আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

পুঁজিবাজারে হতাশা

মন্দা অব্যাহত সূচক ও লেনদেনে

সাখাওয়াত হোসেন
| প্রথম পাতা

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল। পর্যায়ক্রমে পুঁজিবাজারে আসছে নতুন নতুন কোম্পানি। আর পুঁজিবাজারে তারল্য সমস্যা দূর করতে অতিসম্প্রতি চীন থেকে পাওয়া টাকা বিনিয়োগে ট্যাক্স কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কিন্তু তাতেও কাটেনি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। ফলে দেখা দিয়েছে আস্থাহীনতা। যার প্রভাব পড়ছে পুরো পুঁজিবাজারে।

এদিকে বাজার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশন। তারা বলছেন, গত দুই মাস ধরে পুঁজিবাজারের সূচক নিম্নমুখী। এতে বিনিয়োগ নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। বাজারের স্বার্থে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোকে কার্যকর করাসহ বাই-ব্যাক আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করা, আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গেল সাত দিনের পুঁজিবাজারের হিসাবে দেখা গেছে, এ সময়ে পুঁজিবাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১২৪ পয়েন্ট। ২৩ সেপ্টেম্বর ডিএসইর এ সূচকের অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৪৬৭ পয়েন্টে। ২৭ সেপ্টেম্বর এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৪২ পয়েন্টে। শতকরা হিসাবে কমেছে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর আগের সাত দিনের হিসাবে দেখা গেছে, তখনও ডিএসইএক্স সূচক কমেছে ৩৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ফলে গেল ১৪ দিনে এ সূচকের পতন হয়েছে ১৫৭ পয়েন্ট। লেনদেনে ক্ষেত্রেও নেতিবাচক অবস্থা দেখা গেছে। উল্লিখিত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ডিএসইর লেনদেন নেমে এসেছে গড়ে ৫৬৯ কোটি টাকায়। যেখানে এর আগের সপ্তাহে ছিল ৭৭৬ কোটি টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর লেনদেন কমেছে ২৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। গেল সপ্তাহে লেনদেন হওয়া কোম্পানির সংখ্যা ছিল ৩৪৬, যার মধ্যে দাম বেড়েছে মাত্র ৭১টি কোম্পানির। আর দাম কমেছে ২৫৭টি কোম্পানির। একইভাবে গেল সাত কার্যদিবসে ডিএসইর অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক কমেছে ১৬ দশমিক ১৭ পয়েন্ট এবং ডিএসইএক্স শরিয়াহ সূচক কমেছে ২৫ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক দেবব্রত কুমার সরকার আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, পুঁজিবাজারের বর্তমান যে অবস্থা, এর জন্য তারল্য সমস্যা দায়ী নয়। বরং বিনিয়োগকারীদের হাতে নগদ টাকা থাকলেও তা বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। একই অবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা রয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক অবস্থা অস্থিতিশীল হলে পুঁজিবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেই ধারণা থেকেই মূলত বাজারে বিনিয়োগ কমে গেছে।
তিনি আরও জানান, পুঁজিবাজারে বর্তমানে মাসে অন্তত একটি নতুন কোম্পানি টাকা উত্তোলন করছে। সেখানে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে প্রায় দশ-বিশগুণ বেশি আবেদন জমা পড়ছে। এর মানে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বেশি আবেদন হচ্ছে, যা প্রায় এক মাস সময় ধরে আটকে থাকছে। ফলে এটি স্পষ্ট যে বাজারে তারল্য সমস্যা নেই। বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণেই মন্দাবস্থায় পুঁজিবাজার।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. রুহুল আমিন আকন্দ বলেন, বিনিয়োগকারীদের কথা বিবেচনা করেই আমরা আমদের প্রস্তাব পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে পাঠিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ অর্থমন্ত্রীর কাছেও আমাদের প্রস্তাব জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তাবগুলোর মধ্যেই পুঁজিবাজারের উন্নয়নের বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পুঁজিবাজারের এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজার ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন। তাই এখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জানুয়ারি ২০১১ সাল থেকে হালনাগাদ পর্যন্ত মার্জিন ঋণের বিপরীতে আরোপিত ১০০ শতাংশ সুদ সম্পূর্ণ মওকুফের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ওটিসি মার্কেটের কোম্পানিগুলোকে দ্রুত মূল মার্কেটে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ওটিসি মার্কেটে বিনিয়োগকারীদের বিপুল অঙ্কের টাকা আটকে আছে।
আইপিও সংক্রান্ত বিষয়ে বলা হয়, আইপিও আবেদনকারীদের যোগ্যতাস্বরূপ পুঁজিবাজারে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা বিনিয়োগের বিধান রাখতে হবে এবং আইপিও লটারিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আইপিও আবেদন কোটায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৬০ শতাংশ, প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ৩০ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা করতে হবে। আইপিও’র মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ কোম্পানিগুলো কী কাজে ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে মনিটরিং করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আরেক সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, পুঁজিবাজারের জন্য প্রকৃতপক্ষে যাদের যেটুকু করা উচিত তারা সেটুকু করছেন না। বরং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে সামনে এনে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে, যা পুঁজিবাজারের প্রকৃত অবস্থা নয়।
তিনি বলেন, কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের বিনিয়োগ এসেছে; যা ডিএসই’র শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে এরই মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এ টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করবেন কিনা সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। অর্থমন্ত্রীও এ টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হলে ১০ শতাংশ ট্যাক্স মওকুফ করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু পুঁজিবাজারকে দেখিয়ে যারা টাকা আনল, সেই টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তারা সুবিধা আদায় করেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এক্ষেত্রে কোনো সুফল পাননি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ বিষয়গুলোকে নজরে নিয়ে দ্রুত পুঁজিবাজার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।