আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

পর্যটন শিল্পের বিকাশে তথ্যপ্রযুক্তির উপযোগিতা

মো. জিয়াউল হক হাওলাদার
| সম্পাদকীয়

স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এখন ভ্রমণের মাধ্যমে যে শিক্ষা অর্জন করা যায় সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে তারা জানতে পারছে কোন এলাকায় তাদের পাঠ্যসূচির বিষয়গুলো কিংবা গবেষণা ক্ষেত্র বিরাজ করছে। স্বল্প খরচে তারা তথ্য অনুসন্ধান এবং ডাটা সংগ্রহে বের হয়ে যেতে পারছে

জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থা বা ইউএনডব্লিউটিও ঘোষিত বিশ্ব পর্যটন দিবস প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বে অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালিত হয়। ১৯৮০ সাল থেকে এ দিবসটি সারা বিশ্বেই যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতি বছরই একটি থিম বা প্রতিপাদ্য থাকে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিলÑ ঞড়ঁৎরংস ধহফ ঃযব উরমরঃধষ ঞৎধহংভড়ৎসধঃরড়হ বা পর্যটন শিল্পের বিকাশে তথ্যপ্রযুক্তির উপযোগিতা। অর্থাৎ তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতায় পর্যটন শিল্প যথাযথ বিকাশ লাভ করে। পৃথিবীর অন্য দেশের মতো বাংলাদেশও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এ দিবসটি পালন করেছে।
তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতা পর্যটন শিল্পের বিকাশে দারুণভাবে সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক যুগে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে পর্যটকদের ধরন-ধারণেও ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। পর্যটকরা কোনো ডেস্টিনেশন বা গন্তব্যে ভ্রমণ করার আগে ইন্টারনেটে সে ওই স্থান সম্পর্কে, সেখানকার পরিবেশ, মানুষের সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাস, তাপমাত্রা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নেয়। আগে হয়তো একজন পর্যটক কোনো গন্তব্যে ভ্রমণ করার আগে অন্য কোনো ব্যক্তি বা পর্যটকের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে সেখানকার সব বিষয়ে তথ্য নিতে হতো অথবা সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে সারা বিশ্ব তার হাতের মুঠোয়। সে কোনো জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগেই মোবাইলে কিংবা ল্যাপটপে ট্র্যাভেল অ্যাপ্সের মাধ্যমে অথবা ওয়েবসাইটে কোনো পর্যটন গন্তব্য বা আকর্ষণীয় স্থান, হোটেলের মান এবং ভ্রমণ আয়োজন প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্যতাসহ সবকিছু জেনে নিতে পারে। তার থাকার জন্য হোটেল বুকিং, আহারের স্থান, ঘোরার জন্য পরিবহন সবকিছুই নিশ্চিত করে নিতে পারে। ফলে ডেস্টিনেশনে তার কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। তথ্যপ্রযুুক্তিগত উন্নয়নের ফলে পর্যটকরা এখন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো উদ্ভূত অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সম্মুখীন বা বিপদাপদে পড়তে হয় না। রুট-ম্যাপ, জিপিএস সবকিছুই পর্যটককে যে-কোনো অপরিচিত স্থান থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করছে। এছাড়া পর্যটকদের হয়রানি কিংবা প্রতারণার শিকার হতে হয় না। অন্যদিকে পর্যটন সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদের জন্য উন্নতমানের সেবার পসরা সাজিয়ে বসছে। ইন্টারনেট, ওয়েবসাইটে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। পর্যটকরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিভিন্ন প্যাকেজ পছন্দ করে বুকিং দিতে পারছে, সার্ভিস ফিডব্যাক দিতে পারছে। এগুলো হয়তো আগে সম্ভব ছিল না। 
তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আজকের যুবসমাজ পর্যটন শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। তারা অ্যাডভেঞ্চার বা দুঃসাহসিক ভ্রমণে বের হচ্ছে। দেশের অনগম্য এলাকা থেকে শুরু করে আনাচে-কানাচে এবং সমুদ্রের তলদেশে তারা স্কুভাডাইভিং, স্নোরকেলিং এবং ক্রজিং করছে। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তে এবং অতীব সহজেই ঘুরে আসতে পারছেন দেশের যে-কোনো প্রান্ত থেকে।
স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এখন ভ্রমণের মাধ্যমে যে শিক্ষা অর্জন করা যায় সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে তারা জানতে পারছে কোন এলাকায় তাদের পাঠ্যসূচির বিষয়গুলো কিংবা গবেষণা ক্ষেত্র বিরাজ করছে। স্বল্প খরচে তারা তথ্য অনুসন্ধান এবং ডাটা সংগ্রহে বের হয়ে যেতে পারছে। 
টেকসই পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে ও বাস্তবতায় নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং ইনোভেশনের মাধ্যমে এসব প্রতিবন্ধকতা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বেশ গতি পেয়েছে। অনেক দ্রুত পর্যটনের নানা অফার বহু সংখ্যক পর্যটকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। পর্যটকদের জন্যও প্যাকেজ বাছাইয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে। এতে কাগজের ব্যবহার, পরিবেশের ক্ষতিসাধন, জ্বালানির খরচও কমে যাচ্ছে।
পর্যটন হলো এমন একটি শিল্প, যেখানে পণ্য ক্রেতার কাছে না গিয়ে, ক্রেতা পণ্যের কাছে হাজির হয়। আর এ পর্যটন পণ্য টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে গুণাগুণ দেখানো সম্ভব হচ্ছে। ক্রেতা তার পছন্দমতো পণ্য অর্থাৎ ডেস্টিনেশন, আবাসন এবং প্যাকেজ পছন্দ করে গ্রহণ করতে পারছেন। 
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (ঝউএ) অর্জনে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অভীষ্ট ৮, ১২ এবং ১৪ সরাসরি পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রযুক্তি পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখছে। ট্যুরিজম শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোক্তা তৈরি হয়, যুবসমাজের অংশগ্রহণ বাড়ছে, কমিউনিটি পর্যটন উন্নয়ন এবং শহর ও গ্রামে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে, দারিদ্র্যবিমোচন তথা এসডিজি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। 
পর্যটন শিল্পের প্রচার-প্রচারণা এখন পুরোপুরিই তথ্যপ্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এখন যে-কোনো পর্যটন সেবার অফার সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব দ্রুত লাখ লাখ কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ইউটিউবে, ফেইসবুকের মাধ্যমে আমাদের যুবসমাজ পর্যটনের অনেক প্রচার করতে পারছে। আর পর্যটনের এ প্রচার এবং প্রসারের জন্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে যুবসমাজ স্বল্প সময়ে নানা ধরনের অভিনব আইডিয়া বাস্তবায়ন করছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ওপর বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০১০ এ পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। 
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ২আইয়ের সঙ্গে পর্যটন উন্নয়নের জন্য ব্র্যান্ডিং, জনচেতনতা সৃষ্টি, ইউটিউব চ্যানেল চালুসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ওয়েবসাইট হালনাগাদকরণসহ অনলাইন বুকিং, পেমেন্টসহ সব হোটেল-মোটেলগুলোতে পর্যটকদের জন্য অনলাইন সেবা কার্যক্রম নিশ্চিত করা হয়েছে। অনলাইনে পর্যটকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য স্থাপন করা হয়েছেÑ এৎরবাধহপবং জবফৎবংং ঝুংঃবস বা জিডিএস। একজন পর্যটক তার চাহিদা মোতাবেক যে-কোনো পর্যটন গন্তব্য থেকে অভিযোগ এবং ফিডব্যাক দিতে পারবেন এবং অনলাইনে তার চাহিদা পূরণ করে সমস্যা সমাধানেরও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের পাবলিক এবং প্রাইভেট সেক্টরের বিভিন্ন ট্র্যাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটররা ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের প্যাকেজগুলো বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিক্রি করছে। এয়ারলাইন্সের টিকিট এখন মানুষ ঘরে বসেই ক্রয় এবং সংগ্রহ করতে পারছে। টিকিট ক্রয়ের জন্য গাড়ির জ্বালানি খরচ করতে হয় না। টিকিটের কপি এবং বোর্ডিং পাস অনলাইনে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এতে পরিশ্রম কম এবং কাগজের সাশ্রয় হয়। 
ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে বহুদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। ইনোভেশন এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্যবিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব। সুতরাং বলা যায়, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে টেকসই পর্যটন শিল্পের বিকাশ করা যাবে। পর্যটন শিল্পে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত ব্যবহার অনস্বীকার্য। হ

মো. জিয়াউল হক হাওলাদার
ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ), বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন