আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২২-০২-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

অমর একুশে গ্রন্থমেলা

শহীদ মিনারের জনস্রোত মেলায়

মামুন তুষার
| শেষ পাতা

মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নামে জনতার স্রোত। সেই স্রোত এসে ঠেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। এদিন সকাল ৮টায় গ্রন্থমেলার দ্বার খুলতেই বইপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ। বেলা যত গড়ায় বইপ্রেমীদের ভিড়ও তত বাড়তে থাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনস্রোতে রূপ নেয় গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ। এ জনস্রোতে যেন তৈরি করেছে সাদা-কালোর এক বিশাল ক্যানভাস। সে ক্যানভাসে ছিল লাল আর হলুদ রঙের প্রাণের বর্ণমালা। ছুটির দিন হওয়ায় গ্রন্থমেলায় অনেকে এসেছেন দল বেঁধে, অনেকে এসেছেন সপরিবারে। আর পছন্দের বই পেলেই কিনে নিচ্ছেন। 

১৯৫২ সালের এ দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা ও অধিকার আদায়ে নিজের জীবনকে ত্যাগ করে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ জানা-অজানা অনেক বীর বাঙালি। তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রতিবছর বাংলা একাডেমি আয়োজন করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। সর্বস্তরের মানুষের দীপ্ত পদচারণায় গ্রন্থমেলার দুই প্রাঙ্গণ লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। বৃহস্পতিবার গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণে বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উভয় অংশে গিয়ে দেখা যায়, মেলায় দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি। অনেকেই এসেছেন কয়েকবার, আবার অনেকেই প্রথমবার। কারও উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভরা চোখ আবার কারও মাথায় জাতীয় পতাকা। বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সরাসরি তারা গ্রন্থমেলায় এসেছেন। ভিড় থাকায় টার্গেট করে প্রকাশনাগুলোতে ঘুরছেন দর্শনার্থীরা। আর পছন্দের বই পেলেই কিনে নিচ্ছেন তারা। 
উত্তরা থেকে গ্রন্থমেলায় এসেছেন শাহ আলম। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, শহীদ মিনারে আসি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। সেখান থেকে শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গ্রন্থমেলায় এসেছি। বাঙালি সংস্কৃতির ওপর কিছু বই কিনব। উত্তরার একটি বিশ^বিদ্যালয় থেকে একদল শিক্ষার্থী আসেন গ্রন্থমেলায়। তাদের একজন নাজমা খাতুন বলেন, আমরা একসঙ্গে শহীদ মিনারে এসেছিলাম। সেখান থেকে গ্রন্থমেলায়। তাম্রলিপি প্রকাশনীর মালিক তারিকুল ইসলাম বলেন, মেলায় বরাবরই একুশে ফেব্রুয়ারিতে বিক্রি ভালো হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ভালোই চলছে। প্রচুর দর্শনার্থী এসেছে, সঙ্গে করে প্রিয় লেখকের বইও নিয়ে গেছেন। পরিলেখ প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী নূর হোসেন বলেন, স্টলে বইপ্রেমীদের প্রচুর ভিড় হচ্ছে। অন্য দিনের তুলনায় আজ একটু বেশি বিক্রি হচ্ছে। 
মূল মঞ্চের আয়োজন : গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হয় স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। এতে দেড় শতাধিক নবীন-প্রবীণ কবি কবিতা পাঠে অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন কবি অসীম সাহা। বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে বক্তৃতা। বাংলা ভাষার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শীর্ষক একুশে বক্তৃতা প্রদান করেন ভাষাসংগ্রামী জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানের শুরুতে পুরোনো ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। 
স্বাগত ভাষণে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, আমাদের একুশ আজ সারা বিশ্বের। সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের রক্তে লাল হওয়া ঢাকার রাজপথ বিশ্বকে মাতৃভাষাপ্রীতির যে ইতিহাস উপহার দিয়েছিল, সেই পথ লক্ষ্য করে এখন সময় এসেছে সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার প্রচলন এবং যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে মাতৃভাষা দিবসের অন্তর্গত অঙ্গীকার ধারণ করে দেশের সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাও আমাদের জাতীয় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। 
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস বহু অবদান ও পরম্পরায় ঋদ্ধ। এ নিয়ে সরলীকরণের কোনো সুযোগ নেই। এই ভাষা ও সাহিত্য যেমন প্রাচীন চর্যার ধারাবাহিকতায় পুষ্ট তেমনি মধ্যযুগের মুসলিম অবদানেও সমৃদ্ধ। বিশেষ করে সে সময় সাহিত্যে দেবতাবাদের পরিবর্তে মানববাদের যে স্ফুরণ লক্ষ্য করা যায় পরবর্তীকালে তাই বাংলা সাহিত্যে মূল কাঠামো ও মর্ম নির্ধারণ করেছে। এরপর ইংরেজ আগমনে এ ভাষা ও সাহিত্যে পাশ্চাত্য প্রভাব অঙ্গীকৃত করেছে; তারপর দেশভাগের অভিঘাত, ভাষা-আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অশ্রু ও রক্তস্রোত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নতুন গতি ও গন্তব্য নির্ধারণ করে যা এখনও পর্যন্ত বহমান। 
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, স্বাধীনতার পরপর বাংলা ভাষার ব্যবহারে আমরা ব্যাপক উৎসাহ দেখালেও এখনও সুচারুরূপে বাংলার ব্যবহারে পূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। আর অন্যদিকে আমাদের দেশে অনেক জনগোষ্ঠী আছে যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয় যদিও তাদের অনেকেই শিক্ষা ও অন্য প্রয়োজনে বাংলা ভাষা ব্যবহার করে। এদের উত্তর প্রজন্মের অবশ্যই তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার আছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের এ বিষয়ে সচেতনতা এবং স্পষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন। 
আজকের অনুষ্ঠানসূচি : আজ মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ১১টায় অমর একুশের উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সংগীত প্রতিযোগিতা, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু-কিশোরদের পুরস্কার প্রদান করা হবে। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। এছাড়াও বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার শতবর্ষ : ফিরে দেখা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. মাহবুবুল হক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন সাইফুদ্দীন চৌধুরী, আলী হোসেন চৌধুরী এবং এম আবদুল আলীম। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।