কিছুকে মহব্বত করবে না।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--১০, পৃষ্ঠা-২১৮)। অবশ্য ফানাফিল্লাহর নামে স্রষ্টা ও সৃষ্টির অস্তিত্ব এক হয়ে যাওয়ার আকিদাকে তিনি ভ্রান্ত বলেছেন। বিভিন্ন জায়গায় এ আকিদার কঠোর সমালোচনা করেছেন। ওলিদের কারামত ও কাশফ : ওলি ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন আশ্চর্যজনক ঘটনাকে সমর্থন করে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া বলেন, ‘আহলে সুন্নত ওয়াল জায়ামাতের আকিদা হলো, অলিদের হাতে যেসব অপ্রাকৃতিক ঘটনা ঘটে তার সত্যায়ন করা।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--৩, পৃষ্ঠা-১৫৬)। এমনকি যারা ওলিদের কারামতকে অস্বীকার করে তাদের কঠোর বিরোধিতা করে ইবনে তাইমিয়া বলেন, ‘একদল বলেছে কোনো নবী ব্যতীত অন্যদের হাতে অপ্রাকৃতিক ঘটনা ঘটবে না। তারা জাদুকর, গণক ও নেক্কার বুজুর্গদের হাতে সংঘটিত সব অপ্রাকৃতিক ঘটনা মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে। এটি অধিকাংশ বিভ্রান্ত মুতাজিলা ও অন্য কিছু লোকের মতবাদ।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--১৩, পৃষ্ঠা-৯০)। কাশফ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইলমের ক্ষেত্রে যেসব অস্বাভাবিক বিষয় প্রকাশিত হয়, যেমনÑ কখনও কোনো কোনো বান্দা এমন কিছু শ্রবণ করে, যা অন্যরা করে না, কিংবা কখনও স্বপ্নে বা জাগ্রত অবস্থায় এমন জিনিস দেখে, যা অন্যরা দেখে না অথবা ওহি বা ইলহামের মাধ্যমে কখনও এমন জিনিস অবগত হয়, যা অন্যরা জানে না অথবা তার ওপর আবশ্যকীয় ইলম অবতীর্ণ হয় অথবা সত্য ফিরাসাত যাকে কাশফ ও মোশাহাদা বলা হয়, সমষ্টিগতভাবে এগুলোকে কাশফ ও মুকাশাফা বলে অর্থাৎ যা তার কাছে উন্মোচিত করা হয়েছে।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া : খ--১১, পৃষ্ঠা-৩১৩)।