আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩১-০৩-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

একে খান : এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
| সম্পাদকীয়

(একে খান, জন্ম ৫ এপ্রিল ১৯০৫-মৃত্যু ৩১ মার্চ ১৯৯১)

একে খানের জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এদেশের শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদান। ব্রিটিশ আমলে পূর্ববঙ্গ শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল। তখন সব শিল্পকারখানাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কলকাতাকেন্দ্রিক। পাকিস্তান 
আমলে শিল্পকারখানা অবাঙালিদেরই অধিগত হতে থাকে

পরাধীন দেশ ও প্রশাসনে বিচার বিভাগের নির্ভীক কর্মকর্তা, দেশিকোত্তম রাজনীতিবিদ এবং বিশিষ্ট শিল্প পরিবার প্রতিষ্ঠাতা একে খান (আবুল কাশেম খান, ১৯০৫-১৯৯১) একটি অবিস্মরণীয় নাম, একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। চারিত্রিক সততা, অক্লান্ত কর্মস্পৃহা, পরিচ্ছন্ন রুচিবোধ, অকুণ্ঠ দেশপ্রেম ও অকৃত্রিম জনদরদ ও মোহনীয় ব্যক্তিত্বের জন্য যিনি ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র। ছিলেন সফল কীর্তিমান পুরুষ।  তিনি তার ছাত্রজীবনে যেমন কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি কর্ম, রাজনীতি ও সমাজজীবনেও অসামান্য কৃতী ও কীর্তির নজির স্থাপন করেছেন। 
একে খানের জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এদেশের শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদান। ব্রিটিশ আমলে পূর্ববঙ্গ শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল। তখন সব শিল্পকারখানাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কলকাতাকেন্দ্রিক। পাকিস্তান আমলে শিল্পকারখানা অবাঙালিদেরই অধিগত হতে থাকে। এ অবস্থায় একে খানই প্রথম বাংলাদেশি মুসলমান, যিনি এতদঞ্চলে শিল্প-বাণিজ্যের প্রসারে এগিয়ে আসেন এবং বহুসংখ্যক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করে জাতীয় শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দিকেই তার ঝোঁক ছিল। তার লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্প এলাকা গড়ে তুলে স্থানীয় পুঁজি ও শ্রম নিয়োগ করার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। দেশের শিল্পায়নে তার ভূমিকা  পথিকৃতের।  তিনি যে পথ প্রদর্শন করে গেছেন, সে পথে অসংখ্য লোকের কর্মসংস্থানের পথ সুগম হয়েছে। তার শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-মালিক সৌহার্দ সবার জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে। 
একে খানের চিত্ত ও বিত্তের সমন্বয় সাধিত হয়েছিল। তাই দেখা যায়, তিনি যথেষ্ট বিত্তের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও চিত্তের ঔদার্য, রুচিবোধ, সত্যনিষ্ঠা ও জ্ঞান স্পৃহাকে বিসর্জন দেননি কিংবা কোনো রকম অসততা, ঔদ্ধত্য বা উচ্ছৃঙ্খলতাকে প্রশ্রয় দেননি। তার জীবনের বিরল অবসর কেটেছে জ্ঞান চর্চায় ও বাগান চর্চায়। তিনি বহু সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি তার শিল্প-বাণিজ্যের লভ্যাংশের ৩০ শতাংশ জনগণের ধর্ম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য ওয়াকফ করে গেছেন। 
তার কর্মময় সমগ্র জীবনের পরতে পরতে এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কী চাকরি ক্ষেত্রে, কী শিল্প-বাণিজ্যে, কী রাজনৈতিক অঙ্গনে, আর কী সমাজসেবায়Ñ সবটাই ছিল আশ্চর্য রকমের প্রতিভাদীপ্ত ও সুপরিকল্পিত। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে স্বল্পকালীন মুন্সেফের চাকরিতে তার ন্যায়পরায়ণতা ও সৎসাহস, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠায় তার পরাদর্শিতা ও অক্লান্ত শ্রম, রাজনৈতিক জীবনে মন্ত্রীপদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে শিল্পায়নে তার দূরদর্শিতা ও সে বিষয়ে তৎকালীন পশ্চিমা শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী ভূমিকা ছিল। একে খানের সঙ্গে আর ১০ জন রাজনীতিবিদ সমাজসেবীর মধ্যে পার্থক্য এখানেই, তিনি ব্যক্তির কল্যাণে নয়, সমষ্টির তথা গোটা দেশ ও জাতির কল্যাণে তার সমগ্র জীবনটাকে উৎসর্গ করে গেছেন।
চট্টগ্রামের ফতেয়াবাদ হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাসের সময় তিনি  চট্টগ্রাম বিভাগের প্রথম স্থান অধিকার এবং মহসিন বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৭ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ (অনার্স) এবং  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণি লাভ করে এমএ পাস করেন। শিক্ষাজীবন সমাপন শেষে প্রথমে কিছুদিন কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি এবং শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জুনিয়র হিসেবে শিক্ষানবিশি করেন। বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বাঙালি মুসলমান পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৩৫ সালে মুন্সেফ হিসেবে  সিভিল সার্ভিস (বিচার বিভাগীয়) চাকরি গ্রহণ করেন। বরিশালে মুন্সেফ থাকাকালে এক মুকদ্দমায় জনৈক উচ্চপদস্থ শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্তকর্তাকে শাস্তিদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৪৪ সালে এ চাকরিতে ইস্তফা দান করে বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রের ডাকে সাড়া দেন, ১৯৪৫ সালে রাজনীতির অঙ্গনে পদচারণা শুরু করেন। তৎকালে তিনি ক্রমে চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের কার্যকরী কমিটির সদস্য হন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে ভারতীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন; তবে কায়েদে আজমের নির্দেশে তাতে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আইন সভার সদস্য হন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় যোগদান এবং শিল্প, পূর্ত, সেচ, বিদ্যুৎ ও খনিজ বিভাগের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং ১৯৬২ সালে পদত্যাগ করেন। ১৯৬২ সালের সংবিধান রচনা ও মূল্যায়নে ছিল তার যথেষ্ট অবদান। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধীদলীয় সদস্য। বিদ্যুৎমন্ত্রী হিসেবে তার সময়ে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়। শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বস্ত্র ও পাট শিল্পের দ্রুত প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং দেশের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের প্রয়াস পান। এখানে চট্টগ্রাম ইস্পাত কারখানা, কর্ণফুলী রেয়নমিল স্থাপন। পশ্চিম পাকিস্তানেও অনুরূপ শিল্প প্রতিষ্ঠা। দেশের প্রতি জেলায় শিল্প এলাকা প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় পুঁজি ও শ্রমিক আকর্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং ছোট ও মাঝারি শিল্প স্থাপনে গুরুত্বারোপ করেন। মন্ত্রী থাকাকালে পূর্ব পাকিস্তান শিল্প গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা, বনশিল্প করপোরেশন ও পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক স্থাপিত হয়।
তৎকালীন সরকারের বৈষম্য নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাজধানী করাচি থেকে রাওয়াল পিন্ডির ইসলামাবাদে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে পূর্ব পাকিস্তানিদের রাজধানী যাতায়াত আরও দুরূহ হয়ে পড়বে বলে আপত্তি তোলেন একে খান। এর প্রতিকার কল্পে ঢাকায় পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপনের প্রস্তাব প্রদান করেন যাতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন এখানে বসতে পারে এবং অধিবেশনকালে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ এখানে চলতে পারে। তার এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় শেরেবাংলা নগর স্থাপন এবং জগদ্বিখ্যাত সংসদ ভবন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গৃহীত হয়।