আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আ.লীগের ৩ নেতা মাঠে বিএনপি চায় পুনরুদ্ধার

নূরে-আলম রনি, নরসিংদী
| শেষ পাতা
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জমে উঠেছে নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনের রাজনীতি। দলীয় কর্মসূচি থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা- নিয়ে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে নিজেদের হারানো ঘাঁটি ফিরে পেতে জোরালভাবে কাজ করে যাচ্ছে বিএনপি। এছাড়া এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে রয়েছে একাধিক প্রার্থী। এ আসনের বর্তমান এমপি সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। তিনি কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জহিরুল হক ভুঁইয়া মোহনকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। আসনটিতে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির একসময়ের প্রভাবশালী নেতা এবং দলটির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়া আজ বেঁচে নেই। ২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর সংস্কারপšি হওয়ার অপরাধে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। ওই ঘটনার পর থেকে মান্নান ভুঁইয়ার নিজ উপজেলা শিবপুরে বিএনপি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লেও বর্তমানে আসনটি পুনরুদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ : দলীয় চেষ্টায় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্রপ্রার্থী বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়াকে পরাজিত করে চমক দেখিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জহিরুল হক ভুঁইয়া মোহন। কিন্তু এমপি হওয়ার পরপরই দলীয় কাজে গুটিকয়েক নেতার হাতে ক্ষমতা পুঞ্জীভূতকরণের কারণে ব্যাপক সমালোচিত হন তিনি। এ সুযোগে দলের বঞ্চিত নেতাকর্মীদের নিজের ছায়ায় নিয়ে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যের পদ সামনে রেখে জহিরুল হকের সঙ্গে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের খাতায় নাম লেখান সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। কিন্তু সর্বশেষ মনোনয়ন দৌড়ে যুবলীগ নেতা সিরাজুল ইসলামকে পেছনে ফেলে মনোনয়নপত্রটি বাগিয়ে আনেন সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভুঁইয়া মোহন। এতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আত্মপ্রকাশ করেন সিরাজুল ইসলাম। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েও তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হন। এমপি হয়ে গেল চার বছরে তিনি এলাকার রাস্তাঘাট, মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজসহ ব্যাপক উন্নয়ন করে জনসাধারণের কাছে প্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। এছাড়া দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের পাশাপাশি বিপদাপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও সিরাজুল ইসলাম জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। শিবপুর উপজেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হাফিজ আহাম্মেদ জানান, শিবপুরবাসীর একজন প্রিয় ব্যক্তি সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। নির্বাচনের সময় এলাকাবাসীকে তিনি যে আশা দিয়েছিলেন তা সঠিকভাবে পালন করেছেন। এলাকার উন্নয়নে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত অনেক অর্থও ব্যয় করেছেন। শিবপুরবাসীর সুখ-দুঃখে তিনি সবসময় পাশে দাঁড়িয়েছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে যোগ্য ও সৎ প্রার্থী হিসেবে সিরাজুল ইসলামের কোনো বিকল্প নেই। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির উদ্দিন সরকার বলেন, সিরাজুল ইসলাম সব সময় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তৃণমূলের অনেকেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে সিরাজুল ইসলামকে দেখতে চান। এদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে আবারও দলীয় প্রার্থী হওয়ার আশা ব্যক্ত করে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভুঁইয়া মোহন বলেন, স্বতন্ত্র এমপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কালো টাকা দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের প্রলুব্ধ করে বিজয়ী হয়েছিলেন। তার কাছে নৌকা নিরাপদ নয়। এজন্য বিগত নির্বাচনেও জননেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। এবারও আমি আশাবাদী। অন্যদিকে শিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম ভুঁইয়া রাখিল নিজেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে জানান দিয়ে বলেন, বর্তমান এমপি আমাদের উপজেলা আওয়ামী লীগের কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত নন। তাই তাকে নিয়ে ভাবার কিছু নেই। তিনি মূলত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। আমি ছাত্র রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত। সাংগঠনিক নেতা হিসেবে যদি মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে আমি নিশ্চিত পাব। বর্তমান এমপি সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই এটি ঠিক নয়। আমি নেতাকর্মীদের যতটুকু মূল্যায়ন করা দরকার, চেষ্টা করেছি তার চেয়ে বেশি করতে। আর আমি এলাকায় যে পরিমাণ উন্নয়ন করেছি তার মূল্যায়ন করবে জনগণ। জননেত্রী শেখ হাসিনার দেখানো পথেই আমি এলাকার সব কাজ করে গেছি। তাই আমি শতভাগ আশাবাদী আমাকেই মনোনোয়ন দেওয়া হবে। বিএনপি : নরসিংদী-৩ আসনে চারবারের এমপি ছিলেন আবদুল মান্নান ভুঁইয়া। শিবপুরের বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে পুরো নরসিংদীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেছেন মান্নান ভুঁইয়া। এর মধ্যে শিবপুরে বেশি উন্নয়ন হয়েছে। সেখানকার গ্রামগঞ্জের রাস্তাঘাটও পাকা। আছে প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ। এসব কারণে এলাকায় তিনি দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। এছাড়া শিবপুরের বিএনপি নেতাকর্মীরাও তার কথায় চলতেন। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় সংস্কারের ডাক দেওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। উপজেলা বিএনপির সে সময়ের সভাপতি আবুল হারিছ রিকাবদার ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মৃধা দল থেকে স্বেচ্ছায় সরে যান। তারা যোগ দেন মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে মান্নান ভুঁইয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অনুসারী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার। ফলে বিএনপিতে দুটি ধারা তৈরি হয়। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গে নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচনে অল্পভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জহিরুল হক ভুঁইয়া মোহনের কাছে পরাজিত হন মান্নান ভুঁইয়া। আর জামানত হারান তোফাজ্জল হোসেন। স্থানীয়রা জানান, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর নিজের পক্ষের নেতাকর্মীদের দিয়ে উপজেলা বিএনপির কমিটি করেন তোফাজ্জল হোসেন। ২০০৯ সালের ২১ ডিসেম্বর শিবপুর সরকারি শহীদ আসাদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবদুল মান্নান খানকে সভাপতি ও আবু ছালেহ রিকাবদারকে সাধারণ সম্পাদক করে তিনি ৭১ সদস্যের উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠন করেন। কিন্তু পরে মান্নান খানের সঙ্গে আবার বিরোধে জড়িয়ে পড়েন তোফাজ্জল হোসেন। এর পর তিনি সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে এ কমিটির আঁতাতের অভিযোগ তুলে ২০১৩ সালে এ কমিটি ভেঙে দেন। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরও তিনি নিজেকে শিবপুরের আহ্বায়ক হিসেবে ফের কমিটি করেন। কিন্তু মান্নান খান এ কমিটি না মেনে নিজেদের কমিটি বহাল রাখেন। তাদের সমর্থন দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া। ফলে এখানে বিএনপির তিনটি ধারা তৈরি হয়। পরবর্তীকালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মান্নান ভুঁইয়া পরিষদের আবুল হারিছ রিকাবদারের সঙ্গে আরিফ উল ইসলাম মৃধার বিরোধকে কাজে লাগিয়ে আবুল হারিছ রিকাবদারকে নিজের কব্জায় নিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি করেন তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার। স্থানীয়রা জানান, ২০১০ সালের ২৮ জুলাই মান্নান ভুঁইয়া মারা যান। এরপর তার অনুসারীরা গঠন করেন ‘আবদুল মান্নান ভুঁইয়া পরিষদ’। মান্নান ভুঁইয়ার মৃত্যুর পর শিবপুরে বিএনপির তিনটি ধারা থাকলেও সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের সব নির্বাচনের বিভিন্ন পদে মান্নান ভুঁইয়ার অনুসারীদের অনেকে জয়লাভ করেন। শিবপুরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে এজন্য রয়েছে ২৮টি কমিটি। এ কমিটি এখন বিএনপির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ ২৯ মার্চ উপজেলার দুলালপুর ইউপি চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্রপ্রার্থী মো. মেরাজুল হককে সমর্থন দেয় মান্নান ভুঁইয়া পরিষদ। সেখানেও বিএনপি-আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে মেরাজুলের বিজয় ছিনিয়ে আনে মান্নান ভুঁইয়া পরিষদ। এ উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মাহফুজুল হক মোল্লা শামীম দ্বিতীয় ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী মরিয়ম বেগম মুক্তা তৃতীয় হন। আগামী নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে কেন্দ্রীয় বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু নিজেদের জানান দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হারিছ রিকাবদার বলেন, মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে নেত্রী যাকে মূল্যায়ন করবেন আমরা তার পক্ষেই কাজ করব। আবদুল মান্নান ভুঁইয়া পরিষদের সদস্য সচিব ও উপজেলা চেয়ারম্যান আরিফ উল ইসলাম মৃধা বলেন, দলগত দিক থেকে শিবপুরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলই অন্তঃসারশূন্য। তাই তারা এখন করছে প্রতিহিংসার রাজনীতি। সর্বশেষ দুলালপুরে উপনির্বাচনে আমাদের সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হন। আর এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বর্ধিত সভা করে ইউএনওর কার্যালয়ে ইটপাটকেল ছুড়েছে। ইউএনওর অপরাধ নির্বাচনে নিরপেক্ষতা। আসলে মান্নান ভুঁইয়ার ছোঁয়া এখনও মানুষের হৃদয়ে আছে। তাই আমার ধারণা, আগামীতেও মান্নান ভুঁইয়ার আশীর্বাদপুষ্ট কাউকে শিবপুরের মানুষ তাদের সেবায় কাজ করার সুযোগ দেবেন। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার বলেন, আমার নেতৃত্বে শিবপুরে মূল ধারায় ফিরে এসেছে বিএনপি। সেক্ষেত্রে মান্নান ভুঁইয়া পরিষদ বিএনপির জয়ে বাধা বলে আমি মনে করি না। আর আমি বিএনপির দুঃসময়ে হাল ধরেছি। এখনও ধরে আছি। আগামী নির্বাচনে নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দেবেন বলে আমি শতভাগ আশাবাদী। এছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে জেলা জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি রেজাউল করিম বাসেত, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য আলমগীর কবির এবং জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি ও শিবপুর উপজেলা সভাপতি জাহাঙ্গীর পাঠান মনোনয়ন প্রত্যাশী।