আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

মালিক ও শ্রমিকের অধিকার

মাওলানা দৌলত আলী খান
| ইসলাম ও অর্থনীতি

ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার প্রতিবাদে বর্তমান বিশ্বে যে কার্যক্রম চলছে, তার প্রধান কারণ হলো শিল্পমালিক ও শ্রমিকের পারস্পরিক বিরোধ এবং মজুরি নির্ধারণ সমাস্যা। ধনবাদী অর্থব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে স্বার্থপরতা ও লাগামহীন ব্যক্তিমালিকানার ওপর। যতক্ষণ পর্যন্ত মালিক তার ব্যবসা চালাতে শ্রমিককে প্রয়োজন মনে করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিক তার মালিক থেকে মানবিকতার মর্যাদা পায়। কিন্তু প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে গেলে শ্রমিককে আর চিনে না, বরং তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাই।
অন্যদিকে শ্রমিকরা জীবিকা উপার্জন করতে হলে মালিক পক্ষকে সম্মান দেখায়। মালিকের নির্দেশকে শ্রদ্ধা করে। আর যখন শ্রমিকের নির্ভরশীলতা মালিকের ওপর থাকে না, তখন মালিকের বিরুদ্ধে হরতাল করতে পিছপা হয় না। এ রকম স্বার্থপর আচরণবিধির কারণে মালিক ও শ্রমিকের মাঝে এক চিরন্তন কষাকষি বিরাজ করছে। ফলে উভয় পক্ষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
কোরআনে মালিক ও শ্রমিকের অধিকার : ইসলাম মালিক-শ্রমিক পারস্পরিক অধিকার বাস্তবায়নকে গুরুত্বসহকারে শিক্ষা দিয়েছে। কারও অধিকার হরণ করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। তাই শ্রম ব্যবস্থায় ইসলাম যে নৈতিকতার শিক্ষা দিয়েছে, তা অন্য ধর্মে বিরল। শ্রমিকের ব্যাপারে মালিকের কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত, সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে শোয়াইব (আ.) এর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। যেমনÑ মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মুসা (আ.) কে বললেন, আমি আমার এ কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইÑ এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করবে, যদি তুমি ১০ বছর পূর্ণ করো, সেটা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। ইনশাআল্লাহ, তুমি আমাকে সদাচারী পাবে।’ (সূরা কাসাস : ২৭)।
ধনী মুসলিমদের সৎকর্মশীল হওয়া উচিত : একজন মুসলিম শিল্পপতিকে সম্পদ উপার্জনের পাশাপাশি সৎকর্মশীল হওয়াও উচিত। আর সৎকর্মশীল হতে হলে শ্রমিকের ওপর অনর্থক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। কারণ শ্রমিক মালিকের একজন সহযোগী। সুতরাং একজন সহযোগীর ওপর মালিক কখনও কষ্টের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে না। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘খাদ্য ও পোশাক দাস-দাসীদের প্রাপ্য। আর তাদের ওপর এমন কাজের বোঝা চাপিয়ে দেবে না, যা তাদের সাধ্যের বাইরে।’ (মুসলিম : ৪৪০৬)।
শ্রমিকের পারিশ্রমিক আদায়ের নির্দেশ : শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়ন করা মালিক পক্ষের ওপর ওয়াজিব। পারিশ্রমিক প্রদানে বিলম্ব করাও উচিত নয়। শ্রমিকের গায়ের ঘাম ঝরার আগেই তার পারিশ্রমিক তাকে প্রদান করতে ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। আর এটাই হলো মালিকের প্রতি শ্রমিকের অধিকার। এভাবে মুহাম্মদ (সা.) মুনিব-শ্রমিকের মাঝে মানবতার শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তার পারিশ্রমিক আদায় করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ : ২৫৩৭)।
মালিকের কাজ সম্পাদনে শ্রমিকের দায়িত্ব : ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিক মালিকের কাজের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়ে এমন এক নৈতিক চুক্তির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়, যার আনুগত্য সে শুধু পেট ভরার নিমিত্তেই করে না, বরং তার পরকালীন কল্যাণও এর ওপর নির্ভরশীল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনরা! তোমরা তোমাদের চুক্তিগুলো অবশ্যই পূরণ করো।’ (সূরা মায়িদা : ১)। 
আরও বলেন, ‘সর্বোত্তম শ্রমিক সেই, যে শক্তিশালী ও আমানতদার (দায়িত্বশীল) হয়।’ (সূরা কাসাস : ২৬)।
শ্রমিকের ওপর জুলুম করার পরিণাম ভয়াবহ : শ্রমিক একজন সেবক। মালিককে সেবা প্রদান করাই হলো শ্রমিকের দায়িত্ব। তবে শ্রমিক থেকে কাজ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার জুলুম করা যাবে না। দুর্ব্যবহার করা যাবে না। মালিকের উচিত শ্রমিককে নিজের মতো খেতে দেওয়া, কাপড় পরিধান করা। অসুস্থ হলে ভালোভাবে চিকিৎসা প্রদান করা। যদি মালিকপক্ষ শ্রমিকের ওপর জুলুম করে বা ধারণক্ষমতার বাইরে কোনো বোঝা চাপিয়ে দেয়, তাহলে মালিককে কেয়ামত দিবসে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। আর মুনিব যদি শ্রমিকের পারিশ্রমিক আদায় না করে, তাহলে সে পরকালে আল্লাহ তায়ালার অভিশাপের রোষানলে পড়বে। এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, তিন প্রকারের ব্যক্তি এমন আছে, যাদের সঙ্গে আমি কেয়ামতের দিন ঝগড়া করবÑ ১. ওই ব্যক্তি, যে আমার নামে শপথ দিয়ে তা ভঙ্গ করেছে, ২. ওই ব্যক্তি, যে-কোনো আজাদ ব্যক্তিকে বিক্রি করে মূল্য ভক্ষণ করেছে ও ৩. ওই ব্যক্তি, যে কাউকে শ্রমিক হিসেবে নিয়ে কাজ পূর্ণমাত্রায় আদায় করে নিয়েছে; কিন্তু তাকে তার পারিশ্রমিক দেয়নি।’ (বোখারি : ২২৬৭)।
আরও বলেন, ‘দাস-দাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (তিরমিজি : ২০৭২)।

লেখক : শিক্ষক, নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম