আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

মিয়ানমার-জাতিসংঘ চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ

আলোকিত ডেস্ক
| প্রথম পাতা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেন ষ পিআইডি

‘মিয়ানমার মৌখিকভাবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘের চুক্তি অবিলম্বে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব হয়েছে মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও হতে হবে মিয়ানমারে।’ তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে, আমরা তারও আশু বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। আমরা দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে এসব কথা বলেন। খবর বাসসের। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রদান করেছে, যারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাংলাদেশ সাধ্যমতো তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং শিশুদের যতেœর ব্যবস্থা করেছে। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় প্রথম থেকেই আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।’ ‘তবে মিয়ানমার মৌখিকভাবে সবসময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না’, বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বব্যাপী বিপুলসংখ্যক নিপীড়িত ও রোহিঙ্গার মতো নিজ গৃহ থেকে বিতাড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আমার হৃদয়কে ব্যথিত করে। এ জাতীয় ঘটনাকে অগ্রাহ্য করে শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের দেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল, মিয়ানমারের ঘটনা সে কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানিরা ৩০ লাখ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। ২ লাখ নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। ১ কোটি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের যে বিবরণ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাতে আমরা হতভম্ব।’ ‘একজন মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশাকে আমরা যেমন অগ্রাহ্য করতে পারি না, তেমনি পারি না নিশ্চুপ থাকতে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার ও অবিচারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা যতদিন তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে না পারবেন, ততদিন সাময়িকভাবে তারা যাতে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বসবাস করতে পারেন, সেজন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখে আমরা নতুন আবাসন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। তিনি এক্ষেত্রে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা যারা সহানুভূতি দেখিয়েছেন এবং সাহায্য ও সহযোগিতা করে চলেছেন তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান এবং রোহিঙ্গাদের মানসম্মত পরিবেশে বসবাস নিশ্চিত করতে তার সরকারের রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের উদ্যোগে সহযোগিতার জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার স্বপক্ষে তার অবস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জাতিসংঘ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তার দৃঢ় সংকল্প তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা ফার্নান্দা এসপিনোসা গার্সেসকে চতুর্থ নারী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানান এবং জাতিসংঘের প্রতি তার অঙ্গীকার সুরক্ষার যে কোনো প্রচেষ্টায় অকুণ্ঠ সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন। তিনি একই সঙ্গে বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকেও ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘মেকিং দ্য ইউনাইটেড নেশন্স রিলেভেন্ট টু অল পিপল : গ্লোবাল লিডারশিপ অ্যান্ড শেয়ারড রেসপন্সিবিলিটিজ ফর পিসফুল, ইকুইটেবল অ্যান্ড সাসটেইনেবল সোসাইটিজ’ উল্লেখ করে বলেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য আমাকে অতীতের কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতির পাতায় নিয়ে গেছে। তিনি এ সময় ব্যক্তিগত স্মৃতি রোমন্থনে ৪৪ বছর আগে এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার বাবা এবং বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলায় প্রদত্ত ভাষণটি স্মরণ করেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি জাতিসংঘের পূর্ণ সংহতি : জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকার ও দেশের জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি ও সহযোগিতার কথা ব্যক্ত করেছে। এখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি জাতিসংঘের পূর্ণ সংহতি এবং পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে।’ বৃহস্পতিবার বিকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিবের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। নির্বাচন বিষয়ে গুতেরেস আশা করেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে। একাধিকবার তার বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, তিনি বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিস্ময়কর উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে গুতেরেস বলেন, অনেক দেশ এ থেকে শিক্ষা নিতে পারে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের অনেক প্রশংসা করেন, বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রশ্নে তার অবস্থানের। ‘আপনি অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের জন্য রোলমডেল হতে পারেন’, বলেন গুতেরেস। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলার সময় জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, মিয়ানমার সরকারের যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের যথাযথ পুনর্বাসন শুরু করা উচিত। নারীর ক্ষমতায়নে তিনটি পদক্ষেপে গুরুত্বারোপ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে নারীর ক্ষমতায়ন এগিয়ে নিতে তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের গতি ত্বরান্বিত করা নিয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় তিনি বলেন, বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সহিংসতাসহ অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নারীর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং জীবন ও জীবিকার সব ক্ষেত্রে নারীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে। বৃহস্পতিবার বিকালের এ অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস উপস্থিত ছিলেন। লিথুনিয়ার প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিল অব উইমেন লিডার্সের সভাপতি দালিয়া গ্রাইবোস্কাইত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য তিনি দেশটির প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান।