আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

জয়পুরহাটে অবাধে গাছ নিধন

নামমাত্র মূল্য নির্ধারণ ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

রাশেদুজ্জামান, জয়পুরহাট
| দেশ

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় ঝুঁকির অজুহাতে চলছে গাছ নিধন। ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ, জলবায়ুসহিষ্ণু বাংলাদেশ’ গড়ার জন্য সরকার থেকে অপ্রয়োজনে গাছ না কাটা ও পতিত জমিসহ রাস্তার ধারে বেশি বেশি করে গাছ লাগানোর কথা বলা হলেও সরকারের এ সেøাগান মানা হচ্ছে না। চেয়ারম্যান সামাজিক বনবিভাগে যে দরখাস্ত দেন তাতে ইউনিয়ন কর্তৃক গাছ কাটার রেজুলেশন ও উপজেলা প্রশাসনের অনুমতির কোনো রেজুলেশন কপিও সংযুক্ত করা হয়নি বলে বনবিভাগ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়। 
সরেজমিন ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের রাস্তাতে যানবাহন, মানুষের চলাচল, জানমালের ক্ষতির অজুহাতে ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণের নামে পাটাবুকা, সুলতানপুর, নওদা এলাকায় গাছও কেটে ফেলা হচ্ছে। অনুমতিপত্রের বেশিরভাগ গাছ কেটে ফেলা হলেও সীমানা জটিলতায় আটকে যাওয়া নওদা এলাকায় রাস্তা থেকে ৩ থেকে ৪ ফুট দূরে সোজা হয়ে দাঁড়ানো একটি রেইনট্রি গাছ দেখে বোঝা যায় গাছগুলো কত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এরই মধ্যে যার ডালপালা কাটা হয়ে গেছে।  
বগুড়া বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের (সামাজিক বনবিভাগ) গাছ কাটার অনুমতিপত্র সূত্রে জানা যায়, বালিঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে জয়পুরহাট সামাজিক বনবিভাগে ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ গাছের মূল্য নির্ধারণসহ গাছ কাটার দরখাস্ত করেন। সেই সময়ে দরখাস্তে উল্লেখিত স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ গাছের ঘটনাটি আদৌ সত্য নয় বলে এলাকাবাসীর তথ্যমতে জানা যায়। দরখাস্তের পরিপ্রেক্ষিতে জয়পুরহাট অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো ধরনের গাছ পরিদর্শন ছাড়াই ২০১৮ সালের জুন মাসে গাছের সংখ্যা উল্লেখ ব্যতীত কিছুসংখ্যক গাছের মূল্য নির্ধারণের জন্য বিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুমতির জন্য পাঠায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ সুবেদার ইসলাম বনজদ্রব্য পরিবহন (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০১১ এর বিধি মোতাবেক কিছু শর্তসাপেক্ষে গাছ বিক্রয়সহ কাটার অনুমতি প্রদান করেন। অনুমতিপত্রের শর্তে দরপত্রের মাধ্যমে গাছ বিক্রির কথা থাকলেও চেয়ারম্যান কোনো দরপত্র না দিয়েই ৭০ হাজার টাকায় জনতা স’ মিলের কাছে গাছগুলো বিক্রি করেন। প্রতিবেদকের কাছে জনতা স’ মিলের স্বত্বাধিকারী মো. আলম গাছ কেনার কথা স্বীকার করলেও তিনি বিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ের অনুমতিপত্র ছাড়া দরপত্রের কোনো কাগজই দেখাতে পারেননি। গাছ কাটার পর দ্বিগুণ গাছ লাগানোর কথা থাকলেও ওই এলাকায় নতুন গাছ লাগানোর কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। এছাড়াও বনজদ্রব্য নিবন্ধনকৃত ডিপো ব্যতীত স’ মিল এলাকায় কাটা গাছ মজুত করা যাবে না শর্ত থাকলেও তা না মেনে সরাসরি স’ মিলে কাটা গাছ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয় কর্তৃক অনুমতিপত্রে গাছের সরকারি মূল্য নিম্ন দাম ধরা হয়েছে পাটাবুকা মকবুল সরদারের বাড়ির রাস্তার মোড়ের ওপর রেইনট্রি গাছ ৬ হাজার ২১১ এবং বটগাছ ৩ হাজার ৭৫০ টাকা, পাটাবুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে রাস্তার পাশে বটগাছ ৩ হাজার, নওদা সরদারপাড়া এলাকায় রেইনট্রি গাছ ৫ হাজার ৩৬০, নওদা হিন্দুপাড়া রাস্তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে রেইনট্রি গাছ ৫ হাজার ৫৩৬, কাশপুর সুলতানপুর মুক্তিযোদ্ধা তেজেন মাস্টারের বাড়ির পাশে ৬ হাজার ৩৮২ টাকা ভ্যাটসহ মোট ৩৪ হাজার ৭৯৭ টাকা। গাছের প্রজাতি ও সাইজ অনুপাতে যে সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা অবাস্তব বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী বলেন, গাছগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হচ্ছে কিন্তু এত ঝড়বৃষ্টি গেল তবুও তো গাছগুলো পড়ে যায়নি। এদিকে গাছগুলো যদি বড়ই না হবে তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ হলো কেমন করে, গাছের যে সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে গাছের একটা শাখার দাম তাই হবে। এতে করে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। আসলে সবকিছুই চেয়ারম্যান করছেন ক্ষমতার জোরে। গাছ ক্রেতা জনতা স’ মিলের স্বত্বাধিকারী মো. আলম জানান, সামাজিক বনবিভাগের কাগজের ভিত্তিতে গাছ ক্রয় করেছি, চেয়ারম্যান মোটের ওপর মূল্য ধরে আমার কাছে গাছ বিক্রি করেছেন। কোনো দরপত্রের মাধ্যমে গাছ ক্রয় করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি সদস্য রেজা সরদার ও জহর আলী বলেন, গাছ কাটার রেজুলেশনের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না, তবে কিছু কিছু গাছ ঝুঁকিপূর্ণ আছে এটা সত্য, যখন এলাকায় গাছ কাটতে আসে তখন জানতে পারি গাছের দরপত্র হয়েছে গাছ কাটার জন্য। বালিঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরুজ্জামান চৌধুরী বিপ্লব জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় এলাকাবাসী ও ইউপি সদস্যদের অনুরোধে রেজুলেশন করে গাছ কাটার অনুমতি চাওয়া হয়েছে এবং দরপত্রের মাধ্যমে গাছ বিক্রয় করা হয়েছে। সামাজিক বনবিভাগের ফরেস্টার বাহার উদ্দিন বলেন, চেয়ারম্যানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গাছ পরিদর্শন করে মূল্য নির্ধারণসহ গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। 
সামাজিক বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মির্জা মাহবুবুল জানান, আমি নতুন এসেছি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। তবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাঁচবিবি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিবুল আলম জানান, আমি ছুটিতে ছিলাম, গাছ কাটা যদি নিয়মমাফিক হয় তবে সমস্যা নেই, নিয়মমাফিক না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।