আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

জমি অধিগ্রহণে নীতিমালা হচ্ছে

ক্ষতিপূরণের সঙ্গে পুনর্বাসন

আমিরুল ইসলাম
| প্রথম পাতা

সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষকে পুনর্বাসনের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করছে ভূমি মন্ত্রণালয়

সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষকে ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে সরকার। এর আগে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও পুনর্বাসনের জন্য কোনো আইন কিংবা নীতিমালা ছিল না। দেশের ইতিহাসে এ প্রথম সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষকে পুনর্বাসনের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এ নীতিমালা অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের জাতীয় পুনর্বাসন নীতিমালা-২০১৮ নামে অভিহিত হবে।

এ নীতিমালা অনুমোদন হলে ক্ষতিগ্রস্তরা একদিকে যেমন ক্ষতিপূরণ পাবেন, তেমনিভাবে তাদের জন্য বিকল্প বাসস্থান, জমি, প্লট, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট, ক্ষতিপূরণের অতিরিক্ত নগদ অর্থ কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকবে। নীতিমালা প্রণয়ন বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি সচিব মো. আবদুল জলিল আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, দেশে এটিই প্রথম জাতীয় পুনর্বাসন নীতিমালা। ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণকে ক্ষতিপূরণের বাইরে গিয়ে পুনর্বাসন করা, চাকরি দেওয়া, প্লট, ফ্ল্যাটসহ সব সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। তবে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নিয়েছি। কাজটি বেশ কঠিন। তবে হবে বলে আশা করি।

অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের জাতীয় পুনর্বাসন নীতিমালার পটভূমিতে বলা হয়েছে, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন কর্মকা- সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করছে। ফলে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। সড়ক, রেলপথ, বন্দর, বিদ্যুৎ, গ্যাস, নগর উন্নয়ন, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প জনস্বার্থে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর গেল বছর স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন-২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আগে প্রচলিত অধিগ্রহণ আইন ও অধ্যাদেশে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ২০১৭ সালে প্রণীত স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইনে ৯ এর ৪ উপধারায় বলা হয়েছে, ক্ষতিপূরণ প্রদান ব্যতীত নির্ধারিত পদ্ধতিতে অধিগ্রহণের কারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারকে পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইনের সেই বাধ্যবাধকতা, জাতীয় বাস্তবতা, উন্নয়ন আবশ্যকতার প্রেক্ষাপট থেকেই এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে এ নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। বাস্তুচ্যুত বলতে অধিগ্রহণের ফলে বসতভিটা হারানো ব্যক্তি, পরিবার এবং দেশের অন্য কোনো বসতবাড়ি নেই এমন ভূমিহীন ব্যক্তি-পরিবার, যারা পূর্ববর্তী পাঁচ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজের একমাত্র বসতভিটা হিসেবে ওই ভূমির ভোগদখলদার আছেন।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রাপ্য পুনর্বাসন সুবিধা, সহায়তা, পুনর্বাসিত এলাকায় স্থানান্তর, নতুনভাবে নির্মিত বাজার, বিপণিবিতান স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পুনর্বাসন তহবিল ব্যবহার করা হবে। প্রকল্পের উদ্যোগে নতুন করে নির্মিত এলাকায় পানীয়জল, অভ্যন্তরীণ ও সংযোগ সড়ক, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, বিদ্যালয়, মসজিদ, প্রার্থনা কেন্দ্র, গণকেন্দ্রসহ সাধারণ সুবিধা থাকবে। বিশেষ করে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে জনসাধারণ, স্থানীয় সরকার এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিকল্প স্থানে প্রকল্পের অর্থায়নে একই মানের অথবা উন্নতমানের স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। পুনর্বাসনের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে পুনর্বাসিত জনসাধারণ ও গ্রাহক সমাজের মতামতের ভিত্তিতে হবে। ওই এলাকায় যেন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থান নির্বাচন ও তাতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তৈরির প্রাক্কালে মহিলা ও ঝুঁকিগ্রস্তদের বিশেষ মতামত গ্রহণ করতে হবে। পুনর্বাসিত এলাকায় প্রকল্পের অর্থায়নে নাগরিক সুবিধাদির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সামর্থ্যবান বাস্তুচ্যুতদের ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্তদের নতুন স্থানে প্রকল্প নির্ধারিত ভর্তুকি মূল্যে বাড়ি বা দোকানের জন্য জায়গা দিতে হবে। স্বত্ববিহীন ভূমিহীন বাস্তুচ্যুত বা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্তদের নামমাত্র মূল্যে বাড়ি বা দোকানের জায়গা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে যৌথ নামে বরাদ্দ দিতে হবে। এক্ষেত্রে নিবন্ধন ও অনুরূপ অন্যান্য ফি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে বহন করতে হবে। স্বত্ববিহীন ভূমিহীন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো তাদের পুনর্বাসন ভিটি বা দোকানের জায়গা উত্তরাধিকার সূত্র ছাড়া অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করতে পারবেন না।
ভূমি অধিগ্রহণের আগেই যে সংস্থা অধিগ্রহণ করবে, তারা অধিগ্রহণের ফলে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তর, পুনর্বাসন, জীবিকা পুনর্গঠন সহায়ক একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন পরিকল্পনাসহ (রিসেটেলমেন্ট প্ল্যান) বিস্তারিত পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা (রিসেটেলমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান) অধিগ্রহণ প্রস্তাবের সঙ্গে জমা দিতে হবে। জনসাধারণের মধ্যে যাতে অধিগ্রহণ আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়, পুনর্বাসন পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে তা অবহিত করতে হবে। অধিগ্রগণকারী সংস্থা প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ঝুঁকিপ্রবণ গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে শুমারি পরিচালনা করতে হবে। ভূমি অধিগ্রহণের আগেই পুনর্বাসন উদ্যোগ দৃশ্যমান হতে হবে। অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি জাতীয়ভাবে নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবার, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, মহিলা প্রধান, দরিদ্র পরিবার, ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষি, শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং বয়োবৃদ্ধদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে হবে। প্রকল্পের প্রাথমিক অংশীজন বলতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, প্রকল্পের উপকারভোগী, গ্রাহক সমাজ এবং অধিগ্রহণকারীদের বোঝাবে। মাধ্যমিক অংশীজন বলতে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, মানবাধিকার গোষ্ঠী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে বোঝাবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা, প্রকল্পের প্রারম্ভিক তথ্যাবলি, সম্ভাব্য বিকল্প ও বিভিন্ন পছন্দ মূল্যায়ন, নকশার বিষয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যাতে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারে, সেজন্য প্রকল্প এলাকায় অথবা সম্ভাব্য কাছাকাছি স্থানে একটি গণ তথ্য কেন্দ্র (পাবলিক ইনফরমেশন সেল) স্থাপন করতে হবে। এ কেন্দ্রে প্রকল্পের উদ্দেশ্য, বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব, ক্ষতিপূরণের তালিকা, ক্ষতিপূরণের হার, পুনর্বাসনসংক্রান্ত সব তথ্য থাকবে। অংশীজনরা যাতে সব বিষয় খোলামেলাভাবে জানতে পারেন, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অবাঞ্ছিত দাবি প্রতিরোধে প্রকল্প এলাকার বাড়িঘর, গাছপালা, বাগান, পুকুর, পাকা বাড়ি, কাচাঘর, রাস্তাঘাটের ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করে সংরক্ষণ করা হবে। অধিগ্রহণসংক্রান্ত নোটিশ জারির সঙ্গে সঙ্গে এ ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করে সংরক্ষণ করা হবে। অধিগ্রহণকারী সংস্থা নিজ নিজ ক্ষেত্রে পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের জন্য এ নীতিমালার আলোকে সুনির্দিষ্ট কাঠামোয় পুনর্বাসন নির্দেশিকা ও হ্যান্ডবুক প্রণয়ন করবে। সব নির্দেশিকা বা হ্যান্ডবুক নিজ নিজ বিভাগ ও সংস্থা পরিচালনা নির্দেশিকা হিসেবে অনুসরণ করতে হবে।